ডাকসু নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি

আপডেট: 06:39:45 13/03/2019



img

মামুন কবীর

ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল কি দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে দেশের রাজনীতিতে? ছাত্ররাজনীতির কেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কারণে সেখানকার রাজনীতির দিকে তাকিয়ে থাকে দেশের মানুষ। দেশের ভবিষ্যৎ মূল নেতৃত্ব তৈরির জায়গাও সেটাও। তাইতো ডাকসু নির্বাচন নিয়ে দেশের মানুষের এত আগ্রহের জায়গা। আরো একটি বিষয় হলো প্রায় ২৮ বছর ১০ মাস পরে অনুষ্ঠিত হলো এই নির্বাচন; যা ছিল বহুল আকাঙ্ক্ষিত।
ডাকসু নির্বাচনের ফলাফলের ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে বেশিরভাগ সময়ই এখানে বিজয়ী হয়েছে বিরোধী দলের ছাত্রসংগঠন। কিন্তু এবার এই ফলাফলে একটা পরিবর্তন দেখলো দেশের মানুষ। রাজনীতিসচেতন মানুষগুলো নিশ্চয়ই বুঝবেন বিষয়গুলো। পরিবর্তনের এই ইঙ্গিত আমাদের জন্য কী বয়ে আনবে তা নিয়ে ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে।
চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে উঠা সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ এবার ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেয় এবং সে আন্দোলনের আলোচিত ছাত্রনেতা নুরুল হক সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হয়ে এসেছেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তাকে নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে। কোন মহল বলছে তিনি ছাত্রশিবিরের প্রতিনিধি। আবার কোন মহল বলছে যে, তিনি ছাত্রলীগেরই হল কমিটির নেতা। কিন্তু তার বর্তমান পরিচয় তিনি কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা। এটা যেহেতু কোন প্রথাগত রাজনৈতিক প্লাটফরম নয় সেহেতু একভাবে তাকে স্বতন্ত্র প্রার্থীই বলা যায়।
এছাড়া জিএস এবং এজিএস পদে সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ জয়লাভ করলেও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সেই কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রার্থীরাই। তারা একটি সম্পাদক পদেও জিতেছেন।
যদিও কোটা সংস্কার আন্দোলনে বাম ছাত্রসংগঠনগুলো এবং আরো অনেক ছাত্রসংগঠনের যুক্ততা ছিল প্রকাশ্য এবং তারা নেতৃত্বেও ছিল। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে বাম প্রগতিশীল ছাত্রনেতারা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকারও হয়েছিলেন। বাম প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনের প্রার্থী লিটন নন্দীও কোটা সংস্কার আন্দোলনে বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর পক্ষের প্রথম সারির নেতা ছিলেন। শুধু তাই নয়, পহেলা বৈশাখে যৌন নিপীড়নের ঘটনার প্রতিবাদ করে তিনি সারাদেশে পরিচিত মুখ। এছাড়াও বিভিন্ন আন্দোলনে কারাবরণ করেও তিনি ব্যাপকভাবে আলোচিত বর্তমান ছাত্ররাজনীতিতে। কিন্তু এই নির্বাচনের ফলাফলে লিটন নন্দীসহ তাদের প্যানেলের পরাজয় হয়েছে শোচনীয়ভাবে।
তার মানে কোটা সংস্কার আন্দোলনের যে অংশ প্রচলিত রাজনীতির বাইরে অবস্থান করছিল তাদের দিকের পাল্লাটা ভারি ছিল এই নির্বাচনে। যদিও এই নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা এবং অভিযোগ রয়েছে। সরকারি ছাত্রসংগঠনের বাইরে প্রায় সকলেই ভোট বয়কটের ঘোষণা দেয় নির্বাচনের দিন দুপুরের মধ্যেই। তারা পুনঃনির্বাচনের দাবি করে এবং সেই দাবিতে আন্দোলনের মধ্যে রয়েছে।
আবার আরেকটি খেয়াল করার মতো বিষয় হলো, মোট ১৮টি হল সংসদের মধ্যে ১২টিতে ভিপি পদে ছাত্রলীগ জয়ী হলেও বাকি ছয়টি হলে ভিপি পদে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি ছাত্রলীগের বাইরে প্রচলিত ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রার্থীরা পিছিয়ে রয়েছেন।
আমরা জানি যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে সেই দলের ছাত্রসংগঠনই বিশ্ববিদ্যালয় এবং হলগুলো নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তাদের ইশারাতেই বিশ্ববিদ্যালয় এবং হল প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করে- এরকম অভিযোগও রয়েছে। এটা রাজনীতিতে দখলদারিত্বের সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। এই সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই দেশে এবং চলতে চলতে এগুলোর বাইরে মানুষ এখন ভাবতেই ভুলে গেছে। এর বাইরে গেলেই আলোচনা হয় নয়তো সব ঠিক আছে বলেই সবাই চুপচাপ থাকেন। বাম প্রগতিশীল সংগঠনগুলো এই দখলদারিত্বের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে কথা বলে আসলেও তাতে কোন পরিবর্তন আসেনি। বিরোধী দলের ছাত্রসংগঠনও এই বিষয়ে কথা বলে না, কারণ তারা আশায় থাকে যে ক্ষমতায় গেলে তারাও এই নিয়ন্ত্রণের আর দখলের রাজনীতির নেতৃত্ব দেবে।
