ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় : সিস্টেমে ধস

আপডেট: 03:08:59 14/11/2016



img

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়কে বিশ্লেষকেরা নজিরবিহীন হিসেবে অভিহিত করছেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক ইতিহাসে এটা সবচেয়ে অবিশ্বাস্য রাজনৈতিক ঘটনা । কিন্তু ট্রাম্পের জয় কি সত্যিই পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল? সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন রাজনীতিতে যেসব সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছিল, সেগুলো বিবেচনায় নিলে ট্রাম্পের জয়কে একেবারে স্বাভাবিক পরিণতিই বলা যায় ।
‘যুক্তরাষ্ট্রের সিস্টেম’ এতোদিন ধরে প্রচার-প্রচারণাসহ নানা মাধ্যমে ধামাচাপা দিয়ে আসছিল যে, ওই সমাজটিতে কোনো বিভক্তি নেই, বিভাজন নেই, কোনো ভাঙন নেই। কিন্তু এই নির্বাচনের অনিবার্য ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত বিভক্তি, ভাঙন আর ফাটল এখন স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র আর ঐক্যবদ্ধ সমাজ নয়; বিভক্ত। এই বিভক্তি আর ফাটল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকসহ সব ক্ষেত্রেই। ওই সমাজটিতে ধনী-গরিবের, সাদা-কালোর অর্থাৎ বর্ণবৈষম্যের, নারী-পুরুষের, বিশ্বাস আর আস্থার এমনকী সামগ্রিকভাবে বিভক্তি বিদ্যমান । ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই সংকটকবলিত সমাজেরই সত্যিকারের একজন প্রতিনিধি, এক বড় মাত্রার উদাহরণ, প্রতিচ্ছবি।
যদিও আশ্বাস রয়েছে, আশ্বস্ত করা হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্রকে ‘‘গ্রেট এগেইন’’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে; কিন্তু বহু মার্কিনির এতে রয়েছে অবিশ্বাস আর অনাস্থা । এ জন্যই তারা মাঠে নেমেছেন, প্রতিবাদ করছেন । যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ভোটের ইতিহাসে এ ধরনের অবিশ্বাস-অনাস্থা রীতিমতো অবিশ্বাস্য বলেই তারা মনে করছেন । সামগ্রিকভাবে বলা যায়, নির্বাচনের ফলাফল হচ্ছে ভাঙনকবলিত সিস্টেমে ধস ।
আর এই সিস্টেমের ধস উপলব্ধি করে, ভাঙনকবলিত সমাজের প্রতিচ্ছবি দেখে সমগ্র বিশ্ব এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে ।
এসব সঙ্কট প্রকটভাবে চোখে পড়েনি; বরং চাপা পড়ে ছিল । বার্নি স্যান্ডার্সদের চোখে অবশ্যই পড়েছিল এবং তারা প্রবলভাবে তা বলেছিলেন । স্যান্ডার্স তৃতীয় কোনো ধারার সৃষ্টি করে রিপাবলিকান প্রার্থীর জয় আগে-ভাগে নিশ্চিত না করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি থেকে মনোনয়ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্ধারে নেমেছিলেন । কিন্তু দুর্ভাগ্য তার এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির; সেইসাথে আমেরিকা ও বিশ্ববাসীরও । তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। ফলাফল এখন সবার সামনে ।
স্যান্ডার্স সঙ্কটগুলো চাপা না রেখে সমাধানের কথা বলেছিলেন । তিনি মনোনয়ন লাভের প্রয়াসে যেসব প্রশ্ন ছুড়েছিলেন, তাতে মার্কিন যুবসমাজে চমক সৃষ্টি হয়েছিল। এসব প্রশ্ন ছিল তাদের মনেও। ফলে তাদের মধ্যে জোয়ারের সৃষ্টি হয়েছিল। হিলারি ক্লিনটন কিন্তু এসব সঙ্কট সমাধানের দিকে যাননি । ফলে ভোটাররাও তার সাথে চলতে মন থেকে উৎসাহ পায়নি । হিলারি বরং নতুন নতুন সঙ্কট সৃষ্টি করেছেন । একদিকে নিজের অবৈধ উপার্জন, ই-মেইল কেলেঙ্কারিতে বিশ্বাসযোগ্যতা খুইয়েছেন, অন্যদিকে ট্রাম্পের উল্টা-পাল্টা কথা ও কাজ থেকে ফায়দা হাসিলের সহজ পথে চলতে থাকায় নতুন নতুন জটিলতায় পড়েছেন।
