জীবনের দাম কত

আপডেট: 05:30:32 20/03/2019



img

সরদার রনি : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।
বাংলাদেশেও সড়কে মৃত্যুর মিছিল নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতবছর নিরাপদ সড়কের দাবিতে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ হলেও পরিস্থিতির দৃশ্যত কোনো পরিবর্তন নেই।
মঙ্গলবারও ঢাকায় একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হওয়ার পর আবার শুরু হয়েছে বিক্ষোভ। দাবি পুরনোই- নিরাপদ সড়ক চাই।
কিন্তু এসব সড়ক দুর্ঘটনায় যেসব জীবন ঝরে যায়, তাদের জীবনের আসলে মূল্য কত? অথবা সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করে যারা বেঁচে থাকেন, তাদের এই ভোগান্তির আর্থিক মূল্যই বা কত?
টাকার অঙ্কে এই হিসেব অনেকে না-ই করতে চাইবেন।
তবে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় মোট কত টাকার ক্ষতি হয়, তার হিসেব বের করা হয়েছে বাংলাদেশেরই এক সরকারি জরিপে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক ও মহাসড়ক অধিদপ্তর ২০১৬-১৭ সালের এক জরিপে দুর্ঘটনার শিকার হওয়া কোনো কর্মক্ষম ব্যক্তির অর্থনৈতিক ক্ষতি, চিকিৎসার খরচ, জীবনের মূল্য, গাড়ির ক্ষতি এবং প্রশাসনিক ও অন্যান্য সব হিসেব থেকে এই চিত্র তুলে ধরেছে।
সাকুল্যে একটি প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনা থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকার মতো অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। তবে মারাত্মক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে প্রায় আড়াই লাখ টাকা এবং সাধারণ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এক লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হয়।
২০১৬-১৭ সালের দুর্ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে জরিপে এমন তথ্য দেওয়া হয়েছে।
তবে এ হিসেবের মধ্যে দুর্ঘটনার শিকার হওয়া ব্যক্তির পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের অর্থনৈতিক চাপ, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তির শূন্য স্থান পূরণ ও সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ, দুর্ঘটনার ফলে রাস্তায় নষ্ট হওয়া অতিরিক্ত সময়, সড়ক দুর্ঘটনার ফলে গড় আয়ু কমার অর্থনৈতিক ক্ষতি ইত্যাদি বিষয়গুলো হিসেব করা হয়নি বলে জরিপে বলা হচ্ছে।
পুলিশের রেকর্ডে থাকা জাতীয় সড়ক পরিবহন দুর্ঘটনা রির্পোট ২০১৪-এর উপর ভিত্তি করে শহর ও গ্রাম থেকে এক হাজার ৫৫৮ জন হতাহতকে নমুনা হিসেবে নিয়ে এই তথ্য বের করেছে সড়ক ও মহাসড়ক অধিদপ্তরের জরিপ।

কর্মক্ষম ব্যক্তির অর্থনৈতিক ক্ষতি
সরকারি ওই গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনায় একটি কর্মক্ষম ব্যক্তির প্রাণ হারানোর ফলে অর্থনৈতিকভাবে গড় ক্ষতির পরিমাণ ২৪ লাখ ৬২ হাজার ১০৬ টাকা।
আর মারাত্মকভাবে আহত হলে সেক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় গড়ে ২০ হাজার ৯৭৭ টাকা। তবে সাধারণ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তা মাত্র এক হাজার ৫৯৮ টাকা।

