ঝাঁপার ভাসমান সেতুর পাড় এখন ‘পিকনিক স্পট’

আপডেট: 01:17:39 24/01/2018



img
img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : মণিরামপুরের ঝাঁপা বাঁওড়ে প্লাস্টিকের ড্রাম দিয়ে নির্মিত ভাসমান সেতু দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড় ক্রমে বাড়ছে।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন এলাকাসহ দূর-দুরান্ত থেকে বিভিন্ন বয়সী ও শ্রেণি-পেশার হাজার হাজার মানুষ সেতু দেখতে আসছেন। ছুটির দিনে দর্শনার্থী আসছেন বেশি। আবার অনেকে দল বেঁধে এখানে আসছেন পিকনিক করতে।
ব্যবসা হবে বিবেচনায় সেতুর পশ্চিম পাড়ে ঝাঁপা গ্রামে রাতারাতি গড়ে উঠেছে পিকনিক স্পট। সেতু নির্মাণ কমিটিসহ স্থানীয়দের প্রায় ত্রিশ বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠেছে স্পটটি। আবার দর্শনার্থীদের আনন্দ দিতে ওই পাড়ে বসেছে নাগরদোলা। একইসঙ্গে সেতুর দুই পাড়ে বসেছে বেশ কয়েকটি অস্থায়ী দোকান। ফলে সেতুটি ঘিরে কর্মসংস্থান হয়েছে বেশ কিছু লোকের।
সেতুটি ঘুরে দেখতে দর্শনার্থীদের জন্য পাঁচ, দশ ও ২০ টাকা টিকিট নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ। ব্রিজের দুই পারে ৫-৬ ব্যক্তি এই টিকিট ব্রিক্রির কাজে ব্যস্ত। দিনে প্রায় দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টিকিট বিক্রি করে মোটা টাকা আয় করছেন সেতু নির্মাতারা। টিকিট বিক্রেতারা এমনটি জানালেও আয়ের সঠিক হিসেব জানাতে চাননি দায়িত্বশীলদের কেউ।
এদিকে দর্শনার্থীদের চাপে ব্রিজ সংরক্ষণে কাজ করছেন সেতুটির কারিগর রবিউল ইসলাম। মঙ্গলবার দুপুরে রবিউলকে ব্রিজের ওপর কাজ করতে দেখা গেছে। এসময় কথা হয় সেতু দেখতে আসা দর্শনার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে।
ভাসমান সেতু দেখতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোটরসাইকেলে এসেছিলেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তিন ছাত্র। তাদের মধ্যে সোহাগ বলেন, ‘ফেসবুকে সেতুটি দেখে তা ঘুরে দেখার ইচ্ছা হয়েছে। আজ (মঙ্গলবার) ১২টার দিকে আমরা তিনজন এসেছি। সেতু দেখে অনেক ভালো লাগছে।’
সেতুটি নিয়ে গবেষণা করার জন্য তিনি শিক্ষকদের অনুরোধ করবেন বলে জানিয়েছেন।
একই সময়ে যশোরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ভাসমান সেতু দেখতে এসেছিলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুর রহমান। তার গাড়ির চালক রুহুল আমিন বাবু বলেন, ‘ব্রিজ দেখতে ভালোই লাগছে। স্যার ব্রিজ দেখে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।’
যশোর সদর উপজেলার রূপদিয়া এলাকা থেকে স্ত্রীকে নিয়ে সেতু দেখতে এসেছিলেন রিয়াজ উদ্দিন তুহিন নামে একব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘ব্রিজটি দেখতে সত্যিই অসাধারণ।’
একা বা প্রিয়জনকে নিয়ে ঝাঁপা বাঁওড়ের ভাসমান সেতু দেখতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসছেন বহু মানুষ। আবার অনেকে সেতু দেখতে এসে বাড়তি আনন্দ পেতে চড়ে বসছেন নৌকায়, ঘুরে দেখছেন বাঁওড়।
