দুবলার চরে শুরু হলো রাসমেলা

আপডেট: 06:29:59 21/11/2018



img

এস এম আলাউদ্দিন সোহাগ, পাইকগাছা (খুলনা) : ২১ নভেম্বর থেকে ২৩ নভেম্বর শুক্লপক্ষের চাঁদের আলোয় শোভিত নিঝুম সুন্দরবন চরাঞ্চল সরব হয়ে উঠবে পুণ্যার্থীদের পূজা ও আরাধনায়। দুর্গম সাগর-প্রকৃতির অভাবনীয় সৌন্দর্যের মাঝে পুণ্য অর্জন আর সঞ্চার যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। কার্তিক-অগ্রহায়ণে শুক্লপক্ষের ভরাপূর্ণিমায় সাগর উছলে ওঠে। চাঁদের আলোয় সাগর-দুহিতা দুবলার চরের আলোর কোল মেতে ওঠে রাস উৎসবে।
বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সমুদ্র রাসমেলা সুন্দরবনের দুবলারচরে হয়। রাসমেলা নিয়ে নানা মত রয়েছে। অনেকের ধারণা, ১৯২৩ সালে হরিচাঁদ ঠাকুরের অনুসারী হরিভজন নামে এক হিন্দু সাধু এই মেলা শুরু করেছিলেন। এই সাধু ২৪ বছরের বেশি সময় ধরে সুন্দরবনের গাছের ফল-মূল খেয়ে জীবন ধারণ করতেন। তিনি হরিচাঁদ ঠাকুরের স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে পূজা-পার্বণাদি ও অনুষ্ঠান শুরু করেন দুবলার চরে। তারপর থেকে মেলা বসেছে লোকালয়ে। এটি নীলকমল মেলা নামে পরিচিত।
অন্যমত হলো, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অবতার শ্রীকৃষ্ণ কোনো এক পূর্ণিমা তিথিতে পাপমোচন এবং পুণ্যলাভের আশায় গঙ্গাস্নানের স্বপ্নাদেশ পান। সেই থেকে শুরু হয় রাসমেলা।
আবার কারো কারো মতে, শারদীয় দুর্গোৎসবের পর পূর্ণিমা রাতে বৃন্দাবনবাসী গোপীদের সঙ্গে রাসনৃত্যে মেতেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ।
বঙ্গোপসাগরের মোহনায় সুন্দরবনের দুবলাচরের আলোর কোলে রাস পুর্ণিমায় রাধাকৃষ্ণের পুজা, পুণ্যস্নান অনুষ্ঠিত হবে। এ উপলক্ষে রাসমেলায় পুর্ণিমা তিথিতে চরে নির্মিত মন্দিরে নামযজ্ঞ, রাধাকৃষ্ণ, কমল-কামিনী ও বনবিবির পূজা হবে। পূর্ণিমার পূর্ণ তিথিতে সকালে সাগরে পুণ্যস্নানের জন্য হাজার হাজার নারী-পুুরুষ বিভিন্ন ধরনের প্রসাদ নিয়ে মানত ও মনোবাসনা পূরণের জন্য সাগরচরে সারিবদ্ধ হয়ে বসবেন। সাগরে স্নান শেষে পুণ্যার্থীরা বাড়ি ফেরা শুরু করবেন।
রাস পূর্ণিমায় প্রথম আসা সমুদ্রঢেউকে ‘নীলকমলের ঢেউ’ বলা হয়। এই প্রথম ঢেউয়ে পুণ্যার্থীরা তাদের হাতে ধরে রাখা প্রসাদ উৎসর্গ করে স্নান সারেন।
রাস পূর্ণিমা উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে পূজা, নামকীর্তন, ছাড়াও আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। এ বছর ১৩৫তম রাস উৎসব হচ্ছে। আয়োজকদের সূত্রে জানা গেছে, এবার মেলা বেশ জমজমাটভাবে উদযাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
পুণ্যস্নানে আসা লাখো পুণ্যার্থীর নিরাপত্তার জন্য সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ আটটি পথ নির্ধারণ করেছে। এ সকল পথে বন বিভাগ, পুলিশ, বিজিবি ও কোস্টগার্ডের টহল দল তীর্থযাত্রী ও দর্শনার্থীদের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে।
অনুমোদিত আটটি পথ হলো-বুড়িগোয়ালিনী, কোবাদক থেকে বাটুলানদী-বলনদী-পাটকোস্টা হয়ে হংসরাজ নদী হয়ে দুবলারচর। কদমতলা থেকে ইছামতি নদী, দোবেকী হয়ে আড়পাঙ্গাসিয়া-কাগাদোবেকী হয়ে দুবলার চর। কৈখালী স্টেশন হয়ে মাদার গাঙ, খোপড়াখালী ভাড়ানী, দোবেকী হয়ে আড়পাঙ্গাসিয়া-কাগাদোবেকী হয়ে দুবলার চর। কয়রা, কাশিয়াবাদ, খাসিটানা, বজবজা হয়ে আড়ুয়া শিবসা-শিবসা নদী-মরজাত হয়ে দুবলার চর। নলিয়ান স্টেশন হয়ে শিবসা-মরজাত নদী হয়ে দুবলার চর। ঢাংমারী অথবা চাঁদপাই স্টেশন হয়ে পশুর নদী দিয়ে দুবলারচর। বগী-বলেশ্বর-সুপতি স্টেশন-কচিখালী-শেলার চর হয়ে দুবলার চর এবং শরণখোলা স্টেশন-সুপতি স্টেশন-কচিখালী-শেলার চর হয়ে দুবলার চর।
দর্শনার্থী ও তীর্থযাত্রীদের ২১ থেকে ২৩ নভেম্বর এ তিন দিনের জন্য অনুমতি প্রদান করা হবে এবং প্রবেশের সময় এন্ট্রি পথে নির্দিষ্ট ফি প্রদান করতে হবে। যাত্রীরা নির্ধারিত রুটের পছন্দমতো একটিমাত্র পথ ব্যবহারের সুযোগ পাবেন এবং দিনের বেলায় চলাচল করতে পারবেন। বনবিভাগের চেকিং পয়েন্ট ছাড়া অন্য কোথাও নৌকা, লঞ্চ বা ট্রলার থামানো যাবে না। প্রতিটি ট্রলারের গায়ে রঙ দিয়ে বিএলসি অথবা সিরিয়াল নম্বর লিখতে হবে। রাস পূর্ণিমায় আগত পুণ্যার্থীদের সুন্দরবনে প্রবেশের সময় জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা ইউপি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে প্রাপ্ত সনদপত্র সঙ্গে রাখতে হবে। পরিবেশ দূষণ করে এমন বস্তু, মাইক বাজানো, পটকা ও বাজি ফোটানো, বিস্ফোরক দ্রব্য, দেশীয় যে কোনো অস্ত্র এবং আগ্নেয়াস্ত্র বহন থেকে যাত্রীদের বিরত থাকতে হবে। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে অবস্থানকালীন সবসময় টোকেন ও টিকেট নিজের সঙ্গে রাখতে হবে। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ সকল তথ্য জানিয়েছেন।