ডা. সুমনের মৃতদেহ মিললো, হত্যা বলে অভিযোগ

আপডেট: 02:17:52 10/01/2017



img

মাগুরা প্রতিনিধি : নিখোঁজের সাত দিন পর ঢাকা মেডিকেলের হিমঘরে পাওয়া গেল ডা. সুমন সিকদারের মৃতদেহ। সুমন (২৮) মাগুরার শ্রীপুরের দারিয়াপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
সোমবার রাতে সুমনের হতভাগ্য বাবা মাগুরা সদরের বেঙ্গা গ্রামের সুকুমার সিকদার ছেলের মৃতদেহ শনাক্ত করেছেন বলে জানান মাগুরা সদর থানার এসআই তরিকুল ইসলাম। এর আগে তার ফুফাতো ভাই ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বামনআইল গ্রামের বাসুদেব বিশ্বাস তার লাশ শনাক্ত করেন।
অবিবাহিত সুমন মাগুরা শহরের কলেজপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। গত সোমবার বিকেলে ডা. সুমন মাগুরা থেকে নিখোঁজ হন। পরদিন সুমনের বাবা সুকুমার সিকদার মাগুরা সদর থানায় জিডি করেন।
মাগুরা সদর থানার এসআই তরিকুল ইসরাম জানান, ঢাকার শাহবাগ থানা থেকে সোমবার দুপুরে মাগুরা সদর থানায় জানানো হয়, গত মঙ্গলবার থেকে ঢাকা মেডিকেলের হিমঘরে একটি মৃতদেহ রয়েছে। যার পকেটে রাখা আইডি কার্ডে নাম সুমন সিকদার, পিতা : সুকুমার সিকদার, ঠিকানা সোনাডাঙ্গা, খুলনা লেখা আছে। তার বাবার ভাষ্য মতে, খুলনা মেডিকেলে পড়াকালে ওই কার্ডটি তৈরি বিধায় ঠিকানা মাগুরার স্থলে সোনাডাঙ্গা লেখা রয়েছে। এই খবরের সূত্র ধরে তাৎক্ষণিকভাবে সুমনের বাবাকে নিয়ে তিনি ঢাকায় রওনা হন। রাত পৌনে ৭টায় দিকে তারা শাহবাগ থানায় পৌঁছান। পরে তার বাবা মেডিকেলে গিয়ে নিজের ছেলের মৃতদেহটি শনাক্ত করেন। এর আগে দুপুরে সুমনের ফুফাতো ভাই ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বামনআইল গ্রামের বাসুদেব বিশ্বাস মৃতদেটি সুমনের বলে প্রাথমিকভাবে পুলিশ ও পরিবারকে নিশ্চিত করেছিলেন। রাতেই আইনি প্রক্রিয়া শেষে মৃতদেহটি মাগুরা আনা হবে বলে এসআই তরিকুল জানান।
সুমনের ফুফাতো ভাই ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বামনআইল গ্রামের বাসুদেব বিশ্বাস সন্ধ্যার পর মোবাইল ফোনে ঢাকা শাহবাগ থানা থেকে এই প্রতিবেদককে জানান, তিনি নিজে সুমনের মৃতদেহ চিহ্নিত করেছেন। তার মৃতদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।
বাসুদেব জানান, পুলিশের ভাষ্য, গত ৩ জানুয়ারি বেলা ১১টায় আজিজ সুপার মাকের্টের চতুর্থ তলা থেকে পুলিশ সুমনের মৃতদেহটি উদ্ধার করে। এ সময় তার চার হাত-পা ভাঙা ছিলো। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত চিহ্নও ছিল। এটি হত্যাকা- বলে বাসুদেব দাবি করেন।
সুমনের বাবা সুকুমার সিকদার জানান, খুলনা মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশ করার পর ৩৩তম বিসিএস-এ উত্তীর্ণ হয়ে সুমন মাগুরার শ্রীপুরের দারিয়াপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চাকরিতে যোগ দেন। গত সোমবার বিকেলে কর্মস্থল (দারিয়াপুর হাসপাতাল) থেকে সে মাগুরা শহরের কলেজপাড়ার বাসায় ফিরে কিছুক্ষণের মধ্যে নিজের মোবাইল ফোনটি রেখে বাসা থেকে বের হয়ে যান। এরপর থেকে গত সাত দিনেও তার কোনো খোঁজ মেলেনি। সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। সুমন নিখোঁজের ব্যাপারে গত মঙ্গলবার তিনি মাগুরা সদর থানায় জিডি করেছিলেন।

একটি পরিবারের স্বপ্নের মৃত্যু
মাগুরা সদর উপজেলার রাঘবদাইড় ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম বেঙ্গা। বেঙ্গা গ্রামের গরিব কৃষক সুকুমার সিকদারের দুই ছেলে-মেয়ের মধ্যে সুমন বড়। ছোট বেলা থেকে অত্যন্ত মেধাবী সুমনের স্কুলজীবন শুরু বেঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয় পাশে লক্ষ্মীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। কিন্তু নানা টানাপড়েনে যখন তার লেখাপড়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তখন সহায়তার হাত বাড়ান ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মুনুড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক মামা অরবিন্দু বিশ্বাস। তিনি সুমনকে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করান মুনুড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। বরাবর ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া সুমন সেখান থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাস করে। পরে মামার সহযোগিতায় সুমন ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাশ করেন। পরে খুলনা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেন ২০১৩ সালে। পরের বছর ঢাকা বঙ্গবন্ধু মেডিকেল থেকে মেডিসিনের ওপর এফসিপিএস পার্ট ওয়ান শেষ করেন। ইতিমধ্যে ৩৩তম বিসিএস-এ উত্তীর্ণ হয়ে মাগুরার শ্রীপুরের দারিয়াপুর উপজেলার ৫০ শয্যা সরকারি হাসপাতালে চাকরিতে যোগ দেন। একই সঙ্গে এফসিপিএস পার্ট টু সম্পন্ন করছিলেন।
কাকা সমরেশ সিকদার জানান, সুমনের একমাত্র বোন সন্ধ্যা সিকদার খুলনা বিএল কলেজে গণিত দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। তার স্বপ্ন ছিলো বোনকে পড়াশুনা করিয়ে ভালো ঘরে বিয়ে দিতে।
সুমনকে ঘিরেই ছিলো দরিদ্র পরিবারের ভবিষৎ স্বপ্ন। কেবল লেখাপড়া শেষ করে তিনি পরিবারের হাল ধরেছিলেন। কিন্তু তার এই অকাল মৃত্যুতে গোটা পরিবারের সব স্বপ্ন ধূলিস্মাৎ হয়ে গেল বলে জানান স্বজনরা।

আরও পড়ুন