আওয়ামী লীগ দশ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকার ফলে বিশ্ববিদ্যালয় এবং হলগুলোতে ছাত্রলীগের দখল ও নিয়ন্ত্রণ এখন বাড়িতে ডাল-ভাত খাওয়ার মতো ব্যাপার। ফলে নির্বাচনে তাদের প্রাধান্য থাকবেই। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে তারা আঙুল বাঁকা করবেই। এটা খুবই স্বাভাবিক যেহেতু তারাও ক্ষমতা চর্চার রাজনীতিতেই অভ্যস্ত।
আরেকটি বিষয় হলো বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল এই নির্বাচনে অংশ নিলেও তারা কোন ধরনের সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়নি। দীর্ঘসময় ক্ষমতার বাইরে থাকায় ক্যাম্পাসে তাদের অবস্থান নেই বললেই চলে। তারই প্রতিফলন নির্বাচনের ফলাফলেও দেখা যায় স্পষ্টভাবেই।
এ সবই হলো সাধারণ চিত্র। এর ভেতর থেকে যে বার্তাটা পাওয়া যায় তা হলো, ছাত্রসমাজ ক্ষমতাকে কিংবা দখলদারিত্বকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য নিজেরা সংগঠিত হচ্ছে। কোন প্রচলিত ছাত্রসংগঠনকে তারা গ্রহণ করছে না। দেশে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা বিরাজনীতিকরণের রাজনীতির প্রতিফলন ছাত্রদের মধ্যে দেখা গেল এই নির্বাচনের ফলাফলের মধ্যে। তারা বিরোধী ছাত্রসংগঠনের পরিবর্তে নিজেরা সংগঠিত হতে বেশি পছন্দ করছে। তাই তারা কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করছে।
দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যায় সাধারণ মানুষ রাজনীতির বাইরে গিয়ে একত্রিত হয়ে আন্দোলন করছে। কিন্তু দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থে, রাজনৈতিক কোন ইস্যুতে কিংবা জনগণের স্বার্থের পক্ষের কোন সমন্বিত রাজনৈতিক আন্দোলনের ডাকে সাধারণ মানুষ আগের মতো আর উৎসাহ প্রকাশ করছে না। ভবিষ্যৎ সংসদ এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও কি মানুষ এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক দলের বদলে স্বতন্ত্রকে বেছে নেবে? নাকি গুণগত কোন পরিবর্তন জাতীয় রাজনীতিতে দেখা যাবে?
বর্তমান জাতীয় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ এবং তাদের জোটের একক আধিপত্য। ক্রমক্ষয়িষ্ণু হতে হতে বিএনপি এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। কোন আন্দোলনে যাবার মতো অবস্থা তাদের রয়েছে বলে আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে না। আবার সাংগঠনিক শক্তি কম হওয়ার কারণে বাম প্রগতিশীলদের প্রতিদিনের নিয়মিত আন্দোলন কর্মসূচিকে গায়েই মাখছে না সরকার। রাষ্ট্রে একক আধিপত্য এখন আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটের। তাই কি মানুষের ঝোঁক স্বতন্ত্রের দিকে নাকি মানুষ আসলে প্রচলিত রাজনীতির উপর আস্থা রাখতে পারছেন না? বিষয়টি অবশ্যই চিন্তার। দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি কোনদিকে যাবে তার ইঙ্গিত কি আমরা এখানে পাচ্ছি?
ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে মানুষ স্বতন্ত্রে সংগঠিত হচ্ছে। মানুষ যেখানে সংগঠিত হয় সেখানে আর সে স্বতন্ত্র থাকে না। তারপরও মানুষ ভাবছে প্রচলিতের বাইরে গিয়ে। তাই যদি হয়ত বেসংগঠিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ তাদের ক্ষমতাকে আরো শক্তিশালী করতে তাদের ভিতকে শক্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত হবে। ফলে গণতন্ত্র আরো বেশি নাজুক অবস্থানে চলে যাবার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং এগিয়ে নিয়ে যেতে রাষ্ট্রে একটি শক্তিশালী বিরোধীদল অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে তা নেই। মানুষ বিকল্প খুঁজছে কিন্তু মনের মতো বিকল্প পাচ্ছে না। ভরসা রাখতে পারছে না ছোট দলগুলোর উপর। তাই কি তারা ছুটেছে স্বতন্ত্রের দিকে কিংবা ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনের নেতৃত্বকে বেছে নিচ্ছে?
রাজনীতিসচেতন মানুষ, রাজনৈতিক বোদ্ধা-চিন্তক, এবং সর্বোপরি রাজনীতিকদেরকে ভাবতে হবে বিষয়টা নিয়ে। কোন দিকে যাবে দেশের রাজনীতি। মানুষ কি রাজনীতিবিমুখ হবে আস্তে আস্তে? নাকি মানুষ জাগবে তার আপন মহিমায়? ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল রাজনীতির নতুন যে মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে তা দেশের রাজনীতির জন্য কতটা ফিজিবল তা ভবিষ্যতের রাজনীতিই বলে দেবে। তবে প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের জন্য এটা একটা নতুন ভাবনার খোরাক। নিজেদের যোগ্যতম প্রমাণ করতে প্রচলিত দলগুলো নতুন করে ভাববে নাকি স্বতন্ত্রই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিকল্প সেটা এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।
[লেখক : সমাজকর্মী]

আরও পড়ুন