দর্শনায় বাঁশ ব্যবহার করা সেই ভবন পুনঃনির্মাণ শুরু

আপডেট: 02:06:00 08/12/2016



img
img

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি : দর্শনায় উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের যে অবকাঠামো নির্মাণে রডের বদলে বাঁশের কাবারি ব্যবহার করা হয়েছিল সেই ভবনের অবশিষ্ট নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। নির্মাণের দায়িত্বে আগের ঠিকাদারকে বাদ দিয়ে নতুন করে ঠিকাদার নিযুক্ত করা হয়েছে।
বুধবার সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেন নতুন ঠিকাদার। আগে নির্মিত বাঁশের কাবারি দেওয়া অংশ পরীক্ষা করে সেগুলো বাদ দিয়ে দোতলা নির্মাণ কাজ শুরু করা হচ্ছে। ফলে নির্মাণকাজের খরচও বাড়ানো হয়েছে।
দর্শনা উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের দ্বিতল ভবনে নির্মাণ কাজে রডের পরিবর্তে বাঁশের কাবারি দিয়ে ঢালাইয়ের ঘটনা দেশব্যাপী ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। গণমাধ্যমের শিরোনামে পরিণত হয় বহুল আলোচিত এ দুর্নীতি। দফায় দফায় উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি তদন্ত করে দুর্নীতির সত্যতা পায়। এর পর গত ৭ মে আলোচিত ঠিকাদার মণি সিংকে আটক করে র‌্যাব। এর আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয় নির্মাণকাজ। ভবন এলাকা ঘিরে রাখা হয়। টানা আট মাস কাজ বন্ধ থাকার পর নতুন করে কার্যাদেশ পায় ঢাকার দুই নম্বর মিরপুরের মাসতুরা এন্টারপ্রাইজ। এক কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে এ নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে নতুন করে।
নির্মাণাধীন ভবনে পুনঃনির্মাণকাজ উদ্বোধনী সভায় বক্তব্য রাখেন দর্শনা পৌরসভার মেয়র মতিয়ার রহমান, বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ আলী, কনসালট্যান্ট আহসানুল্লাহ, দর্শনা উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের উপ-পরিচালক কামরুন্নাহার মিতা, কেন্দ্রের ল্যাব টেকনিশিয়ান সেলিনুর রহমান এবং পরিদর্শক শামীম হাসান।
আমদানি করা কৃষিপণ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কয়েক বছর ধরে জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শেষ করে দর্শনা পৌরভবনের পেছনে ২৯ দশমিক ৫২ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ওই জমিতে গত বছরের ১ ডিসেম্বরে বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় ফাইটো সেনেটারি শক্তিশালীকরণ উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে বরাদ্দ করা দুই কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ে দ্বিতল ভবন নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেছিলেন বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ হামিদুর রহমান ও চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ।
অভিযোগ রয়েছে, এ ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই এলাকাবাসীর অভিযোগের শেষ ছিলো না। স্থানীয়রা দুর্নীতি প্রতিরোধের চেষ্টা চালালেও বারবার তা ব্যর্থ হয়। ব্যাপক দুর্নীতির চিন্তা মাথায় নিয়েই ভবন নির্মাণের আগে নির্মাণ করা হয় সীমানা প্রাচীর। দিনের আলো থেকে রাতের আঁধারেই নির্মাণকাজে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। নির্মাণকাজটি পেয়েছিলো ঢাকার ফার্মগেটের ‘জয় কনস্ট্রাকশন ইন্টারন্যাশনাল’। এ কাজে বিভাগীয় প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলেন রবিউল ইসলাম ও সহকারী প্রকৌশলী সুব্রত বিশ্বাস। ইট, বালি, খোয়া, রড, রাবিশ ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে ভবন নির্মাণকাজ করা হয়েছে বলে এক পর্যায়ে এলাকাবাসী অভিযোগ তোলেন। সরকারের এ ধরনের একটি ভবন নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার সাইনবোর্ড টানানো ছাড়াই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে খেয়ালখুশি মতো কাজ চালিয়ে যাওয়া হয়।
অবশেষে ৩ এপ্রিল নির্মাণ শ্রমিকদের অগোচরে স্থানীয়রা লুকিয়ে ভবনে ঢুকে চমকে ওঠেন। তারা দেখতে পান, দ্বিতল ভবনের পিলারগুলোতে রডের বদলে দেওয়া হয়েছে বাঁশের কাবারি। প্রাচীরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত পুরনো ইট দিয়ে। ঢালাই কাজে ইটের খোয়ার পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে সুরকি ও রাবিশ। এই ভয়াবহ দুর্নীতির খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে ভবন এলাকায় কয়েকশ’ লোকের ভীড় জমে যায়। ফলে আসন্ন বিপদ আঁচ করতে পেরে ঘটনাস্থল থেকে কৌশলে পালিয়ে যান নির্মাণকাজ দেখভালের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম, সুব্রত বিশ্বাস ও ম্যানেজার জেমসসহ নির্মাণশ্রমিকরা। ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন এলাকাবাসী। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান দামুড়হুদা উপজেলার সেই সময়ের নির্বাহী অফিসার ফরিদুর রহমান, চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নির্মলকুমার দে, দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি অফিসার সুফি রফিকুজ্জামান, দর্শনা উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের উপ-পরিচালক কামরুন নাহার মিতা। কর্তকর্তারা ভবনের বিভিন্ন পিলার ও প্রাচীর ভেঙে অভিযোগের সত্যতা পান। কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছুনোর আগেই রাতের আঁধারে বাঁশের কাবারি ও নিম্নমানের সামগ্রী সরিয়ে ফেলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন। যে কারণে ওই দিনই নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। এদিকে বাংলাদেশ কৃষি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হামিদুর রহমান এঘটনায় তড়িৎ ব্যবস্থা নেন। একের পর এক সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরির্দশন করেন। গোটা দেশে ব্যাপক আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয় রডের বদলে বাঁশের কাবারি দিয়ে ভবন নির্মাণের কাহিনি।

আরও পড়ুন