তহীদ মনির একগুচ্ছ কবিতা

আপডেট: 07:33:50 03/08/2017



img

রঙধনু রঙের উষ্ণতা

তুই-ই তো শিখিয়েছিলি ইতিহাসের পাঠ
প্রথম কৈশোর সকালে,
হাতের তালুতে ধরে সূর্য উষ্ণতা
চোখের আয়নায় দেখালি উদার আকাশ।
নিছক খেলার ছলে জলে ভেজালি সময়
আর মধ্যবর্তী মাঠের কাছে
একেঁ দিলি সংসারের ছবি।
পাখির পালক রাঙা নরম ছোঁয়ায়
সমুদ্র দর্শনের মহান সাহস,
তুই-ই বুঝিয়েছিলি স্বপ্নের রঙ
গোমস্তা জীবনের রঙধনু বাসর।




নিঃসঙ্গ মানুষ

প্রতিটি মানুষের মধ্যেই বাস করে এক একজন নিঃসঙ্গ মানুষ
গভীর রাতে অথবা একাকী দুঃসময়ে ঘুম থেকে জেগে
যোগ-বিয়োগের অংক কষে হিসেব মেলে না তার।
স্তব্ধতার গভীর খাদে পড়ে থাকে তার সকল কথা
 সব চাওয়া পাওয়া!
পাশে শুয়ে থাকা বন্ধু, ভাই সন্তান অথবা মা-কন্যা কেউ পায় না
অতল অন্ধকারে সে মানুষের কান্নাঝরা দিনরাত্রির খোঁজ,
ভাষাহীন-শব্দহীন সব কিছু অলক্ষে অন্তরালে বসবাস করে তারই ঘরে।
এরপর বিলুপ্ত সবই ইতিহাস! যখন সে হারায় জীবন থেকে! চাপা পড়ে
অজস্র ব্যথা ও স্বপ্ন, হারায় কালের গহ্বরে তার চিরকালীন নিঃসঙ্গতা,
যতটা বলেছিল তার চেয়েও সহস্রগুণের না বলা কথার মালা।

(৬ এপ্রিল ২০১৭, বৃহস্পতিবার, যশোর)




মরিচিকা

অধরা শব্দগুলো রাতের স্বপ্নের মতো
মরিচিকার জাল বোনে
তিলে তিলে শতাব্দীর আয়ু অমসৃণ যন্ত্রণায়
নাগরিক ক্লিষ্টতার গম্বুজ সাজায়।

হায়! আদি ও অন্তের প্রতিপালক!
হায়! অসহায় গতিশীলতা!
ঠিকানাবিহীন হতে হতে কতটা ঘৃণার পাহাড়
পথ রোধ করে বোধ ও সত্তার গভীরে?

(বুধবার, ১১ মে ২০১৬, যশোর)




উদ্ভট পোতাশ্রয়ে ভিড়ছে জাহাজ

অতঃপর একে একে ভেঙে যাচ্ছে বিশ্বাসের বাতিঘর-
ভাঙছে ভিতরে ও বাইরে চন্দ্রাবতী রাত, দিনের সূর্য
বাতাসের ঘ্রাণ, শ্রাবণের নদী এবং কাব্যময় বাক্যগুলো।
অন্ধকারের ঐশ্বর্যে প্লাবিত হচ্ছে সততা, সম্ভ্রম ও স্বপ্ন।
প্রবল গহ্বরে অন্ধ অলি-গলিতে হা করা রক্ত লোলুপ সভ্যতা
বিপুল আয়োজনে বিসর্জনের চিতায় সাজানো সম্ভাবনার নৈবেদ্য।
যে বিশ্বাসে ঘর বাঁধে আলো-অন্ধকারের ইতিহাস
যে বিশ্বাসে উপমার মালায় শোভিত হয় সাদা-কালো
নষ্ট ঝড় আজ সহজেই বাসা বোনে রক্ত- রন্ধ্রে তার
অতঃপর সব কিছু ভেঙে উদ্ভট পোতাশ্রয়ে ভেড়ে জাহাজ।