সেতু দেখতে আসা লোকজনকে আনন্দ দিতে বাঁওড়ের পশ্চিম পাড়ে নাগরদোলা বসিয়েছেন যশোর সদর উপজেলার রুদ্রপুর গ্রামের আক্কাস আলী। তিনি বলেন, ‘গত শুক্রবারে এসেছি। প্রতিদিন পনেরশ থেকে আঠারশ টাকা আয় হয়। সেখান থেকে এখানকার কমিটিকে দুইশ করে টাকা দিয়ে যা থাকছে কোনোরকম চলছে।’
বাঁওড়ের পশ্চিম পাড়ের মিষ্টির দোকানদার আকতারুজ্জামান লালটু বলেন, ‘আগে দোকানের পাশাপাশি গাড়ি চালাতাম। দোকানের আয়ে সংসার চলতো না। এখন ব্রিজ হওয়ায় গাড়ি বাদ দিয়ে সারাদিন দোকানে থাকছি। প্রতিদিন ৩-৪ হাজার টাকার মাল বিক্রি হয়।’
এছাড়া বাঁওড়ের দুই তীরে বাদাম, চটপটি, ঝালমুড়ি ও চানাচুরসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রীর কয়েকটি দোকান বসেছে। সবার বেচাকেনা ভালো বলে জানান দোকানিরা।
ভাসমান সেতুর কারিগর রবিউল ইসলাম বলেন, ‘ মূলত গ্রামবাসীর পারাপারের জন্যই ব্রিজটি তৈরি করা হয়েছে। এতো চাপ হবে বুঝতে পারিনি। তাই ব্রিজ সংরক্ষণে গত তিনদিন ধরে কাজ করছি।’
এদিকে ঝাঁপার বাঁওড়ে নির্মিত ভাসমান সেতুটির নতুন নামকরণ করা হয়েছে জেলা ‘প্রশাসক সেতু’। যা নিয়ে নানাজনে নানা মন্তব্য করছেন। মঙ্গলবার ভাসমান সেতু দেখতে আসেন উপজেলার মাহমুদকাটি গ্রামের ইউসুফ আলী। তিনি সেতুর নামকরণের সাইনবোর্ডটি দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ইউসুফ বলেন, ‘গ্রামবাসী এতো কষ্ট করে নিজেদের টাকা দিয়ে ব্রিজ তৈরি করলো, যেখানে অন্য কারো কোনো অবদান নেই, সেই ব্রিজের নাম কীভাবে জেলা প্রশাসক সেতু হয়?’
জানতে চাইলে ভাসমান সেতুর উদ্যোক্তা আসাদুজ্জামান বলেন, ‘‘যেহেতু বাঁওড়টি সরকারি। জেলা প্রশাসক বাঁওড় নিয়ন্ত্রণ করেন। তাছাড়া সেতু নির্মাণে শুরু থেকে জেলা প্রশাসক আমাদের পাশে ছিলেন। এই ডিসি তো আর স্থায়ী থাকবেন না। পরবর্তী কোনো ডিসি এসে যদি প্রশ্ন তোলেন, কেন বাঁওড়ের ওপর সেতু নির্মাণ করা হলো? এসব সমস্যা এড়াতে জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলে ব্রিজটির নামকরণ করা হয়েছে, ‘জেলা প্রশাসক সেতু’।’’
আসাদুজ্জামান বলেন, ‘সেতু দেখতে আসা মানুষের ভিড় ক্রমে বাড়ছে। দর্শনার্থীদের চাহিদার কথা ভেবে এখানে এলাকাবাসীর ত্রিশ বিঘা জমির ওপর মেহগনি ও আমবাগানে একটা পার্ক তৈরি করা হয়েছে। পার্ক সাজাতে কাজ চলছে। দুটি টয়লেট ও একটি নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। এই পর্যন্ত গত দুই শুক্রবারে চালুয়াহাটির একটি মাদরাসা থেকে ও ইউনিলিভার কোম্পানির মণিরামপুরের একটি গ্রুপ এখানে পিকনিকে এসেছে। আগামী শুক্রবারে ঝিকরগাছা থেকে একটি দল পিকনিকে আসার কথা রয়েছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান বলেন, ‘টিকিট বিক্রি থেকে আয়ের বিষয়টি এখন আমরা প্রচার করতে চাচ্ছি না। আগামী ২৭ তারিখে আমাদের একটা মিটিং আছে। মিটিংয়ের পর আয়ের বিষয়টি আপনাদের জানানো যাবে।’