টার্কি পাল্টে দিয়েছে আলমগীরের জীবন

আপডেট: 02:09:13 27/12/2017



img
img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : বাবা আবেদ আলীর মৃত্যুর পর বেকার যুবক আলমগীর হোসেন জীবন চালাতে নিজ বাড়িতে ছোট একটা মুরগির খামার গড়ে তুলেছিলেন। দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে যা আয় করতেন তা দিয়েও ঠিকমতো সংসার চলছিল না। মাঠে চাষযোগ্য জমিও নেই তার। কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না যুবকটি।
তখনই টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে টার্কি মুরগির চাষের ওপর প্রতিবেদন দেখতে পান। খোঁজ করতে থাকেন এই মুরগির বাচ্চা কোথায় পাওয়া যায়। এরপর বাচ্চা সংগ্রহ করেন। মাত্র তিন মাস হলো এই মুরগী লালন-পালন করছেন। এখন ডিম, বাচ্চা, আর বড় মুরগি বিক্রিও করছেন আলমগীর। এরই মধ্যে ঘুরতে শুরু করেছে জীবনের চাকা। সচ্ছলতা ফিরছে তার কষ্টের সংসারে।
আলমগীর হোসেন (৩৭) ঝিনাইদহ শহরের হামদহ (ইসলামপাড়া) এলাকার বাসিন্দা। বাবা আবেদ আলী বিশ^াস মারা গেছেন সাত বছর হয়েছে। মা হাসিনা বেগম, স্ত্রী নাজমুন নাহার, বোন মুক্তা আর একমাত্র ছেলে ১১ বছর বয়সের অনিককে নিয়ে তার সংসার। অনিক চতুর্থ শ্রেনিতে পড়ালেখা করে।
আলমগীর হোসেন জানান, তারা চার বোন আর এক ভাই। তিনটি বোন বাবা বেঁচে থাকতেই বিয়ে হয়েছে। ছোট বোনটি ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজে অনার্স পড়ছে।
বাবার মৃত্যুর পর গোটা সংসার তার কাঁধে এসে পড়ে। মাঠে তাদের ৩৩ শতক জমি আছে, কিন্তু সেই জমিতে তেমন কোনো ফসল হয় না। এই অবস্থায় কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। হাতে তেমন পুঁজিও ছিল না। এ সময় সিদ্ধান্ত নেন একটা মুরগির খামার গড়ে তুলবেন। নিজের বাড়িতে একটা মুরগির খামার করেন। সে চার বছর আগের কথা। এই খামারে যে আয় হতো তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চালতো। বোন আর ছেলের পড়ালেখার খরচ জোগাড় করতে কষ্ট হতো। এভাবে তিনি আর চলতে পারছিলেন না।
আলমগীর হোসেন জানান, পাঁচ মাস হলো টেলিভিশনে একটি অনুষ্ঠান দেখেন তিনি। সেখানে টার্কি মুরগির চাষপদ্ধতির ওপর প্রতিবেদন দেখানো হচ্ছিল। টার্কি চাষ করে কীভাবে সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনা যায়, তা সবিস্তারে তুলে ধরা হয় অনুষ্ঠানে। এই অনুষ্ঠান দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নেন টার্কির চাষ করবেন। খোঁজ করতে থাকেন কীভাবে এই মুরগির বাচ্চা পাওয়া যায়। বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু করেন। এক পর্যায়ে মাগুরা জেলা থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করেন। প্রথম তিনি চার মাস বয়সের ৬০টি বাচ্চা নিয়ে আসেন। শুরু করেন এই বাচ্চা লালন-পালন। মাত্র দুই মাস পরই টার্কিগুলো ডিম দিতে শুরু করে। এরপর বিক্রি করতে থাকেন বড় মুরগি। এখন তার খামারে ডিম, বাচ্চা আর বড় মুরগি উৎপাদন হচ্ছে। যা তিনি বিক্রি করে বেশ টাকা আয় করছেন।
তিনি জানান, ৬০টি বাচ্চা এনে চাষ শুরু করে বর্তমানে তার খামারে ৮৩ পিচ বাচ্চা, ২০টি বড় মুরগি রয়েছে। ৮৪টি ডিম ফুটাতে দেওয়া আছে, বাড়িতে ডিম আছে আরো ২২ পিচ।
চাষ সম্পর্কে আলমগীর হোসেন জানান, একটা ডিম মেশিনে দিলে ২৪ দিন পর বাচ্চা হয়, আর মুরগির সাহায্যে ফুটালে ২৭ দিন লাগে। এই বাচ্চা বড় করলে ছয় মাসের মধ্যে খাওয়ার উপযোগী হয়ে যায়। এ সময় ওজন হয় সাত থেকে দশ কেজি। পাশাপাশি ওই মুরগি ডিম দিতে শুরু করে। একটা মুরগি মাসে ২২ থেকে ২৫টি ডিম দেয়। এভাবে দুই বছর পর্যন্ত ডিম দেয় টার্কি। এই মুরগি দুই জাতের রয়েছে, যার একটি হচ্ছে রয়েল, আরেকটি টার্কি। রয়েল জাতটি একটু বেশি বড় হয়।
বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে এক থেকে দশ দিনের বাচ্চা এক হাজার টাকা জোড়া বিক্রি হচ্ছে। আর দশ থেকে ২০ দিনের বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে গড়ে দেড় হাজার টাকায়। ছয় মাস বয়সের মুরগি বিক্রি হচ্ছে সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকায়। আর ডিম বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা হালি।
বাজারের এই দর সম্বন্ধে আলমগীর হোসেন বলেন, কোনো কোনো সময় একটু উঠা-নামা করে। তবে সবমিলিয়ে এই মুরগির চাষ করে তিনি লাভবান হচ্ছেন। তার সংসার ভালোভাবে চলছে। বেশ কিছু টাকাও জমিয়েছেন। আশা করছেন, আগামীতে খামার আরো বড় করতে পারবেন।