(যশোর, বুধবার, ২৩ মার্চ ২০১৬)




প্রহর জমানো শস্যক্ষেত এবং মহাকাল

আমি তখনো প্রহর জমাতে থাকি ছোটবেলায় মাটির ব্যাংকে যেভাবে পয়সা জমাতাম
যখন দুঃখরা সজ্জিত সেনাবাহিনীর মতো মার্চপাস্ট করতে করতে এগিয়ে আসে,
জমানো প্রহরগুলো একদিন ঠিকই সাজিয়ে নেবো নিজের মতো করে মনের ভিটায়
শৈশবহীন কিশোর বেলায় মনে মনে খেলতাম শিশুতোষ খেলা।

এই যে অক্টোপাসের মতো এঁটে থাকা বিরামহীন ছুটে চলার ক্লেদাক্ত সময়
এই যে অমানবিক আতঙ্কিত পদধ্বনি যেখানে কসাই করে রাজতক্ত নির্মাণ
সেখানে অনুভূতিহীন অতিবৃষ্টিরা ফলাতে পারে না সুখময় শস্যক্ষেত
ভিত নাড়ানো রূপের পিপাসাও বাঁধে না বাসা ঘোড়দৌঁড়ের সখ্যে।

আমি প্রহর জমাতে থাকি, জমাতে জমাতে একদিন ঠাঁই করে নেবো মহাকালের ঠিকানায়
আকাশের ভাঁজে ভাঁজে নতুন আলোক শয্যা পেতে গুছিয়ে নেবো সাংসারিক দিন-ক্ষণ।

(৪ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার, যশোর)




একদা চালচিত্র – ১

নাঙল–জোয়াল জুড়ে দিয়ে আতর ধরে চাষ
চাষের জমিন মুক্তো হাসি ফসল বারো মাস,
ধামা-কুলো, পালে–ফাতি হাতনে জুড়ে থাকে
ধান-সরিষা, তিল-কাউনের গন্ধ তারা মাখে।
আউড়ি–গোলা, ছালা ভরা ক্ষমতা যেমন যার
সুখে-দুঃখে মিলে মিশে করছে জীবন পার,
খালে-বিলে নদীর পাড়ে কত ছোটাছুটি
বরইতলা, খেজুরতলায় কতই লুটোপুটি।
আমন ধানের খড়ের গাদায় ছেলে-মেয়ের দল
বনভোজনের আয়োজনে হেসেছে খলখল,
সন্ধ্যা বেলায় খেলার মাঠে নাড়ার আগুন জ্বেলে
 মিলনমেলায় মিলতো যেনো পাড়ার শত ছেলে,
বর্ষাকালে বিকেল বেলা তালের আঁটি নিয়ে
এলে-বেলে খেলাতে সব রাখতো মাতিয়ে,
গল্লা ছুট আর দাঁড়িয়া বাঁধা, বৌচি খেলা দিন
নুনদাঁড়ি আর হাডুডুতে মুছতো দুখের ঋণ।
লম্ফজ্বলা রাতের বেলা উঠোনজুড়ে আসর
মুরুব্বিদের গল্প হতো বসতো মনের বাসর
হুক্কো হাতে জনে জনে ফেলে আসা স্মৃতি
বলতে যেয়ে বাড়িয়ে দিতো হাজার রঙের প্রীতি।

(বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, যশোর)




এসো রোদ মাখি

দূরের নগরী ছেড়ে চলে এসো হৃদয় নদীর তীরে
বিষণ্ণ দিনের কবিতা ঝেড়ে ফেলে
রোদ মাখো রোদ মাখো।
বাতাসের ঘ্রাণ, সবুজ আঙিনা- ঢেউ জাগানো সুর
পুরাণ কাহিনী আমরা শুনিনি
শুনেছি, বন্দির চিৎকার।
হায়! দেবতা কাঁদে না শরম-মরমের আর্তিতে
ভজনা কার যে কেউ জানে না
আগুন জ্বালা এ বুকে।
তাই হোক তাই হোক, পুড়ুক রোম ও রোমান সবই
উড়ুক শুধু আমার ছবি আকাশজুড়ে আজ
অন্ধ সময় দেখবে না আর ।
এভাবে থাকে না ক্যালেন্ডারের পাতা পর পর
ঝড়ে ও বন্যায় উল্টায় বার বার
সেই আলোতে ভালোবাসতে শেখো।

