ধর্ষণ : গণমাধ্যমের দায়

আপডেট: 01:54:55 02/04/2018



img

তুষার আবদুল্লাহ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একাধিক সাংবাদিক বন্ধুর তুলে দেওয়া লিংক দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। একটি পাঁচমিশালি চ্যানেলের সেলিব্রেটি টকশো সঞ্চালনা করছিলেন, প্রায় সাবেক হয়ে যাওয়া একজন নায়িকা। অভিনয় ছাড়াও মডেলিংয়ে তার জনপ্রিয়তা ছিল একসময়। তিনি কথা বলছিলেন চলচ্চিত্রের ভিলেন চরিত্রের একজন অভিনেতার সঙ্গে। এই অভিনেতা নিজেকে স্বল্প ব্যাপ্তির ক্লিপিংসের মধ্যেই সিনিয়র অভিনেতা হিসেবে পরিচয় দিলেন একাধিকবার। সঞ্চালক অভিনেত্রী প্রশ্ন রাখলেন সেই অভিনেতার কাছে—আপনি সিনেমায় কতবার ধর্ষণ করেছেন? প্রশ্নটি করে অট্টহাসি দেন সঞ্চালক। অভিনেতা উত্তরে জানালেন, যতবার আমাকে ডিরেক্টর বলেছেন, ততবার করেছি। এই উত্তর শুনেও সঞ্চালক আনন্দে আটখানা। সঞ্চালক জানতে চাইলেন, আপনার কত শ’ ছবি হয়েছে,  প্রত্যেকটিতেই কি ধর্ষণের সিন ছিল? উত্তরে অভিনেতা বলেন,  তিনি যখন তরুণ ছিলেন, তখন এ ধরনের সিন করা হতো। সিনিয়র হওয়ার পর থেকে এড়িয়ে চলেন। সঞ্চালক এরপর হাসতে হাসতে জানতে চাইলেন, কার সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন এই ধর্ষণ সিন করতে? ভিলেন অভিনেতা বললেন, মৌসুমী আর পূর্ণিমা। সঞ্চালক হেসেই উত্তরটি নিয়ে বললেন, আমরা দু’জনেই কেন? উত্তর এলো, কারণ মৌসুমী বন্ধু। ওর শর্ট পছন্দ না হলে সিরিয়াস হয়ে বলতো, ঠিক করে করছ না কেন? ফাজলামি করসো নাকি? ঠিক করো এটা তো এনজি শর্ট।
মাঝে সঞ্চালকের কথা শোনা যায়, মানে উনি ঠিক করে করতে বলতেন। যে কথোপকথনের কথা উল্লেখ করলাম, সেখানে সঞ্চালক ও তার অতিথি দু’জনেই চলচ্চিত্রে জনপ্রিয়। যখন সারাদেশ ধর্ষণ নিয়ে উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কে আছে, বাবার কাছে মেয়ে, শিক্ষকের কাছে ছাত্রী ও একবছরের শিশু কন্যাকেও শিকার হতে হচ্ছে ধর্ষণের,  তখন ধর্ষণ নিয়ে হাসি-তামাশা করে তারা দুই জন কতটা দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন, সেই প্রশ্ন তো রাখা যায়ই। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা-অভিনেত্রীরা বিষয়টি নিয়ে এমন রসিয়ে কথা বললেন, যা দেখে দর্শকমাত্রই বিব্রতবোধ করবেন। একইসঙ্গে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা হারাবেন। তবে এমন একটি অনুষ্ঠানে তারা কী বিষয়ে কথা বলবেন, তা নিশ্চয়ই টেলিভিশন চ্যানেলটির প্রযোজক বা কর্তৃপক্ষের ধারণার বাইরে ছিল না? আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, নারী নিপীড়নের এমন ঘটনা নিয়ে সরস আলোচনা করে,  চ্যানেলটি বোনাস টিআরপি কুড়োনোর সুযোগ নিতে চেয়েছে।
