দুর্নীতিতে ডুবে গেছে পল্লী বিদ্যুতের দর্শনা অফিস

আপডেট: 01:53:58 12/12/2016



img

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি : জীবননগর উপজেলায় নতুন বিদ্যুৎ সংযোগকে ঘিরে মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির দর্শনা সাব-জোনাল অফিসে চলছে নৈরাজ্য। নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্য রমরমা হয়ে উঠেছে অফিসটি।
ফলে ভোগান্তিতে পড়ছেন নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে আসা এলাকার হাজারো গ্রাহক।
অভিযোগ রয়েছে, আবেদনকারীরা বছরের পর বছর এ অফিসে ধরনা দিয়েও নতুন সংযোগ পাচ্ছেন না। গ্রাহকদের অভিযোগ সমীক্ষা ফি, ওয়্যারিং পরিদর্শন, সিএমওকরণ (কনজুমার মিটার অর্ডার), জামানত ও ট্রান্সফরমারের ওভারলোডের নাম করে এবং আবেদন থেকে শুরু করে সংযোগ দেওয়া পর্যন্ত নানা সমস্যা দেখিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে গ্রাহকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কর্মকর্তাদের নিয়োজিত প্রভাবশালী দালালরা। দালাল ছাড়া কোনো গ্রাহক যদি সংযোগের জন্য আবেদন করেন, তাহলে সে সংযোগ কবে নাগাদ মিলবে বা আদৌ মিলবে কি না তা নিশ্চিত হতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। প্রতিটি মিটার সংযোগের জন্য গ্রাহকের কাছ থেকে সদস্য ফরম বাবদ ১০০ টাকা ও মিটার বাবদ ৬৫০ টাকা নেওয়ার কথা থাকলেও দালালরা গ্রাহকদের কাছ থেকে মিটার প্রতি আট হাজার টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছে।
আরিফ হোসেন, নুরুজ্জামান, আলিমসহ দালালরা কয়েক ভাগে ভাগ হয়ে চালিয়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎ সংযোগের নামে মিটার বাণিজ্য। যেসব গ্রাহক নির্দিষ্ট অংকের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা দিচ্ছেন শুধু তাদের ভাগ্যেই জুটছে মিটার। যারা দালালদের মন জোগাতে পারছেন না, তাদের ঘরে বিদ্যুৎ যাচ্ছে না।
দর্শনা সাব-জোনাল অফিসে গিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে। সবচেড়ে বড় অভিযোগ দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ে। নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য আবেদন করা হলেও তা মাসের পর মাস এমনকী বছরের পর বছর ধরে ফাইলবন্দি অবস্থায় পড়ে থাকে। কিন্তু যারা দালালদের উপরি দিয়ে আবেদনপত্র জমা দিচ্ছেন, তারা সংযোগ পেয়ে যাচ্ছেন।
গ্রাহকরা অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ সংযোগের আবেদন করার সময় কর্মকর্তারাই দালালদের নাম উলেল্লখ করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দেন। দালাল ছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছেন, এমন গ্রাহক খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই অবস্থায় অসহায় হয়ে গ্রাহকরা ওই দালালদের পাঁচ-ছয় গুণ বেশি টাকা দিয়ে মিটার ও বৈদ্যুতিক খুঁটিসহ ট্রান্সফরমার নিতে বাধ্য হচ্ছেন। আগে আবেদন করা গ্রাহকদের আগে সংযোগ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও এখানে তা মানা হচ্ছে না। উৎকোচের বিনিময়ে সদ্য আবেদনকারীদের সংযোগ দেওয়া হচ্ছে আগে। এজন্য অবস্থা ভেদে গ্রাহকদের কাছ থেকে সাত হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। এছাড়া পরিদর্শক ও বিলিং সুপারভাইজারসহ তাদের নিয়োজিত দালালদের হাতে অতিরিক্ত টাকা না দিলে আবেদনকারীদের সংযোগস্থলে বিদ্যুতের ‘বাড়তি লোড রয়েছে’ বলে মিথ্যা প্রতিবেদন দেওয়া হয়। যাতে ওই গ্রাহক আরো বাড়তি টাকা দিতে বাধ্য হন। দুর্ভোগ আর হয়রানির শিকার আবেদনকারীরা উপায়ান্তর না পেয়ে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সংযোগ নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
উপজেলার সেনেরেহুদা গ্রামের নাসির উদ্দীন বলেন, ‘আমার বাড়িতে নতুন একটি মিটারের জন্য চার মাস আগে উথলী এরিয়া অফিসের লাইনম্যান ফরিদ হোসেনের পোষা দালাল হাফিজুর রহমানের কাছে ছয় হাজার ৭০০ টাকা দিয়েছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত বিদ্যুতের সংযোগ পাইনি।’
উথলী গ্রামের আমতলাপাড়ার আক্কাচ আলী অভিযোগ করে বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে একটি ট্রান্সফরমার নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে তা বদলের জন্য ইলেকট্রিশিয়ান আহম্মেদ সগীরের মাধ্যমে লাইনম্যান ফরিদ হোসেনকে এক হাজার ৭৫০ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।’
একই গ্রামের মিনাজুল হক বলেন, ‘আমি কামলা খেটে খাই। একদিন কামলা না খাটলে বাড়ির সবাইকে উপোস থাকতে হয়। এ অবস্থায় আমি ধার-কর্জ করে নতুন একটা মিটারের জন্য ছয় মাস আগে আবেদন করি। আবেদন করার পর দর্শনা অফিসে আমাকে চার বার আসতে হয়েছে এবং অতিরিক্ত ৭৫০ টাকা দিতে হয়েছে। বাড়তি টাকা না দেওয়া পর্যন্ত মিটার লাগানো হয়নি।’
এসব অনিয়ম-দুর্নীতি প্রসঙ্গে মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী আব্দুল মতিন বলেন, ‘দালালদের দৌরাত্ম্য সম্পর্কে আমার পরিষ্কার ধারণা নেই। তবে অভিযোগ এলে দালালদের শনাক্ত করে তাদের দৌরাত্ম্য বন্ধে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করব।’

আরও পড়ুন