তিস্তা চুক্তি ঝুলে গেছে

আপডেট: 03:04:12 28/12/2017



img

একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় তিস্তা চুক্তি সই করতে পারেননি ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মনমোহন সিংয়ের সফরসঙ্গীর দল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফলাও করেই জানান দিয়েছিলেন তিনি তিস্তার পানি ভাগাভাগি করতে রাজি নন। ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিকে উপলক্ষ করে ঢাকায় ঘুরে গেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপরও নিজের অবস্থান থেকে একচুলও সরেননি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সাফ কথা, তিস্তায় পানি নেই। বাংলাদেশকে দেব কোথা থেকে?
এমন পরিস্থিতিতে গত বছরের ডিসেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের কথা উঠলে তিস্তা চুক্তির বিষয়টি বড় হয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত সফর মাস চারেকের জন্য পিছিয়ে গেলে নতুন জল্পনা শুরু হয় তিস্তা নিয়ে। সফরের সময় যতই ঘনিয়ে এসেছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে, চুক্তিটা অন্তত এবার হচ্ছে না। ভারতের পক্ষ থেকে এ নিয়ে কোনো রাখঢাক ছিল না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লিতে পা রাখার আগের দিন সন্ধ্যায়, অর্থাৎ ৬ এপ্রিল ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এস জয়শঙ্কর বাংলাদেশের গণমাধ্যম প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলাপচারিতায় বলেন, তিস্তা চুক্তি সই হতে আরও সময় প্রয়োজন। এ পর্যন্ত এমন কোনো অগ্রগতি নেই, যাতে করে পরের ৪৮ ঘণ্টায় নাটকীয় কিছু ঘটতে যাচ্ছে। এরপরও চুক্তিটির বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতির জন্য বাংলাদেশ ৮ এপ্রিল সকালেও চেষ্টা করেছে।
শেষ পর্যন্ত ৮ এপ্রিল দিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে শীর্ষ বৈঠকের পর নরেন্দ্র মোদি সাংবাদিকদের বলেন, একমাত্র তাঁর এবং শেখ হাসিনার সরকারই দ্রুত তিস্তার পানি ভাগাভাগির সমাধান করতে পারবে। তাঁর মতে, তিস্তা শুধু ভারত আর বাংলাদেশের জন্যই নয়, দুই দেশের সম্পর্কের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। মোদির পাশে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এ বিষয়গুলো (তিস্তা চুক্তি, গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ শুরু এবং অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা) দ্রুত সমাধানের ব্যাপারে ভারতের সহযোগিতা পাব।’
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, ওই সফরে প্রতিরক্ষাই ছিল মূল বিবেচ্য, তিস্তা নয়। বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, গত বছরের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ঢাকা সফর হঠাৎ করে প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার দিল্লি সফরকে সামনে নিয়ে আসে। চীনের প্রেসিডেন্টের সফরে দুই দেশের সম্পর্ক ‘সহযোগিতার কৌশলগত অংশীদারিত্বে’ উন্নীত করার কথা বলা হয়। সি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরের পর নভেম্বরে চীন থেকে কেনা দুটি সাবমেরিন গ্রহণ করে বাংলাদেশ। এর পরপরই নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় আসেন ভারতের তখনকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকার। তাঁর ওই সফরে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি করার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়। পরের মাসেই শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের বিষয়ে কথা থাকলেও সেটি পিছিয়ে এপ্রিলে নেওয়া হয়।
শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির একান্ত আলোচনা ও আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর সরকারি পর্যায়ে সই হওয়া ২২টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার রূপরেখাসহ প্রতিরক্ষা বিষয়ে ছিল চারটি সমঝোতা স্মারক। বাংলাদেশের সমরাস্ত্র কেনাকাটার জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলারের (চার হাজার কোটি টাকা) ঋণ চুক্তি এবং তৃতীয় ঋণ চুক্তির আওতায় সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার (৩৬ হাজার কোটি টাকা) দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় এই সফরে। গত ছয় বছরে এ নিয়ে বাংলাদেশকে আট বিলিয়ন ডলার (৬৪ হাজার কোটি টাকা) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। এপ্রিলে শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় শহীদ সাত সেনানীর পরিবারকে সম্মাননা। মুক্তিযুদ্ধে ১ হাজার ৬৬১ জন ভারতীয় সেনানী শহীদ হয়েছিলেন। ভারতীয় সেনা, নৌ, বিমান ও সীমান্ত নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর মোট সাতজন শহীদকে এই সম্মাননা জানিয়ে শেখ হাসিনা প্রক্রিয়াটি শুরু করলেন। সাত শহীদকে স্মরণ ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের হাতে অভিজ্ঞানপত্র তুলে দেওয়া হয়।
