জেরুজালেম : ট্রাম্পের ঘোষণার তাৎপর্য কী

আপডেট: 02:38:45 20/12/2017



img

রিচার্ড এন হাস

চলতি বছরের জুন মাসে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে। ওই যুদ্ধ এক সপ্তাহও স্থায়ী হয়নি। কিন্তু তার রেশ আজও রয়ে গেছে। ছয় দিনের ওই যুদ্ধে ইসরায়েল চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইসরায়েলি বাহিনী মিসরের কাছ থেকে গাজা ভূখণ্ড ও সিনাই উপদ্বীপ, জর্ডানের কাছ থেকে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম এবং সিরিয়ার কাছ থেকে গোলান মালভূমি ছিনিয়ে নেয় এবং এসব এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
সে সময় এই যুদ্ধের ফলাফলকে অস্থায়ী হিসেবে দেখেছিল বিশ্ব। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পাঁচ মাস পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৪২ নম্বর প্রস্তাবে রাষ্ট্রবিহীন ফিলিস্তিনিদের সমস্যার কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বিশ্ব যেটাকে অস্থায়ী ফল হিসেবে দেখেছিল, তা ক্রমেই স্থায়ী রূপ পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
তিনি এটাও স্পষ্ট করেন যে উভয় পক্ষ একমত হলে যুক্তরাষ্ট্র দুই রাষ্ট্র সমাধানকে সমর্থন করবে। তবে তিনি এখনই তেল আবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস সরানোর প্রক্রিয়া শুরু করবেন না বলে জানিয়েছেন, যদিও তিনি এখন জেরুজালেমে মার্কিন কনস্যুলেটকে দূতাবাস বলেই আখ্যায়িত করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণায় বেশির ভাগ ইসরায়েলি খুশি হলেও আরব বিশ্বের সিংহভাগ মানুষ এতে ক্ষুব্ধ হয়েছে।
কেন ট্রাম্প এ সময় এমন ঘোষণা দিলেন? এ ব্যাপারে ট্রাম্প বলেন, সাদামাটাভাবে বললে এটা হচ্ছে বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দেওয়া, যেটা তার পূর্বসূরিরা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এটা তো সত্য যে জেরুজালেমের ব্যাপারে মার্কিন নীতি গত কয়েক দশকে কিছুই করতে পারেনি। এর ফলে ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের মধ্যে ব্যবধান কেবলই বেড়েছে।
অন্যরা যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণার জন্য মার্কিন ঘরোয়া রাজনীতিকে দায়ী করেছে। তারা বলছে, ইসরায়েলের কিছু কিছু দাবি মেনে নিতে (যেমন বসতি নির্মাণপ্রক্রিয়াকে ধরে রাখা) বা ফিলিস্তিনিদের বিকল্প কোনো প্রস্তাব দিতে ব্যর্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র একতরফা এই ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণার কারণে এরই মধ্যে কিছু সহিংসতা হয়েছে। মনে হচ্ছে, সংকট সৃষ্টির পাশাপাশি এই ঘোষণার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগও হারিয়ে গেল। যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণা শুধু বিতর্কিতই নয়, এটা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব নিরসনে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনাকে ভেস্তে দিতেও পারে। ট্রাম্প প্রশাসন তার প্রথম বছরে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বকে দূর করার জন্য পরিকল্পনা প্রণয়নে বেশ ভালো সময় ব্যয় করেছে। কিন্তু ট্রাম্পের এ ঘোষণা ওই পরিকল্পনাকে দুর্বল করে দিতে পারে। অবশ্য ট্রাম্প প্রশাসন যে পরিকল্পনা নিয়েছিল, তার সম্ভাবনাও যথেষ্ট সীমিত।
ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে, বাইরের ব্যক্তিরা এবং বিশেষ করে সৌদি আরব শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। এ রকম মনে করার কারণ হলো, সৌদি আরব ও অন্য আরব সরকারগুলোও ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো কিছু করার চেয়ে ইরানের হুমকির বিষয়টি নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। ফলস্বরূপ, ধারণা করা হয় যে তারা ইসরায়েলের প্রতি তাদের দীর্ঘদিনের শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। ট্রাম্প প্রশাসন এ আশা করছে যে ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করার জন্য ফিলিস্তিনিদের বোঝাতে সৌদি আরব তাদের আর্থিক সম্পদ ব্যবহার করবে।
সমস্যা হচ্ছে যে ইসরায়েলি সরকার একমত হতে পারে এমন পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিরা ঐতিহাসিকভাবে যা দাবি করে আসছে, তা থাকবে না। যদি তা-ই হয়, তাহলে ফিলিস্তিনি নেতারা তাঁদের জনগণকে যা হতাশ করবে বা হামাস ও অন্যান্য মৌলবাদী গোষ্ঠীকে উসকে দিতে পারে—এমন একটি পরিকল্পনায় স্বাক্ষর করার চেয়ে না করাটাকেই নিরাপদ মনে করবে।
সৌদি আরবও হয়তো এমন একটি পরিকল্পনার সঙ্গে থাকতে চাইবে না, যেটা বহু মানুষকে হতাশ করবে। যুবরাজ মোহম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে নতুন সৌদি নেতৃত্বের এখন শীর্ষ অগ্রাধিকার হচ্ছে ক্ষমতা সংহত করা। দেশের দুর্নীতিবাজদের পাকড়াও এবং জাতীয়তাবাদী এই ইরানবিরোধী নীতি গ্রহণের মাধ্যমে যুবরাজ তা করে চলেছেন।
কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী পুরো কৌশলটি কাজ করছে না। সৌদি যুবরাজের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে। তবে সৌদি আরবের অন্য পর্যবেক্ষকেরা একে ভিন্নমত দমনের নগ্ন পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তার মানে, দেশে সংস্কারের জন্য উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করার চেয়ে বাস্তবায়ন করা অনেক কঠিন, তা প্রমাণিত হয়েছে।
ট্রাম্প ও তাঁর জামাতা জারেড কুশনারের জন্য সমস্যা হচ্ছে, হোয়াইট হাউস যেমনটি ভেবেছিল, সৌদি আরব সে অর্থে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অংশীদার নয়। যদি নতুন যুবরাজ তাঁর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে থাকেন, তখন তিনি এমন একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মেলাতে অনিচ্ছুক হতে পারেন, যিনি কিনা ইসরায়েলের খুব ঘনিষ্ঠ। আর ইসরায়েল হচ্ছে সেই দেশ, যারা ফিলিস্তিনিদের ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ করতে অনিচ্ছুক।
এই সবকিছু আবার আমাদের জেরুজালেমে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। ট্রাম্প যুক্তি দেখিয়েছেন যে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে এই শহরকে স্বীকৃতি দেওয়া ‘শান্তিপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং দীর্ঘস্থায়ী চুক্তির পক্ষে কাজ করার জন্য একটি পদক্ষেপ’। কিন্তু অনেকেই মনে করছেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের প্রভাব হবে নেতিবাচক।
অনুবাদ : রোকেয়া রহমান, স্বত্ব : প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। প্রথম আলোয় প্রকাশিত।
রিচার্ড এন হাস : কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের প্রেসিডেন্ট।

আরও পড়ুন