ডাক্তারের দেখা মেলে না মণিরামপুর হাসপাতালে

আপডেট: 07:47:09 23/12/2017



img
img
img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : বেলা প্রায় সোয়া ১১টা। মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তখন পর্যন্ত এসেছেন মাত্র একজন ডাক্তার, ডেন্টিস্ট। অন্য ডাক্তারদের খোঁজ নেই।
শনিবার সরেজমিনে এমন দৃশ্য দেখা যায় গুরুত্বপূর্ণ এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে। রোগীরা বলছেন, এ দৃশ্য নিত্যদিনের। ডাক্তার না পেয়ে রোগী ও তাদের স্বজনরা হন্যে হয়ে ছোটাছুটি করেন হররোজ।
বেলা সোয়া ১১টায় হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীদের টিকেট দিচ্ছিলেন মশিয়ার রহমান। তার সামনে বেশ কয়েকজন রোগীকে ভিড় জমাতে দেখা যায়। তখন হাসপাতালের কোনো কক্ষে ডাক্তার ছিলেন না। ব্যতিক্রম শুধু ডেন্টাল বিভাগে। সেখানে দেখা মেলে ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুনের।
এদিন উপস্থিত থাকলেও এই ডাক্তারের বিরুদ্ধে নিয়মিত হাসপাতালে না আসার অভিযোগ অনেক পুরনো। দাঁতের সমস্যা নিয়ে রোগীরা হাসপাতালে এসে চিকিৎসা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যান। তবে যশোরের চেম্বারে তিনি নিয়মিত।
শনিবার ডেন্টাল বিভাগের সহকারী ছুটিতে থাকায় ডেন্টিস্ট মামুন হাসপাতালে আসেন বলে কর্মচারীরা জানান।
দুপুরের আগে বহির্বিভাগে ডাক্তারদের কয়েকটি রুম খোলা দেখা যায়। কিন্তু কোনো কক্ষে চিকিৎসককে দেখা যায়নি। আর গাইনি ডাক্তার রেবেকা সুলতানার কক্ষে তালা ঝুলতে দেখা যায়। গত কয়েকদিন ধরে তার কক্ষে এভাবেই তালা ঝুলছে বলে রোগীরা জানান। একইভাবে তালা ঝুলছে প্যাথলজি বিভাগেও। বহির্বিভাগে ডাক্তারদের বদলে রোগী দেখছিলেন তিনজন সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার।
হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন উপজেলার খানপুর এলাকার রমণীরানি (৫৫)। একঘণ্টা ধরে তিনি ঘুরেও ডাক্তার খুঁজে পাননি।
রমণীর স্বামী বিনয় বলেন, ‘গত সপ্তায় আমার স্ত্রীকে দুই নম্বর কক্ষে দেখিয়েছিলাম। আজ (শনিবার) ডাক্তার আবার আসতে বলেছিল। এখন দেখি ডাক্তার নেই।’
দুই নম্বর কক্ষের বাইরে ডা. রাজিবকুমার পালের সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা গেছে।
উপজেলার মোল্লাডাঙ্গা গ্রামের রোস্তম আলী ভূঁইয়া (৭০) এসেছিলেন মেডিসিনের ডাক্তার দেখাতে। তিনি ডাক্তার না পেয়ে জরুরি বিভাগ থেকে এক সহকারী মেডিকেল অফিসারের কাছে চিকিৎসা নেন।
মুন্সি খানপুর গ্রামের গৃহবধূ রোজিনা এসেছিলেন আঙুলের সমস্যা নিয়ে। উদ্দেশ্য ছিল চর্ম বিশেষজ্ঞ ডা. শফিউল্লাহ সবুজকে দেখানো। টিকিট নেওয়ার পর জানতে পারেন ওই ডাক্তার নেই।
জয়পুর গ্রামের আব্দুল মজিদ (৫৫) হাতের ব্যথা নিয়ে এসে জানতে পারেন ডাক্তার নেই। রক্ত পরীক্ষা করাতে এসে হাকোবা গ্রামের শেখর কুণ্ডু দেখেন, প্যাথলজি বিভাগে তালা ঝুলছে।
বহির্বিভাগে টিকিট বিক্রেতা মশিয়ার রহমান জানান, বেলা সাড়ে ১১টার মধ্যে ৪৬ জনকে টিকিট দেওয়া হয়েছে। আরো কয়েকজন সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ডাক্তার না থাকায় রোগীদের জরুরি বিভাগে পাঠানো হচ্ছে। সেখানে ডা. রেহনেওয়াজ রোগী দেখছেন। তবে, বহির্বিভাগের ডাক্তাররা কোথায় সেটা জানাতে পারেননি মশিয়ার।
জরুরি বিভাগে গিয়ে ডা. রেহনেওয়াজকে পাওয়া যায়নি। রোগীরা জানান, তিনি তিন নম্বর কক্ষে অবস্থান করছেন। আর দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মিরাজ নামে এক শিশু জরুরি বিভাগে কাঁদছে। ওই কক্ষে তার স্বজনদের ভিড়। মিরাজকে চিকিৎসা দিচ্ছেন সহকারী মেডিকেল অফিসার ইফতেখার রসুল।
ডেন্টিস্ট আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমি আজকে আছি। আগামীকাল (রোববার) সকাল দশটা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত হাসপাতালে থাকব।’
‘মণিরামপুরে দাঁতের ভালো চিকিৎসা নেই। রোগীকে যশোরে আমার চেম্বারে পাঠান। বিনা পয়সায় দেখে দেবো,’ যোগ করেন ডা. মামুন।
এদিকে, আজ শনিবার সারা দেশে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের ভিটামিন এ প্লাস ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। অন্যান্য বছর এই উপলক্ষে মণিরামপুরে র‌্যালি বা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হলেও এবার তা দেখা যায়নি। সকাল আটটা থেকে টিকা খাওয়ানো শুরু হওয়ার কথা থাকলেও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আব্দুল গফ্ফার দেরিতে আসায় হাসপাতালে এই কার্যক্রম দেরিতে শুরু হয়। অনেকে তাদের বাচ্চাদের এনে অপেক্ষা করে ফিরে গেছেন বলে সেখানে উপস্থিতরা জানান।
তবে ক্যাপসুল খাওয়ানোর কাজে নিয়োজিত সেবিকা রাশিদা আক্তার বলেন, ‘আমরা সকাল নয়টায় ক্যাপসুল খাওয়ানো শুরু করেছি।’
জানতে চাইলে মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. আব্দুল গফ্ফার বলেন, ‘আমি ফিল্ডে ছিলাম। তাই আসতে দেরি হয়েছে। আমরা এবার ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর ব্যাপারে কোনো আয়োজন রাখিনি।’
চিকিৎসকদের অনুপস্থিতির ব্যাপারে ডা. গফ্ফার বলেন, ‘হাসপাতালে ডাক্তার আছেন মোট পাঁচজন। তাদের মধ্যে দুইজন প্রশিক্ষণে গেছেন, একজন ছুটিতে। আর প্যাথলজিস্ট আনিসুর রহমান একদিনের ছুটি নিয়েছেন।’
যদিও হাসপাতালে মেডিকেল অফিসারের পোস্ট রয়েছে ২২টি।
এই ব্যাপারে বক্তব্য জানতে যশোরের সিভিল সার্জন ডা. দিলীপকুমার রায়ের মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

আরও পড়ুন