এই সফরে তিস্তা চুক্তি যে সই হচ্ছে না, সেটা আগেই নিশ্চিত হওয়ায় এ নিয়ে শেষ পর্যন্ত কোনো নাটকীয়তা বাংলাদেশও আশা করেনি। তবে তিস্তার বিকল্প হিসেবে তোরসা, জলঢাকাসহ উত্তরবঙ্গের কয়েকটি নদীর পানিবণ্টনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রস্তাবে উভয় দেশের শীর্ষ পর্যায়ে খানিকটা অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছে। অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় মমতা রাজনৈতিক কারণে তিস্তা ইস্যু থেকে দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা করছেন বলে দুই পক্ষের সরকারি কর্মকর্তাদের মত। বাংলাদেশ তিন কারণে মমতার প্রস্তাবকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। প্রথমত, এটি তাঁর ব্যক্তিগত প্রস্তাব, ভারতের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব নয়। দ্বিতীয়ত, শীর্ষ বৈঠকে নরেন্দ্র মোদি যে আশ্বাস দিয়েছেন, তাতে তিস্তা চুক্তির আশু সমাধানের কথা বলা হয়েছে। তৃতীয়ত, দুই প্রধানমন্ত্রীর যৌথ বিবৃতিতে তিস্তা ছাড়া আরও সাতটি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে দুই দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের আলোচনা দ্রুত শেষ করার কথা বলা হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বাস্তবতা হলো, তিস্তা নিয়ে বাংলাদেশের চাওয়াটা আবারও ঝুলে গেল। দুপুরে নরেন্দ্র মোদি জোর দিয়ে শেখ হাসিনাকে নিয়েই চুক্তিটি সই করার আশ্বাস দেন। তবে রাতে তিস্তার বদলে তোরসা থেকে পানি নিতে শেখ হাসিনাকে বিকল্প প্রস্তাব দেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর মাধ্যমে মমতা বুঝিয়ে দিলেন, তিস্তা নিয়ে আগের অবস্থান থেকে তিনি একচুলও সরেননি। ফলে এ নিয়ে বাংলাদেশের হতাশা আছে। প্রায় ছয় বছর আগে তিস্তা নিয়ে দুই দেশ যেখানটায় রাজি ছিল, সেই অবস্থায় থেকে চুক্তিটি সইয়ের জন্য ভারতের কাছে একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা চেয়েছিল বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে শীর্ষ বৈঠক এবং এর আগের অনানুষ্ঠানিক কয়েকটি বৈঠকেও সেই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা শেষে প্রচারিত যৌথ ঘোষণায় দুই দেশের সম্পর্ককে কৌশলগত সম্পর্কের চেয়েও বেশি বলা হয়েছে। দুই দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার রূপরেখা, সমরাস্ত্র কেনাসহ চারটি সমঝোতা স্মারক সই করায় এবার প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে। ফলে এই সহযোগিতা যে এখন কৌশলগত, তাতে কোনো সংশয় নেই। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব জয়শঙ্কর বলেন, দুই দেশের সম্পর্ককে শক্তিশালী করার ব্যাপারে মনোযোগ আছে। সম্পর্কটাকে কৌশলগত সহযোগিতার নিরিখে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এই সম্পর্কটা এখন শুধু একটা ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়।
তবে তিস্তার পরিবর্তে মমতার বিদ্যুৎ বিক্রির প্রস্তাবে দিল্লির ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা কিছুটা রসিকতা করে বলেন, ‘পানি মাঙ্গা, লেকিন ইলেকট্রিসিটি মিলা। আচ্ছা হ্যায়, কুছ তো মিলা।’
ভারতের একটি কূটনৈতিক সূত্র বুধবার সন্ধ্যায় জানিয়েছে, এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর দুই দেশের সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দুই প্রধানমন্ত্রীর যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে, সার্বভৌমত্ব, সমযোগ্যতা, আস্থা ও বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের ভাতৃপ্রতীম সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারিত্বকে ছাড়িয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এটিকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সোনালি অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
[প্রথম আলোর বিশ্লেষণ]