(১১ জানুয়ারি ২০১৫, রবিবার, যশোর)



ভালোবাসার সবুজ ঘ্রাণ

এই বসন্তে ফুলে ফুলে বিকশিত হোক সবার মন
মুছে যাক আর ঘুচে যাক অন্ধ আক্রোশ নষ্ট ক্ষণ।
ছড়াক শত পাপড়ি গোলাপ ভালোবাসার রঙ মেখে
চোখের নীলে আলোর আভা করুক খেলা তাই দেখে।
বুকের ভিটায় আজন্ম সব স্বপ্নগলির দারুণ জয়
হারাবে না পথ রেখা চিহ্ন খোঁজার নেই তো ভয়।
তিলে তিলে বসন্ত দিন জমা থাকুক সকল প্রাণে
ভালোবাসার ছায়া থাকুক মায়ায় মেতে সবুজ ঘ্রাণে।

(১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, যশোর)




হাতের মুঠোয় সোনার আলো

কষ্টটুকু শুকায় যদি গল্প শোনা দিনে
কাব্য কথার ছবি আঁকি ডানা ভাঙা ক্ষণে,
উড়তে গিয়ে তাকিয়ে দেখি আকাশখানা নেই
পায়ের নীচে ধু ধু বালু মিশেছে অসীমেই ।
হতাশ রাতের গানগুলি আর সুর শোনাবে না
ভয় তাড়ানো পদ্য লিখে মন রাঙাবে না,
একটি দিনের সূর্যটাকে হাতের মুঠোয় রেখে
আপন মনে সোনার আলো দেখবো চোখে চোখে ।

(৩০ মার্চ ২০০৭, শুক্রবার)




পতনের সূত্র

এ যেন রোবোটিক ক্রাই তুমি যেমন কেঁদেছিলে ভরা মাঠের জনসভায়
রাত্রির জলসায় যখন মৃত্যুর উৎসবে রোশনাই বাড়াচ্ছিলে সদলবলে,
এভাবে যান্ত্রিক হয়ে যাওয়া তোমার পাশবালিশেরাও গবেষণা করে পতনের সূত্র
পরিবর্তনের উড়ো চিঠি হাতে নিয়ে বেশতো করেছো জড়োয়া সংসার তাই
দাম্ভিক জঙ্গলে ছলে ও কলে পানে দিয়ে নুন মারছো গুলি দুপুরকে করে রাত।




প্রতিদিন প্রতিকারহীন অন্ধকার গ্রাস করছে সব আলো

সিথানজুড়ে জেঁকে বসে আছে যৈবতী রাত
অপেক্ষার ক্লান্তিহীন এক শ্যেনদৃষ্টি যেনো উদ্ভ্রান্ত শয্যায়,
অজস্র জীবন মাথা খোড়ে নিরুদ্দেশ অন্ধকারে
তবু নির্বিকার এই প্রশস্তি খাদক মরুভূমির গাঢ় আহ্বানে।

সময়ের সমান্তরালে চলছে দুর্দশার চাষবাস প্রতিক্ষণ
আলোক আভিযাত্রীরা ভুল ঠিকানায় করছে আনাগোনা,
এখন নদীরা মাতম করে না কোনো সমাজবদ্ধতার দাবিতে
জীর্ণতার দায়ে উন্মত্ত হয় না প্রতিঘাতের আকাঙ্ক্ষায়।

ঝড়ো বিকেলগুলি রাত্রি আনে শুধুই নির্বিচারভরা রাত্রি
অনাহূত মৃত্যুর মিছিলে বাড়ছে ঋণের বোঝা প্রতিকারহীন।

(২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, সোমবার, যশোর)