থানায় নির্যাতন : ছবি ভাইরাল, তদন্ত কমিটি

আপডেট: 12:14:51 07/01/2017



img
img

স্টাফ রিপোর্টার : যুবককে ধরে থানায় এনে উল্টো করে ঝুলিয়ে নির্যাতনের ছবিসম্বলিত রিপোর্ট মিডিয়ায় প্রকাশ হওয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ছবিসহ এ সংক্রান্ত রিপোর্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়ে গেছে।
যশোর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনা তদন্তে কমিটি গড়া হয়েছে। পুলিশ বলছে, ছবিটি অনেক পুরনো। আবু সাঈদ নামে কাউকে সম্প্রতি ধরে এনে এমন নির্যাতন করা হয়নি। যারা এই ছবিসম্বলিত রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধও করা হয়েছে। একই সঙ্গে থানা থেকে সাংবাদিকদের আর কোনো তথ্য দেওয়া হবে না বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আর আবু সাঈদ বলছেন, তাকে ধরা হয়েছিল ঠিক। কিন্তু নির্যাতন করা হয়নি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বলছেন, উল্টো করে ঝুলানো ছবিটি সাঈদের।
বৃহস্পতিবার সকালে এক যুবককে কোতয়ালী থানার ভেতরে দুটো টেবিলের মাঝখানে মোটা একটি লাঠির মাধ্যমে উল্টো করে ঝুলানো একটি ছবি সংবাদকর্মীদের কাছে আসে। রাতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছবিসম্বলিত রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, ঝুলিয়ে যে যুবককে নির্যাতন করা হয়, তার নাম আবু সাঈদ। বাড়ি যশোর সদর উপজেলার তালবাড়িয়া কলেজপাড়ায়।
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় লোকজন জানান, ৫ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৯টার দিকে তালবাড়িয়া কলেজপাড়া থেকে সাঈদকে আটক করে নিয়ে যান সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যরা। কোতয়ালী থানার কথিত সিভিল টিমের সদস্য এসআই নাজমুল ও এএসআই হাদিকুর রহমান তাকে ধরে নিয়ে যান বলে তারা নিশ্চিত করেন।
অভিযোগ ওঠে, তারা সাঈদকে হাতকড়া পরিয়ে দুই টেবিলের মাঝখানে উল্টো করে ঝুলিয়ে মারধর করেন। একইসঙ্গে তার পরিবারের কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে তাকে পরদিন ছেড়ে দেওয়া হয় থানা থেকে।
অভিযুক্ত এসআই নাজমুল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বৃহস্পতিবার রাতে তিনি জানান, তিনি গত দুদিন ধরে ঢাকায় অবস্থান করছেন। সাঈদ নামে কাউকে আটক বা ঘুষ গ্রহণের সঙ্গে তিনি জড়িত নন।
এএসআই হাদিবুর রহমান বলেন, ‘এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। সাংবাদিকদের ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।’
এ বিষয়ে সাঈদের বড়ভাই আতিয়ার রহমান বলেন, ‘বুধবার রাতে আমার ভাইকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু কোনো অভিযোগ না থাকায় পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়। পুলিশ কোনো টাকা-পয়সা নেয়নি কিংবা তাকে মারধরও করেনি।’
একই কথা বলেন সাঈদের স্ত্রী বিলকিস খাতুন ও ছোটভাই আশিকুর রহমান। আশিকুর রহমান জানান, ফেসবুকে যে ছবি দেখা যাচ্ছে- সেটা তার ভাইয়ের না।
তবে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একব্যক্তি জানান, শুক্রবার সকালে সাংবাদিকরা আসার আগেই এলাকায় পুলিশ এসেছিল। তারা সাঈদদের বাড়িতেও যায়। ভয়ে এখন ওই বাড়ির লোকজন সত্য কথা বলছে না।
