দামী ও প্রয়োজনের বেশি ওষুধ লিখছেন ডাক্তাররা

আপডেট: 01:15:37 10/01/2017



img

আকবর হোসেন : ঢাকার একজন সাংবাদিক জাহিদ সোহাগ । বেশ কয়েক বছর আগে পিঠে ব্যথার জন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার পর তাকে ছয়টি ওষুধ দেন একজন ডাক্তার ।
এরপর আরেকজন ডাক্তার আরো এগারোটি ওষুধ যোগ করলে মোট সতেরটি ওষুধ খেতে হয় মি. সোহাগকে । প্রায় দুই মাস এই ওষুধগুলো খাওয়ার পরেও কোনো উন্নতি হচ্ছিল না।
শেষ পর্যন্ত দেশের বাইরে একজন ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে তিনি সবগুলো ওষুধ বাদ দিয়ে শুধু একটি ওষুধ খেতে বলেন । মি. সোহাগ বলছিলেন, তার আগে এতো বেশি ওষুধ প্রয়োগে তিনি মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন ।
"আপনি যখন দীর্ঘ সময় ওষুধ খাবেন এবং রোগের নিরাময় না ঘটবে তখন একধরনের ডিপ্রেশন কাজ করে, আমি হয়তো অসুস্থ হয়ে পড়লাম । আমি হয়তো আর সুস্থ জীবনে ফিরছি না এরকম একটা আশংকা মনের ভিতর তৈরি হয়" ।
মি. সোহাগের মতো এধরনের অজস্র উদাহরণ রয়েছে বাংলাদেশে । চিকিৎসা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পৃথিবীজুড়ে রোগীদের অপ্রয়োজনীয় এবং দামী ওষুধ দেবার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, অনেক সময় কম খরচে রোগ নিরাময়ের উপায় থাকলেও রোগীদের উপর বাড়তি খরচ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ল্যানসেট জার্নালে যে গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে, বাংলাদেশেও সে চিত্র ব্যতিক্রম নয় ।
অভিযোগ রয়েছে ডাক্তাররা তাদের প্রেসক্রিপশনে দামী ওষুধ যেমন লিখছেন তেমনি বেশি ওষুধ লিখছেন ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঔষধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক মনে করেন, ঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করতে না পারার কারণে ডাক্তাররা ওষুধের প্রয়োগ করেন বেশি ।
তাছাড়া দামী ওষুধ হলেই যে তার মান ভালো হবে সেটিও মনে করেন না মি. ফারুক ।
তিনি বলেন, "আমি বেশি দামের উন্নত মানের কাঁচামাল ব্যবহার করি তাহলে আমার কিছুটা খরচ অবশ্যই বেশি পড়বে । আর যে কিছুই মানে না তার দাম একটু কম হবে এটা স্বাভাবিক তবে সবসময় যে বেশি দামের ওষুধ বেশি মানসম্পন্ন এটি নাও হতে পারে । এমনও হতে পারে যে একটি কোম্পানি ফাঁকি দিয়ে বেশি টাকা নিচ্ছে । এবং এটি দেখার দায়িত্ব হবে ওই দেশের সরকারি যে অফিস যারা এগুলো দেখার দায়িত্বে আছেন তাদের।"
ওষুধের বেশি প্রয়োগের বিষয়টিতে ডাক্তারদের সবসময় কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় । অনেক ডাক্তার বেশি ওষুধ দেওয়ার বিষয়টিকে অস্বীকার করেন । কিন্তু অনেকে আবার এই ধরনের প্রবণতার সমালোচনাও করেন ।
ডাক্তারদের মধ্যেই কেউ কেউ বলছেন, বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানি দামী ওষুধ এবং বেশি ওষুধ লেখার জন্য অনেক ডাক্তারকে বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে ।
বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ উপাচার্য অধ্যাপক ডাক্তার রশিদ-ই -মাহবুব বলছেন, ওষুধের যে অপব্যবহার হয় সেটি অস্বীকার করার কোনো উপাই নেই ।
অধ্যাপক মাহবুব বলেন, "প্রথম কথা হচ্ছে, কতগুলো রোগ আছে যেগুলোর জন্য সারা জীবনই ওষুধ খেতে হবে । যেমন আজকে ডায়াবেটিসের কথা বলেন, হাইপার টেনশনের (প্রেশার) কথা বলেন তারপরে ক্যান্সারের কথা বলেন এগুলোর ওষুধ কিন্তু সারা জীবনই খেতে হয়। কিন্তু বেশিরভাগই যেটা অ্যাবিউজড (অপব্যবহার) হয় সেটা হচ্ছে ভিটামিন এবং এন্টিবায়োটিক । একটা এন্টিবায়োটিক দিয়ে অনেক সময় অনেক চিকিৎসক ঠিক এনশিওর করতে পারে না। তখন তারা কয়েকটা এন্টিবায়োটিক লিখে দেয় । এটাই কিন্তু বেশি ওষুধের প্রবণতা তৈরি করে।"
বিশ্লেষকেরা বলছেন , রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা নির্ভুল হলে বেশি ওষুধ প্রয়োগের প্রবণতা হয়তো কমে আসবে ।
তবে একই সঙ্গে যেসব ডাক্তার বেশি ওষুধ প্রয়োগ করেন তাদেরও সচেতনতার পরিচয় দেওয়া দরকার বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন ।
সূত্র : বিবিসি

আরও পড়ুন