দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রও ভোট দিচ্ছে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে

আপডেট: 02:31:57 22/05/2018



img

আহসান কবির

ক্লাস টুতে পড়ে বিল্টু। সে তার বাবার সঙ্গে ভোট দিতে গেছে। পোলিং এজেন্টকে সে একের পর এক প্রশ্ন করছে। পোলিং এজেন্ট মহা বিরক্ত। তাদের শেষ কথোপকথন:
বিল্টু: আংকেল ওটা কী লাগালেন হাতের আঙুলে?
পোলিং এজেন্ট: ভোট দিলে চিহ্ন হিসেবে ওটা লাগানো হয়।
বিল্টু: আচ্ছা পানি দিলে এই দাগ কি উঠবে?
পোলিং এজেন্ট: না। সময় লাগবে।
বিল্টু: কতদিন?
পোলিং এজেন্ট: উফ! একবছর লাগবে, একবছর।
বিল্টু: আংকেল তাহলে বাবার চুলে এটা লাগিয়ে দেন। চুলের কলপ দশ দিনের বেশি থাকে না।  কলপ দেওয়ার সময়ে বাবা আমাকে আর মাকে খুব ডিস্টার্ব করে। আর কলপ দেওয়ার পর বাবা ছোট খালাকে নিয়ে কোথায় কোথায় যেন ঘুরতে যায়!
দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বিল্টুরা আজকাল ভোট দিতে পারছে। সারা পৃথিবীতেই নির্বাচন নিয়ে সংশয়-সংঘর্ষ আর উল্টাপাল্টা ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। নির্বাচনি আবহাওয়া সারা পৃথিবীতে বোধ করি একইরকম। আফ্রিকার এক দেশের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী জনসভায় গিয়ে বলতে লাগলেন, জনগণ যা চাইবে তিনি তাই করবেন। এক জনসভা শেষে হাজারো জনতা দাবি তুললো পাশের নদীটা সাঁতরে পার হতে পারলেই তারা তাকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি বানাবেন। রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী নদীতে ঝাঁপ দিলেন। কিন্তু নদী পার হওয়ার আগেই তার মৃত্যু হলো!
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গণতন্ত্র আর সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে বড় বড় কথা বলে আমেরিকা। এমনকী কথিত স্বৈরাচারদের উৎখাত করতে সাগর পাড়ি দিয়ে ইরাক ও লিবিয়ায় যুদ্ধ করতে যায় আমেরিকান সৈন্য। কিন্তু আমেরিকার সত্তর ভাগ মানুষ বাসা থেকে বেরিয়ে রাস্তা পাড়ি দিয়ে ভোট কেন্দ্রে যেতে চায় না। আমেরিকার প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেমন ছিলেন? একতরফা এবং প্রায় সব ভোট পেয়েছিলেন জর্জ ওয়াশিংটন। কারণ তার কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীই ছিল না! মার্কিন লেখক ও অভিনেতা উইল রজার্স তাই বলতে পারেন—আমরা আশা করি, সবসময় যেন যোগ্য প্রার্থীই জেতেন কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা কখনোই হয় না! সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর অটো ফন বিসমার্কের মতে—মানুষ কখনোই এত মিথ্যা বলে না যতটা তারা বলে যুদ্ধ আর নির্বাচনের সময়।
২০১৮ সালের ১৫ মে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুরনো একটা কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। সোভিয়েত রাশিয়ার জোসেফ স্ট্যালিন বলেছিলেন, যারা ভোট দেয়, তারা কোনও ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। যারা ভোট গোনে, তারাই সিদ্ধান্ত নেয় ফল কী হবে। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত সালাহউদ্দীন কাদের চৌধুরীকে নিয়ে প্রচলিত একটা কথা বলা যেতে পারে। তিনি নাকি নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনকে বলতেন, আপনাদের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম আপনারা আমাকেই ভোট দেবেন। তাই কষ্ট করে আপনাদের ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে না।
তবে ভোটাভুটির পর মানুষ শুধু যেকোনও প্রার্থীকে নির্বাচিত করে তেমন সবসময় নাও হতে পারে। আলাস্কার টালকিটনা শহরে মেয়র হতে পেরেছিল স্ট্যাবস নামের এক বিড়াল। ভোটারদের যুক্তি ছিল বড় অদ্ভুত। স্ট্যাবসের ব্যবহার নাকি খুব ভালো ছিল এবং সে নাকি জনগণের ওপর কোনও ট্যাক্স আরোপ করতো না। তবে রাজনীতি, নির্বাচন কিংবা ভোটের আগে প্রার্থীরা ভোটারদের আবেগ নিয়ে খেলে থাকেন। আবেগের ওপর ভর করে ভোটাররা কত কী যে করেন। ২০০৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেট নির্বাচনের আগে জেরি ওরোপেজা মারা যান। তবে ব্যালটে তার নাম ও প্রতীক রয়ে গিয়েছিল। ভোটের পরে দেখা গেল ভোটাররা মৃত জেরি ওরোপেজাকেই নির্বাচিত করেছেন। আমেরিকায় আরও দু'জন মানুষের এই রেকর্ড আছে। আর্ল উড ও চার্লস বিসলে মৃত্যুর পরে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
