ড্রাগন চাষে বিপুল মুনাফা চৌগাছার ইসমাইলের

আপডেট: 01:59:33 24/08/2017



img
img

রহিদুল ইসলাম খান, চৌগাছা (যশোর) : থাই পেয়ারার পর এবার ড্রাগন চাষে সাফল্য অর্জন করেছেন চৌগাছার যুবক ইসমাঈল।
২০১৫ সালে দুই বিঘা জমিতে ড্রাগন চাষের মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ শুরু করেন চৌগাছার শিক্ষিত যুবক এনামুল হোসেন ওরফে ইসমাইল। বর্তমানে তার ড্রাগন বাগান নয় বিঘায় বিস্তৃত। চলতি বছরে দুই বিঘা জমির ড্রাগন এপর্যন্ত বিক্রি করেছেন সাত লাখ টাকায়। এ মৌসুমে আরো দুই লাখ টাকার ড্রাগন বিক্রি করতে পারবেন বলে আশাবাদী ইসমাইল।
উপজেলার তিলকপুর গ্রামের বাসিন্দা ইসমাইল গ্রামের বল্লভপুর বাঁওড়ের পাশে মাঠে ড্রাগন বাগান করেছেন।
জগন্নাথ কলেজ থেকে ২০০০ সালে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ইসমাইল চার ভাই, এক বোনের সবার বড়। বরাবরই ইচ্ছা ছিল কৃষিভিত্তিক ব্যতিক্রমী কিছু করার। লেখাপড়া শেষে কিন্তু বাস্তবতার কারণে ২০০৮ সালে চাকরি নেন একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে। ২০১৩ সালে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় একটি পা ভেঙে যায় তার। দীর্ঘদিন বিছানায় পড়ে থাকার সময় ছোটবেলার চিন্তাটা মাথায় উঁকি দিতে থাকে বারবার। সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন গ্রামে। গড়ে তোলেন থাই পেয়ারা, আপেল কুল ও বাউ কুলের বাগান। পেয়ারাবাগান ছিল ২০ বিঘা জমির ওপর। কুলের বাগান সাত বিঘা। এসবের মধ্যেই তার মাথায় চিন্তা আসে ‘সবাই তো পেয়ারা আর কুলের বাগান করছে। আমি না হয় নতুন কিছু করি!’
ইসমাইলের ভাষায়, ‘সব সময় মনে হতো নতুন কিছু করি। নিজের স্মার্ট ফোনে ইন্টারনেটে সার্চ দিতে থাকলাম। সেখানে দেখলাম ড্রাগন চাষের কথা। মনে ধরলো। ইন্টারনেটে বারবার পড়ি আর ভাবতে থাকি। এক কথায় ইন্টারনেটে পড়েই ড্রাগন চাষে উদ্বুদ্ধ হই।’
‘২০১৫ সালে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারা এনে নিজের দুই বিঘা জমিতে চাষ করি। দুই বিঘা জমিতে প্রথম বছর সব মিলিয়ে খরচ হয় চার লাখ টাকার মতো। দ্বিতীয় বছরে জমিতে সার-পানি ও পরিচর্যা বাবদ খরচ হয় আশি হাজার টাকা। এবছর প্রথম ফল হয়। ফল বিক্রি করি প্রায় তিন লাখ টাকার। নতুন হওয়ায় উৎপাদন কম হয়। তাছাড়া বুঝতেও কিছুটা সময় লেগেছে। আমি প্রথম বছরে বাঁশের খুঁটির মাচা দিয়েছিলাম। সেটা ভেঙে কংক্রিটের খুঁটি দিই। চলতি বছর জমিতে খরচ করেছি এক লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত বিক্রি করেছি চার লাখ টাকার ড্রাগন। বাগানে যে ফল আছে তা আরো দুই লাখ টাকায় বিক্রি করতে পারবো,’ বলছিলেন ইসমাইল।
দুই বিঘা জমিতে সফলভাবে চাষ করতে পারায় ইসমাইল ড্রাগন বাগানের বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন আরো সাত বিঘা জমিতে। নতুন বাগানে আগামী বছর ফল আসবে বলে আশাবাদী তিনি। বললেন ‘আমার দেখাদেখি স্থানীয় আরো কয়েকজন চাষি ড্রাগন চাষ শুরু করেছেন।’
দেখতে অনেকটা ক্যাকটাসের মতো ড্রাগনের কাটিং লাগাতে হয় অক্টোবর মাসে। এক বছর ছয় মাসের মাথায় মার্চ-এপ্রিল মাসে গাছের ফল বিক্রি শুরু করা যায়। আগস্ট-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গাছের ফল বিক্রি করা যায়। একবার লাগিয়ে সঠিক পরিচর্যা করলে একটানা ত্রিশ বছর ফল দেয় ড্রাগন গাছ।
ইসমাইল জানালেন, তিন বছরের অভিজ্ঞতায় মনে হচ্ছে ‘বিঘা প্রতি বছরে পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ করতে পারলে পাঁচ-ছয় লাখ টাকার ড্রাগন বিক্রি করা যাবে। বর্তমান বাজারে ৪০০ টাকা কেজি দরে পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ড্রাগন ফল।
ইসমাইল তার বাগান থেকে ফল সংগ্রহ করে সরাসরি ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। রাজধানীতে ফলটির রয়েছে বিপুল চাহিদা। বর্তমানে স্থানীয় বাজারেও বিক্রি হচ্ছে ড্রাগন ফল। সপ্তাহে চৌগাছা বাজারে তার বাগানের ১০-১২ কেজি ড্রাগন বিক্রি হয়।
বর্তমানে ইসমাইলের বাগানে এক হাজার ৮০০ খুঁটির ওপর মাচা রয়েছে। বাগানের পরিধি আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার।
ইসমাইলের দাবি, দেশের অন্য চাষিদের থেকে তার আবাদের পদ্ধতিও ব্যতিক্রম। তিনি জানান, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঝে মাঝে তার বাগান পরির্দশনে আসেন। তবে তিনি অন্য যারা তার আগে চাষ করেছেন তাদের সঙ্গেই পরামর্শ করে থাকেন।
চৌগাছা উপজেলা কৃষি অফিসার কেএম শাহাবুদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘দেশে অপ্রচলিত একটি ফল ড্রাগন। ক্যাকটাস গোত্রের এই ফলের গাছ দেখে সবাই একে ‘সবুজ ক্যাকটাস’ বলেই মনে করেন। মধ্য আমেরিকায় এ ফল বেশি পাওয়া যায়। ড্রাগন ফল দেখতে খুব আকর্ষণীয়। আমেরিকাসহ এশিয়া মহাদেশের অনেক দেশে বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন ফল চাষ হচ্ছে।’
তিনি জানান, ড্রাগন ফলে ক্যালোরি খুব কম থাকায় এ ফল ডায়াবেটিস ও হৃদরোগীদের জন্য ভালো। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি ও আয়রন রয়েছে। যে কারণে শরীরের চর্বি ও রক্তের কোলেস্টরেল কমানোসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করে ফলটি। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটেসহ বড় বড় শহরের চেইন শপে ড্রাগন ফল বিক্রি হচ্ছে।
‘চৌগাছা এলাকার মাটি ড্রাগন ফলের জন্য বেশ উপযোগী। এ কারণে কৃষকদের ড্রাগন চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে,’ যোগ করেন কৃষি কর্মকর্তা শাহাবুদ্দীন।

আরও পড়ুন