এই অনুষ্ঠানটির বাইরে গিয়ে যদি আমরা দেশের প্রতিটি চ্যানেলের অনুষ্ঠান ও সংবাদ পরিবেশন উপস্থাপন করি,  তাহলে অস্বীকার করতে পারবো না, নিজেদের দায়িত্বহীনতার কথা। কিংবা ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়ন, হয়রানির খবরগুলোকেও আমরা যে খানিকটা ‘রসালো পণ্য’র মতো করে উপস্থাপন করছি না, একথাও এড়িয়ে যেতে পারবো না। টেলিভিশন, পত্রিকা, অনলাইন—সব মাধ্যমেই এমনটি হচ্ছে। যৌন নিপীড়নের শিকার যিনি হচ্ছেন,  তার সম্পর্কে তথ্য বেশি আসছে। পাঠক, দর্শককে জানানো হচ্ছে, তার চলাফেরার আদ্যপান্ত। সেই অনুপাতে যারা এই ঘটনার জন্য দায়ী,  তাদের সম্পর্কে তথ্য কম। এখানে মেয়ে বা নারীর তথ্য জানার যে পুরুষোচিত আগ্রহ, লিপ্সা তাকেই গণমাধ্যম সংবাদ বিক্রিতে ব্যবহার করছে। বহুল আলোচিত বা চর্বিতচর্বণ কথা—বিজ্ঞাপনে নারী শরীরের ব্যবহার। বেসরকারি টেলিভিশন সেন্সর নীতিমালা অনুসরণ না করায় এখানে নারীর জন্য অবমাননাকর ও অশ্লীল বিজ্ঞাপন প্রচার হচ্ছে। এই বিজ্ঞাপনগুলোতে নারীকে লক্ষ করে ব্যবহৃত ভাষা ও ক্যামেরার ল্যান্সে নারীকে যেমন করে দেখানো হয়, তাতে তাকে পণ্য ভাবা ছাড়া দর্শক মস্তিষ্কে দ্বিতীয় চিন্তা আসার সুযোগ নেই।
আমাদের মাঠেঘাটে ধুলোবালির মতো এখন অনলাইন পোর্টাল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সেগুলোয় যেমন, তেমনি কোনও কোনও পেশাদার বলে দাবিদার অনলাইন পোর্টালেও নারীর শরীর,  নারীকে জয় করার নানা ফন্দি-ফিকিরের টিপস দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত। এককথায় বলা যায়, নারীকে স্বচ্ছন্দ্যে ভোগ করার রেসিপি দিয়ে ‘লাইক’ আদায়ের বাণিজ্যে নেমেছে তারা। সঙ্গে ভিডিও জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। টেলিভিশন নাটকের সংলাপ ও সেখানে নারী চরিত্রগুলোকে দিয়ে যে ধরনের অভিনয় করানো হয়, তাতে শিল্পবোধের চেয়ে সরাসরি স্থূলতার প্রকাশই ঘটছে বেশি। এছাড়া টেলিভিশনে নারীকে যখন, যেভাবে পর্দায় উপস্থাপন করা হচ্ছে,  দেখা যাবে সেখানে ক্যামেরার চোখ শিল্প খুঁজছে না,  হন্যে হয়ে খুঁজছে নারীকে পণ্য করে দেখানোর উপকরণ।
গণমাধ্যমের বিস্ফোরণে দিশেহারা আমরা একটি বিষয় চিন্তার মানচিত্র থেকে হারিয়ে ফেলেছি। আমরা ভেবে দেখতে চাইছি না, আমাদের পাঠক,  দর্শক কারা? তাদের শিক্ষার স্তরের নাব্য। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নয়, তার কতটা সাংস্কৃতিক শিক্ষা আছে, সেটাও বিবেচনায় রাখতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও রক্ষণশীলতার ভনিতা যিনি করছেন, তিনিও যে এমন স্থূল খবর ও ভিডিওর গ্রাহক, আমাদের সেই কথাও তো ভাবনায় রাখতে হবে। সবার ওপরে রাখতে হবে এই তথ্যটি—আমাদের পাঠক, দর্শক সমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীদের প্রায় কেউই মিডিয়া বা গণমাধ্যমের জন্য যথার্থ শিক্ষিত-দীক্ষিত হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণের মতো ঘটনার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীদের বিশেষ স্পর্শকাতরতা দেখাতে হবে। যৌন নিপীড়নের ঘটনাটিকেই ‘সরস পণ্য’ না করে তোলার সংযমের পরিচয় দিতে হবে গণমাধ্যমকে। গণমাধ্যম ধর্ষণে উসকানির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে বা সেই রসদের জোগান দিচ্ছে, এমনটা বলছি না। বরং বলতে চাইছি গণমাধ্যমের এই আচরণ সমাজের চোখটাকে নারীর প্রতি মানবিক রাখতে সহায়ক ভূমিকায় নেই।
[লেখক : বার্তা প্রধান, সময় টিভি। বাংলা ট্রিবিউন থেকে।]

আরও পড়ুন