নির্বাচনে বিড়ালরা যেমন নির্বাচিত হতে পারে, তেমনি মৃত মানুষরাও নির্বাচিত হতে পারেন। বড় বিচিত্র মানুষের মন। আমেরিকার মানুষরা বিভিন্ন দেশের রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে যতই নাক গলাক না কেন, নিজ দেশে নৈতিকভাবে তাদের অবস্থান ঠিক নেই। নর্থ সাউথের যুদ্ধে যে কালো মানুষেরা আমেরিকার পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন, সেই কালো মানুষদের একজনকে রাষ্ট্রপতি বানাতে আমেরিকার মানুষ দুই শত বছরেরও বেশি সময় নিয়েছে। বারাক ওবামার পরে আর কোনও কালো মানুষ রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন কিনা, সেই সন্দেহও দেখা দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন মানুষকে (আমেরিকার বেশিরভাগ মানুষ তাকে উন্মাদ মনে করেন) আমেরিকানরা প্রেসিডেন্ট বানিয়েছেন কিন্তু একজন যোগ্য নারী যে প্রেসিডেন্ট হতে পারেন, বেশিরভাগ আমেরিকান আজও সেটা মনে করেন না। অবশ্য মার্কিন রহস্যোপন্যাস লেখক ডিন কুন্টেজের কথাটা স্মরণ করা যেতে পারে। তার মতে, আমাকে যদি বলা হয়, দুটি বাজে হরর মুভি থেকে একটি বেছে নিতে তাহলে সেটি হবে খুব কঠিন। ডিন কুন্টেজ তাও ভাগ্যবান।
যাইহোক খুলনা সিটি করপোরেশনের 'চমৎকার' (নির্বাচন কমিশন বলেছে চমৎকার নির্বাচন হয়েছে) নির্বাচনের কাছেই ফেরা যাক। তালুকদার আবদুল খালেক মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি আগেও মেয়র ছিলেন। মাঝখানে হেরেও গিয়েছিলেন। কয়েকটি পত্রিকার রিপোর্ট অনুসারে ‘নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের নতুন রূপ’ দেখেছে খুলনা তথা বাংলাদেশ। বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছেন। খুলনার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী মিজানুর রহমানের জামানত বাজেয়াপ্ত হলেও তিনি বলেছেন, তালুকদার আব্দুল খালেক যেভাবে জিতেছেন তাতে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে গেছে।
কে ধ্বংস হয়েছেন আর কে ফিনিক্স পাখির মতো আবির্ভূত হবেন, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। আমেরিকা, ভারত বা ইংল্যান্ডের মতো দেশগুলোর রাষ্ট্রযন্ত্র টাকা পয়সা ও মিডিয়া দিয়ে যে নির্বাচন প্রভাবিত করতে চায় না, তেমন না। তারপরও কোন দল কী করছে, তার একটা সীমা হয়তো থাকে। রিচার্ড নিক্সন (এই ভদ্রলোকের নামে বিদেশি পুরনো কাপড়ের একটা মার্কেট ছিল খুলনায়—নিক্সন মার্কেট) বিরোধী দলের অফিসে আঁড়ি পেতেছিলেন, ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। ট্রাম্প কীভাবে জিতেছেন, কীভাবে তিনি পত্রিকা, টেলিভিশন-ফেসবুক নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন, এমনকী রাশিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন ছিল, সেসব আজ কোনও না কোনোভাবে জানা যাচ্ছে। ভদ্রলোক তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবেন কিনা তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের নির্বাচনে স্থানীয় টিভি ও পত্রিকাগুলোতে চোখে পড়ার মতো বিজ্ঞাপন দিযেছিল ক্ষমতাসীন বিজেপি। একটি মাত্র পত্রিকা (কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র বাদে) ছাড়া প্রায় সব পত্রিকা ও টিভি সমর্থন দিয়েছিল বিজেপিকে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর পত্রিকা ও টিভিতে দেওয়া বিজ্ঞাপনের বিল তারা পরিশোধ করছে না। কেউ সরকারের বিপক্ষে গেলে এই বিজ্ঞাপনের টাকা যে আর পাওয়াই যাবে না, তা বলাই বাহুল্য। ত্রিপুরায় এখন বিরোধী মতের পত্রিকা তথা মিডিয়ার নাম ফেসবুক।
সত্য হোক আর গুজব হোক পৃথিবীর অনেক দেশে এখন ফেসবুকই একমাত্র ভরসা। সুতরাং আসুন ফেসবুককে লই সহজে! ফেসবুকে এক বৃদ্ধের ভোট দেওয়ার কৌতুকটা তাই এখানে না বললেও চলবে।
[লেখক : মিডিয়াকর্মী, রম্যলেখক, অভিনেতা। বাংলা ট্রিবিউন থেকে।]