দুই চেয়ারম্যান হত্যা : অভিযোগের তীর সরকারি দলের দিকে

আপডেট: 03:51:18 02/03/2018



img
img

মৌসুমী নিলু, নড়াইল : নড়াইলে ছয় মাসের ব্যবধানে দুই ইউপি চেয়ারম্যান খুনের ঘটনা ঘটেছে। প্রথমে কালিয়ার এক ইউপি চেয়ারম্যানকে নিজ বাগানবাড়িতে ঘুমন্ত অবস্থায় রাতের আঁধারে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরে লোহাগড়া উপজেলা পরিষদ চত্বরে প্রকাশ্যে দিবালোকে আরেক চেয়ারম্যানকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এই দুই প্রার্থীই আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে নির্বাচন করে জয়ী হয়েছিলেন। তারা রাজনৈতিক হত্যার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ। নিজ দলীয় কোন্দলই তাদের জীবননাশের কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিহত দুই ইউপি চেয়ারম্যান সরকারি দলের স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী ছিলেন। তারা খুন হওয়ার পর স্বজনদের মামলার ভিত্তিতে অভিযুক্ত খুনিদের রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া গেছে।
জানা যায়, নড়াইলের কালিয়া উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নাহিদ হোসেন মোল্যাকে গত বছর ২৫ আগস্ট ভোরে সীমান্তবর্তী খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার গাজিরহাটের নিজ বাগানবাড়িতে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।
পুলিশ ও এলাকাবাসীর ধারণা, স্থানীয় রাজনৈতিক কোন্দল ও পূর্বশত্রুতার জের ধরে এ ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও গত ২০০৯ সালে ইউপি নির্বাচনের দুই বছর আগে নাহিদ মোল্যা আওয়ামী লীগে যোগ দেন। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পাননি তিনি। মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে বিপুল ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি।
স্থানীয়রা জানান, জেলা আওয়ামী লীগ ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের দুটি গ্রæপে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলে আসছে। এর আগেও দুই গ্রুপের সংঘর্ষে বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। নিহত চেয়ারম্যান নাহিদ মোল্যা পেড়লী, পুরুলিয়া, হামিদপুরসহ আশপাশের ইউনিয়নের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। প্রভাব বিস্তারের জের ধরেই এ ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা তাদের।
স্থানীয়দের মতে, নাহিদ মেল্যাার পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার বাবা আবদুল হামিদ মোল্যা একই ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান ছিলেন। সন্ত্রাসীরা হামিদ মোল্যাকেও গুলি করে হত্যা করে। বাবার মৃত্যুর পর চেয়ারম্যান হন তার ভাই আকবর মোল্যা। তিনিও দীর্ঘদিন চেয়ারম্যান ছিলেন। ভাইয়ের পর নাহিদ হোসেন মোল্যা চেয়ারম্যান হন। নাহিদ হত্যার পর তার স্ত্রী পলি বেগম আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে বিপুল ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। হামিদপুর ইউনিয়নটি চেয়ারম্যান নাহিদের বাবা আবদুল হামিদের নামেই নামকরণ করা।
নাহিদ খুনের ঘটনায় হামিদপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম মোহাম্মদকে প্রধান আসামি করে ছয়জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত সাতজনকে আসামি করে নিহতের স্ত্রী পলি খানম বাদী হয়ে খুলনার দিঘলিয়া থানায় মামলা করেন (মামলা নম্বর-১১, তারিখ-২৬/৮/১৭)।
একইভাবে, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি দুপুর পৌনে ১২টার দিকে লোহাগড়া উপজেলা নির্বাচন অফিস এলাকায় মোটরসাইকেল আরোহী উপজেলার দিঘলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান পলাশকে প্রথমে গুলি করে দুর্বৃত্তরা চেয়ারম্যান পলাশ মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলযোগে পালিয়ে যায়।
এ ঘটনায় ১৭ ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে ১২টার দিকে লোহাগড়া থানায় দায়ের করা মামলায় নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক কুমড়ি গ্রামের বাসিন্দা শরীফ মনিরুজ্জামান, দিঘলিয়া ইউপি নির্বাচনে পরাজিত আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাছুদুজ্জামান মাসুদ, দিঘলিয়া ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ইমতিয়াজ আহম্মেদ মাসুম, দিঘলিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি ওহিদুর রহমান সরদার, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ বনিরুল ইসলাম বনিসহ ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার রাতেই ঢাকা থেকে শরীফ মনিরুজ্জামানকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও দলীয় কোন্দলের জের ধরে উপজেলার দিঘলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা লতিফুর রহমান পলাশ  খুন হয়েছেন বলে অভিযোগ করছেন তার পরিবার ও সাধারণ মানুষসহ দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। তিনি ২০১০ সালের দিকে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। স্থানীয়ভাবে ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তারের মেরুকরণে দ্বিধাবিভক্ত আওয়ামী লীগ। যে কারণে দলীয় কোন্দল, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ ও মাদক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়াটা খুনের সম্ভাব্য কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে খুনের তদন্ত চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছেন।
এদিকে, মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে এ দুইজন জনপ্রিয় চেয়ারম্যান হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জেলার অন্যান্য ইউপি চেয়ারম্যানরাও  আতংকের মধ্যে রয়েছেন। তারা স্বাভাবিকভাবে একাকী চলাফেরা করতে সাহস পাচ্ছেন না। চলতি সপ্তাহে লোহাগড়া উপজেলার সব ইউপি চেয়ারম্যান নিজেদের নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে একযোগে অস্ত্রের লাইসেন্স চেয়েছেন।
কালিয়া উপজেলার চাঁচুড়ী ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম হীরক বলেন, ‘প্রকাশ্য দিবালোকে প্রশাসনের নাকের ডগার ওপর একজন জনপ্রিয় ইউপি চেয়ারম্যানকে গুলি করে হত্যা করার ঘটনা বিরল ও উদ্বেগজনক। গত ২৮ ডিসেম্বর হামিদপুর ইউপি উপ-নির্বাচন চলাকালে গাজীরহাট যাওয়ার সময় আমার ও পুরুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম মনির ওপর হামলা হলেও পুলিশ রহস্যজনক কারণে মামলা নেয়নি। যে কারণে নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যানদের নৃসংশভাবে হত্যার দুঃসাহস দেখিয়ে যাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। সন্ধ্যার পর এমনকি দিনেরও বেলায়ও আমরা ঘর থেকে বেরোতে সাহস পাচ্ছি না। আমাদের পরিবার ও স্বজনরাও উৎকন্ঠিত।’
নড়াইল সদরের কলোড়া ইউপি চেয়ারম্যান আব্বাস সরদার বলেন, ‘একের পর এক ইউপি চেয়ারম্যানদেরকে হত্যার ঘটনায় মনে হচ্ছে জনপ্রতিনিধিরা এখন টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। যে কারণে আমরা আতংকে ভুগছি। আমাদের জান-মালের নিরাপত্তার জন্য সরকারের সুদৃষ্টি দেওয়া জরুরি।’
নড়াইলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমি নড়াইলে গতকাল পুলিশ সুপার এসেছি। তাই এখানকার পরিস্থিতি বুঝতে সময় লাগবে। আশা করি সবাইকে নিয়ে আইনশৃংখলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে সক্ষম হবো।’

আরও পড়ুন