দখলে দূষণে মৃতপ্রায় চিত্রা

আপডেট: 02:00:32 04/05/2019



img
img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : নদীর মধ্যে বড় বড় পুকুর। পুকুর পাড়ে লাগানো হয়েছে বনজ গাছ। গাছগুলো এতোটা বড় হয়ে উঠেছে যে, নদীকেই আড়াল করে ফেলেছে। একপাশ থেকে আরেক পাশ দেখা যায় না। এই নদীর জায়গা দখল করেই নির্মাণ করা হয়েছে অসংখ্য ভবন। বসানো হয়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এখনো চলছে এই দখল প্রক্রিয়া। যেন কারো কিছুই বলারও নেই, করারও নেই।
এভাবে দখলের পর দখল করায় সংকুচিত হয়ে গেছে দক্ষিনাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ চিত্রা নদী। দখলদাররা আস্তে আস্তে দখল করে নদীটিকে প্রায় গ্রাস করে ফেলেছে। একসময় যে নদীতে লঞ্চ-স্টিমার চলতো তা এখন খালে পরিণত হয়েছে। দখলদাররা প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছে না। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ নানা অজুহাতে এই দখল অব্যাহত রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ঝিনাইদহের নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরে খোঁজ নিয়ে দখলের সঠিক হিসেব পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সারোয়ার জাহান জানান, সম্প্রতি তারা দখলদারদের একটি তালিকা তৈরি করেছেন। সেখানে চিত্রা নদীতে কয়েকটি পুকুর আছে উল্লেখ রয়েছে। তালিকায় দেখা গেছে, জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার সিংদহ গ্রাম এলাকায় আট দখলদারের দখলে আটটি পুকুর রয়েছে।
সরেজমিনে নদী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কালীগঞ্জের চাঁচড়া এলাকা থেকে শালিখা পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় পাঁচ কিলোমিটার লম্বা নদীর দুই পাড়জুড়ে চলেছে এই দখলের প্রতিযোগিতা। এখানে নদীর জায়গায় পুকুর কেটে মাছ চাষ করা হচ্ছে। নদী ভরাট করে নার্সারি প্রতিষ্ঠাও করেছে দখলদাররা। মার্কেট, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পাকা ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। এখনো কিছু কিছু স্থানে নির্মাণ কাজ চলছে। দখলের কারণে নদীটি খালে পরিণত হয়েছে। অথচ একটি সময়ে এই নদীতে লঞ্চ-স্টিমার চলতো। নদীতে চলাচলকারী নৌকায় মালামাল আনা-নেওয়া হতো। নদীর ঘাটকে ঘিরে গড়ে ওঠে কালীগঞ্জ শহরটি।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহরের মেইন বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পশ্চিম পাশে চিত্রা নদীর ব্রিজ-সংলগ্ন স্থানে নির্মাণ শুরু হয়েছিল একটি বিশাল পাকা ভবন। কিন্তু গণমাধ্যমে লেখালেখির কারণে সেটি এখন বন্ধ আছে। এরই কিছুটা পশ্চিমে শিবনগর গ্রামের কাছে জনৈক মুক্তার হোসেন নদীর জায়গায় ঘর তৈরি করে মুরগির খামার গড়েছেন। শহরের মধ্যে নদীর উপর থাকা সেতুটির (পুরনো সেতু) দুই পাশে মার্কেট গড়ে উঠেছে। সেতুর পশ্চিমে নদীর দুই পাড়ে যেভাবে বড় বড় পাকা ভবন তৈরি হয়েছে, এখন দেখে বোঝার উপায় নেই এটা নদী। সেতুর পূর্ব পাশেও দুই পাড়ে অসংখ্য পাকা ভবন। এক শ্রেণির লোক নানা কাগজপত্র দেখিয়ে এই সব জায়গা তাদের দাবি করে আসছেন। কিন্তু প্রবীণ ব্যক্তিরা বলছেন, এগুলো সবই এক সময়ে নদীই ছিল। শহরের কালীবাড়িটিও কিছু অংশ নেমে গেছে নদীর মধ্যে। সেখানেও দখল হয়েছে নদীর জায়গা। হেলাই হাসপাতালের কাছে নদীর মধ্যে বিশাল বড় পুকুর কাটা হয়েছে। এই পুকুরের পাড়ে বিশাল বিশাল গাছ রয়েছে। যেগুলো নদীর পানির গতিপথই নয়, গোটা নদীটিই আড়াল করে দিয়েছে। নিশ্চিন্তপুর এলাকার নদীর মধ্যে ঈদগাহ নির্মাণ করা হয়েছে। এভাবে চিত্রা নদীর কালীগঞ্জ অংশের বেশিরভাগ জায়গা দখল করে নিয়েছেন দখলদাররা।
শুধু দখল নয়, নদীতে নানা ধরনের ময়লা ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। ক্লিনিকের বর্জ্য, শহরের ময়লা ফেলে পানি দূষিত করা হচ্ছে। একাধিক ব্যক্তি জানান, প্রায়ই এক শ্রেণির মানুষ বস্তায় ভরে ময়লা এনে সেতুর উপর থেকে নিচে পানিতে ফেলেন। এই বস্তায় নানা ময়লা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে কুকুর-বিড়াল মারা যাওয়ার পরও বস্তায় ভরে নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। শহরের সিনেমা হল এলাকার বাসিন্দা মোশারফ হোসেন জানান, প্রায়ই তাদের চোখে পড়ে নদীতে ময়লা ফেলা হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে উল্টো খারাপ আচরণ করেন দখলদাররা।
এ সব বিষয়ে কথা হয় নদীর জায়গায় মুরগির খামার নির্মাণকারী মুক্তার হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, বেশ কয়েকবছর আগে তিনি ঘরটি নির্মাণ করেছেন। সেই সময়ে বাধা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে সরকারি লোকজন নদীর সীমানা মেপে তাকে ঘরটি নির্মাণের অনুমতি দিয়েছেন।
লিখিত অনুমতি আছে কি-না জানতে চাইলে মৌখিক অনুমতি পেয়েছেন বলে জানান এই ব্যক্তি। তাছাড়া সম্প্রতি তিনি নতুন করে কাজ করেননি বলে জানিয়েছেন। ঝড়ে কিছুটা ক্ষতি হলে সেটা মেরামত করেছেন বলে দাবি করেছেন।
নিশ্চিন্তপুর এলাকায় নদীর মাঝে পুকুর রয়েছে তারিকুর রহমানের। তিনি দাবি করেন, নদীর উপর তাদের জমি রয়েছে। সেখানে পাড়ঘেঁষে পুকুর তৈরি করেছেন। নদীর মধ্যে পুকুরের অংশ যায়নি।
হেলাই গ্রামের একাধিক ব্যক্তি জানান, তাদের গ্রামে নদীর অপরপাড় দখল করে ঈদগাহ নির্মাণ করা হয়েছে। যে স্থানে মাত্র ১৫ থেকে ২০ বছর আগেও নদীর স্রোত ছিল।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুবর্ণারানী সাহা জানান, এগুলো উচ্ছেদের জন্য গণজাগরণ প্রয়োজন। যারা এভাবে দখল করছে তাদের বিরুদ্ধে শুধু আইন দিয়ে কাজ হবে না।
নদীর মধ্যে ভবন, পুকুরগুলোর বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান ইউএনও।

আরও পড়ুন