ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনি : অদূরে দক্ষিণে-৮

আপডেট: 12:58:47 07/11/2016



img
img

আবুল হাসান মুহম্মদ বাশার

(পূর্ব প্রকাশের পর)
কুশলাদি বিনিময়ের পর পেছনের দরজা দিয়ে বাইরে এলাম। মিল্টন ভাইয়ের বাড়িটা সামনের দিক থেকেও সুন্দর; পেছন থেকে মনে হয় আরো বেশি। লনটা নরম সবুজ ঘাসে ঢাকা। খালি পায়ে হাঁটতে দারুণ লাগছিলো। একপাশে ছেলেমেয়ের খেলার আয়োজন। এক কোণায় একটা নিঃসঙ্গ অর্কিড। শীত দুপুরের চমৎকার রোদে এরকম একটা জায়গায় স্রেফ দাঁড়িয়ে থাকাও এক আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা। আমি হাঁটছিলাম আর ভাবছিলাম। মিল্টন ভাই এর সবকিছুই ডিজার্ভ করেন। অত্যন্ত যোগ্য মানুষ তিনি। স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, সুন্দর বাড়ি, সুন্দর গাড়ি, ভালো মাইনের চাকরি, গবেষণা- একজন মানুষের জীবনে আর কী চাই! কিন্তু পাঁচ বছর আগেও এতকিছু ঠিক এভাবে চিন্তা করা যায়নি। নূপুর ভাবিতে এসেই মিল্টন ভাইয়ের অস্থির জীবনের তরী কূলে ভিড়লো- গভীর স্বস্তির সাথে কথাটা মনে করে ভাবনার ইতি টানলাম। স্যার ভেতরে ফোন নিয়ে ব্যস্ত। মিল্টন ভাই কিছু সময়ের জন্য অদৃশ্য। আমাদের নামাজের ব্যবস্থা করে দিয়ে নিজে নামাজ পড়তে ভেতরে গেছেন। ঘরে ঢুকতেই দেখলাম- মেয়ে পূর্ণতাকে কোলে নিয়ে মিল্টন ভাই। মেয়ে ঘুমিয়ে ছিলো- মাত্র উঠেছে। চোখে তখনো ঘুম লেগে আছে। ’কা-গা- মিল্টন ভাই আমাদেরকে পূর্ণতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন একটি শব্দে। বুঝা গেল শব্দটার সাথে ওর পরিচয় আছে। বাড়িতে ঐ সময় আমরা ছাড়াও ’কা-গা’ আরেকজন ছিলো। ডা. ইমরান। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের গ্রাজুয়েট, নিউক্যাসেল ইউনিভার্সিটিতে পড়ছেন। মিল্টন ভাইয়ের ছাত্র। পূর্ণতাকে সাথে নিয়ে আমরা খেতে বসলাম। আমাদের সামনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কুইজিন। প্রথমেই স্যুপ। সবজি-সমৃদ্ধ একেবারে ভিন্ন স্বাদের এই স্যুপে স্বাদের সাথে সু-স্বাস্থ্যটাও উঁকি দিয়ে গেল। ভাবি এখনো মুটিয়ে যাননি কেন- স্যুপ যেন তার একটা ব্যাখ্যা হাজির করলো আমাদের সামনে। মুরগির মাংস, মাছ, সবজি- এসব পাড়ি দিয়ে আমরা যখন ডেজার্টে পৌঁছোলাম- তখন নিজের বোকামির জন্য নিজেকে গাল দিচ্ছি। লাঞ্চের আগে টেবিলের ওপর রাখা রোস্টেড পিনাটের কৌটাটা সাবাড় করায় পেটে এখন জায়গার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কুইজিনকে এখন জায়গার জন্য সেই পিনাটের সাথে লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে। ডেজার্টের আয়োজনও নিতান্ত কম নয়। ভাগ্যিস ’আমাই মনো বেৎসুবারা’ অর্থাৎ ’মিষ্টান্নের জন্য সব সময়ই একটা আলাদা পেট থাকে’- জাপানি প্রবাদটা মাথায় ছিলো। নইলে ঐ ঠাসা পেটে ডেজার্টে হাত দেবার হিম্মত করা মুশকিল ছিলো।
লাঞ্চ শেষ হতে তিনটে বাজলো। আমরা দিনে দিনে ফিরে যাবো- মিল্টন ভাইকে এটা আগেই জানিয়ে রেখেছিলাম। ভাই আমাদেরকে স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে আসবেন। তার আগে আমরা চাইলাম মিল্টন ভাইয়ের কর্মস্থল নিউক্যাসেল ইউনিভার্সিটি এলাকাটা একটু ঘুরে আসতে। ভাই বললেন ৪টায় বের হবেন- একবারে আছরের নামাজটা পড়ে। আমরাও সেটাই চাইছিলাম। প্রস্তাবটা ভাইয়ের মুখ থেকে আসায় বুঝলাম নামাজ-কালামের ব্যাপারে উনি এখন অনেক মনোযোগী। গত বছর ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের পুনর্মিলনীতেও এটার প্রমাণ পেয়েছিলাম। মায়ের মৃত্যুই যে এই পরিবর্তনের কারণ, সেটা আরো স্পষ্ট হলো ভাইয়ের ল্যাবে গিয়ে। টেবিলের ওপর মায়ের ছবি। নিচে লেখা- ’তোমায় ভালোবাসি মাগো’। মাকে সবাই ভালোবাসে। মিল্টন ভাই ব্যতিক্রম হবেন কেন। মিল্টন ভাই ব্যতিক্রম অন্য একটা জায়গায়। দেশমাতৃকার জন্য ভালোবাসায়। পড়াশুনা ও চাকরিসূত্রে অস্ট্রেলিয়ায় আছেন ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য হয়েছেন অনেক আগেই। নেননি। দু’দিন আগে সিডনিতে হাসান, বীথি ও রুহামার নাগরিকত্বপ্রাপ্তি অনুষ্ঠানে হাজির ছিলাম আমরা। সিটি হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ওরা হাজির হয়েছিলো ওদের সেরা পোশাকে। বিভিন্ন দেশের আরো শতাধিক নব্য অস্ট্রেলীয়র সাথে গলা মিলিয়ে ওরাও ওদের নতুন দেশের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিয়েছিলো। বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্ট ওদেরকে আর কোনোদিন বিব্রত করবে না। মিল্টন ভাই ’সবুজ পাসপোর্ট’ নামে বই লিখেছেন। সেখানে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের সময় বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে তার ভোগান্তির বিবরণ আছে। তারপরও সবুজ পাসপোর্টটা বিসর্জন দিতে চাইছেন না।
‘তিন তিন বার ফিরিয়ে দিয়েছি। সামনের অক্টোবরে আবারো সুযোগ আসবে। এবার হয়তো আর পারবো না। নিজের জন্য না হলেও ছেলে-মেয়েদের জন্য ওটা দরকার’।
মিল্টন ভাইয়ের গলা এক বিশুদ্ধ বেদনায় আর্দ্র হয়ে আসে। স্টেশনে পৌঁছোতে তখনো বেশ কিছুটা পথ বাকি। আমরা আর কোনো কথা বলি না। রাস্তার দু’পাশের পাইন গাছের ভেতরে অন্ধকার গাঢ় হতে থাকে।