বিশ্লেষকেরা এখন এই ফলাফল নানাভাবে বিশ্লেষণ করে বোঝাতে চাইছেন কেন এমনটা হলো। তারা মোটামুটিভাবে বিভিন্ন বর্ণগত ও পরিচিতিমূলক গ্রুপে ভোটারদের বিভক্ত করে তাদের বক্তব্যের যৌক্তিকতা প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তারা এই সত্যটা অগ্রাহ্য করছেন, নির্বাচনটা পরিণত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিপর্যস্ত সামাজিক সঙ্কট ও পঙ্কিলতার ব্যাপারে একটা গণভোট। আর তাতে ট্রাম্প ঝোপ বুঝে কোপ দিতে পেরেছেন এবং বাজিমাত করেছেন।
ট্রাম্প কিন্তু নিজে কোনো ফ্যাক্টর নন। তিনি বরং একটি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই গোষ্ঠীটি হলো যুদ্ধবাজদের দল। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধবাজ অর্থনীতি হিসেবে দেখতে চায়। যুদ্ধের ‘ম্যাকানিজম’ বহাল রাখতে হলে তাদের এমন একজন প্রার্থীর প্রয়োজন ছিল। ট্রাম্পকে নির্বাচনী প্রচারকালে প্রায়ই আবোল-তাবোল বকতে দেখা যেত। একটু ভালোভাবে বিচার করলে দেখা যাবে, এগুলো মোটেই প্রলাপ ছিল না। অনেকের মনের কথাই তিনি এভাবে প্রকাশ করে দিয়েছেন।
কাজেই ট্রাম্পের বিজয় সত্যিকার অর্থে কোনো অঘটন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে পরাশক্তিটি যেভাবে চলছিল, তার স্বাভাবিক পরিণতি ফুটে উঠেছে এই ফলাফলে।
এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শ্রেণিযুদ্ধ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, সামরিকবাদ এবং পুলিশি রাষ্ট্রের নেতৃত্বে থাকবেন। নির্বাহী শাখা ছাড়াও কংগ্রেসের উভয় কক্ষ, সুপ্রিম কোর্টসহ যুক্তরাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান চলে যাবে চরম ডানপন্থীদের হাতে। ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকা ‘আবার গ্রেট’ হবে না, ঐক্যবদ্ধ থাকবে না, বরং নানাভাবে বিভক্ত হয়ে জঘন্য ধরনের পঙ্কিলতায় ডুবে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজ্যে সীমিত ভোটাধিকার, গর্ভপাতের অধিকার, অভিবাসন এবং এমনকী ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নিয়ে আলোচনা করার সুযোগও সম্ভবত আর থাকলো না।
এই কিছু দিন আগে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের সরে যাওয়া নিয়ে হৈ চৈ হয়েছিল। এর ফলে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ভেঙে যাচ্ছে বলেও অনেকে মনে করেছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে খোদ যুক্তরাষ্ট্রই ভয়ঙ্করভাবে এমনটা প্রত্যক্ষ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৫০ বছর আগে যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, আসলে সেটা এখনো থামেনি। ধনী-গরিব লড়াইয়ের পাশাপাশি প্রকাশ্য রাজপথে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের কৃষ্ণাঙ্গদের গুলি করে হত্যার ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, পুলিশি কুকুরের হানা, মরিচ স্প্রে, টেসার বুলেট নিক্ষেপ, গুলিবর্ষণ ইত্যাদি শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় আফ্রিকান-আমেরিকানদের দিকে তাক করা হয় তিন গুণ বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২৬টি রাজ্যে শ্রমিকদের ইউনিয়ন করতে দেওয়া হয় না। এর ফলে এসব রাজ্যে আয় বৈষম্য সবচেয়ে বেশি। এসব রাজ্যেই শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত।
অনেক রাজ্যে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এ দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ফ্লোরিডা। সেখানে এখনই দশ লাখের বেশি লোকের ভোটাধিকার নেই। বঞ্চিতদের বেশির ভাগই আফ্রিকান-আমেরিকান। নানা বিধিনিষেধের বেড়াজাল দিয়ে এসব লোককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
এসব সমস্যার আর সুরাহা হচ্ছে না, এমনটাই ধরে নেওয়া যায়। অনিশ্চয়তার পথে যুক্তরাষ্ট্র গিয়েই সবকিছুর সমাপ্তি ঘটবে না। তারা অবিশিষ্ট বিশ্বকেও একই দিকে নিয়ে যেতে পারে। সেটা আরো বড় ভয়ের কারণ।
(আমাদের বুধবার থেকে)

আরও পড়ুন