আর্থিক ক্ষতি যেভাবে হিসেব করা হয়েছে
গবেষণা রিপোর্ট অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনার শিকার কোনো ব্যক্তির যে উৎপাদন ক্ষমতা, তার আর্থিক মূল্যের হিসেব করে এটি পাওয়া গেছে।
অধিকাংশ দুর্ঘটনার বিশ্লেষণে দুর্ঘটনার শিকার হওয়া ব্যক্তিদের উপর জরিপ করে অথবা তাদের গড় বেতন হিসেব করে এই ক্ষতি নিরুপণ করা হয়। তবে মোটরযান ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে গড় আয় নিরুপণ করা হয়েছে বাংলাদেশ রোড রিসার্চ ল্যাবরেটরি (বিআরআরএল)-এর ট্রাভেল টাইম কস্ট (টিটিসি) জরিপের উপর ভিত্তি করে।
শুধুমাত্র পথচারীদের গড় আয় ধরা হয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (২০১৫-১৬) তথ্য অনুযায়ী, মাথাপিছু আয় হাজার ৫৫০ টাকা হিসেব করে।
গবেষক দল বলছেন, তারা তাদের নমুনা থেকে দুর্ঘটনায় হতাহতদের গড় বয়স বের করেছেন যাতে সারাজীবনে তাদের গড় আয় কত হতে পারে, তার ধারণা পাওয়া যায়। সেখান থেকে দুর্ঘটনার জন্য যত বছর নষ্ট হলো, তার ভিত্তিতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বের করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আহতদের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর যতদিন কোনো ব্যক্তিকে কাজ থেকে দূরে থাকতে হয়, তার সঙ্গে তার দৈনিক আয়কে গুণ করে ওই কয়েকদিনের আর্থিক ক্ষতির হিসেব বের করা হয়েছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মারাত্মক আহত হলে সুস্থ হতে ৩০ দিন পর্যন্ত ধরে নেওয়া হয়, আর সামান্য আহত হলে তা দুইদিন ধরে হিসেব করা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে ওই রিপোর্টে।

চিকিৎসার জন্য কত খরচ হয়
সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের চিকিৎসার খরচের মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক চিকিৎসা এবং উদ্ধার তৎপরতা, হাসপাতালের খাবার, বিছানা, অপারেশন, এক্স-রে, ওষুধ ও ডাক্তারের ফি এবং পরবর্তীতে পুনর্বাসনের খরচ।
তবে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের খুব কমই অ্যাম্বুলেন্স সেবা অথবা প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগে মেডিকেল সেন্টার বা বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। আর যারা দুর্ঘটনাস্থলে নিহত হন, তাদের মরদেহ পুলিশ পরিবহন করে।
২০১৬-১৭ সালের ওই জরিপে দেখা যায়, উদ্ধার ও পরিবহন বাবদ প্রত্যেক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তির জন্য গড়ে এক হাজার ৪০০ টাকা ব্যয় হয়।
অন্যদিকে, হাসপাতালের খরচ বের করা বেশ কঠিন বলে মনে করা হয়। কারণ মারাত্মক আহতদের ক্ষেত্রে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে দশ দিন এবং হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে দুই দিন হিসেব করা হয়।
এ হিসেবে একটি সাধারণ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এক ব্যক্তির প্রায় এক হাজার ৬০০ টাকা খরচ হয়। আর মারাত্মক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে খরচ প্রায় দশ হাজার টাকা। তবে নিহত প্রতি ব্যক্তির জন্য এক হাজার ৪০০ টাকা খরচ হয় বলে জানাচ্ছে ওই জরিপ।

মানবিক মূল্য কত
১৯৮০-এর দশকে ভারতে রোড ইউজার কস্ট গবেষণার ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ফলে পেইন, গ্রিফ অ্যান্ড সাফারিংস (পিজিএফ) ধরা হয়েছিল মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির ২০ শতাংশ হিসেব করে। ভারতে পরবর্তী গবেষণাগুলোতে এবং ১৯৯৫ সালে নেপালেও পিজিএফ একইভাবে হিসেব করা হয়েছিল।
সে হিসেবে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার শিকার জীবনের মানবিক মূল্য বা পিজিএফ গড়ে প্রায় ১৫ লাখ টাকা।
আর মারাত্মক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তা ১২ হাজার টাকার মতো, এবং সামান্য আহতদের জন্য তা ৯৭০ টাকার মতো।
সরকারের এই গবেষণায়, যেসব দুর্ঘটনার পর আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় না, সেগুলোকে 'সাধারণ দুর্ঘটনা' বলা হচ্ছে।
অন্যদিকে 'মারাত্মক দুর্ঘটনা' শব্দটি এমন ধরনের আহতের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে রোগীকে রাতারাতি হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। এমনকি দুর্ঘটনার পর ৩০ দিনের মধ্যে মারা যাওয়ারও আশঙ্কা থাকে।
তবে দুর্ঘটনার দিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে মারা গেলে তাকে নিহত বলে ধরা হয়েছে গবেষণাটিতে।
সূত্র : বিবিসি