স্থানীয় বাসিন্দা হাফিজুর রহমান ও কামরুল ইসলাম জানান, তাদের দেখা অনুযায়ী সাঈদ খুব খারাপ ছেলে নয়। সে একটু-আধটু নেশা করে; তবে মাদকের ব্যবসা করে কি না তা তাদের জানা নেই।
এই ওয়ার্ডের (নয় নম্বর ওয়ার্ড, নওয়াপাড়া ইউনিয়ন) ইউপি সদস্য আসমত আলী চাকলাদার বলেন, ‘আমি শুনেছি বুধবার রাতে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। ৪৯ কিংবা ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে সে ছাড়া পেয়েছে।’
তিনি জানান, সাঈদের বিরুদ্ধে এলাকায় ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। আগে সাঈদ ফেনসিডিল ব্যবসা করতো বলে তার কাছে অভিযোগ রয়েছে। ফেসবুকে উল্টো করে যে যুবকের ছবি দেওয়া হয়েছে- সেটি সাঈদের বলে তিনিসহ বাজারের কয়েকজন শনাক্ত করেন।
এ বিষয়ে কোতয়ালী থানার ওসি ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘ছবিটি ইদানীং তোলা নয়, বেশ পুরনো। আর এসআই নাজমুল সিসি নিয়ে ঢাকায় রয়েছেন একটি মামলার সাক্ষ্য দিতে। সুতরাং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয়।’
আবু সাঈদ সাংবাদিকদের কাছে বলেন, ‘‘বুধবার রাতে এলাকার একটি চায়ের দোকান থেকে পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যায়। পরে থানায় নিয়ে আমি ‘দুই নাম্বার’ ব্যবসা করি কি না জানতে চায়। আমি তো ওইসব ‘দুই নাম্বারি’ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নই। সেকারণে পরদিন রাত ৮টার দিকে আমাকে ছেড়ে দেয়। আমাকে টর্চার করেনি পুলিশ।’’
শুক্রবার বেলা ১টার দিকে স্থানীয় প্রেসক্লাবে আসেন আবু সাঈদ, তার স্ত্রী এবং বৃদ্ধা মা। তারা উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন।
সাঈদ দাবি করেন, ভাইরাল হয়ে যাওয়া ছবিটা তার নয়। এ বিষয়ে প্রমাণস্বরূপ তিনি তার হাত এবং পশ্চাদ্দেশ সাংবাদিকদের দেখান।
তিনি বলেন, ‘ছবিতে যাকে দেখা যাচ্ছে তিনি শারীরিকভাবে আমার চেয়ে মোটা। আর সেদিন রাতে আমাকে পুলিশ লুঙি পরিহিত অবস্থায় আটক করে। তাছাড়া ওই ধরনের জিন্স বা টি শার্ট আমার নেই।’
এরপরই বেলা দেড়টার দিকে প্রেসক্লাবে আসেন কোতয়ালী থানার ওসি ইলিয়াস হোসেন।
তিনি বলেন, ‘ছবিটি ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশের পক্ষ থেকে তালবাড়িয়ার আবু সাঈদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান ঘটনাটি সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন। তিনি এই ঘটনা তদন্তে দুই সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছেন। কমিটির সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শহীদ মো. আবু সরোয়ার এবং ক সার্কেলের এএসপি নাইমুর রহমান। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
‘যারা এই ছবিসম্বলিত সংবাদ প্রকাশ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি-সম্পাদকের কাছে অনুরোধ করেছেন এসপি’, বলছিলেন ওসি মো. ইলিয়াস হোসেন।
এদিকে, বেলা আড়াইটার দিকে সুবর্ণভূমির সংবাদকর্মীরা কোতয়ালী থানায় যান বিষয়টি নিয়ে আরো খোঁজ-খবর করতে। কিন্তু থানা থেকে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, ‘এখন থেকে থানায় নয়, কোনো তথ্য জানতে হলে এসপি সাহেবের কাছে যাবেন।’

আরও পড়ুন