১৪. মেলবোর্ন : জুঁই ও বুলবুল ভাই
অস্ট্রেলিয়া আসছি- সংবাদটা সবার আগে যাকে জানিয়েছিলাম তার নাম জুঁই; আর যে গন্তব্যে খবরটা পৌঁছেছিলো, সেটা সিডনি নয়- মেলবোর্ন। জুঁই আমার খুব কাছের বন্ধু ডা. শওকত হায়দারের ছোট বোন- পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ছোটবেলা থেকে এই পরিবারটাকে আমি জানি। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাসিন্দা এরা। কপোতাক্ষ নদের কূলে ওদের চমৎকার বাড়িটাতে একসময় প্রায়ই যেতাম। শওকতের বাবা ছিলেন ঝিকরগাছা কলেজের অধ্যক্ষ। সবর্জনশ্রদ্ধেয় খ্যাতিমান এই শিক্ষাবিদ অল্প বয়সে মারা যান। তিন তিনটে মেয়ে আর এক ছেলেকে নিয়ে খালাম্মার অক্লান্ত পরিশ্রমের কিছুটা আমি দেখেছি। অসাধারণ এক মানুষ ছিলেন তিনি। ছিলেন বলতে কষ্ট হচ্ছে, তবে বাস্তবতা এই যে উনি আর নেই। ছেলেমেয়েরা সবাই যখন প্রতিষ্ঠিত, ঠিক সেই সময়ে হঠাৎ ৭ দিনের জ্বরে এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেলেন। খবরটা আমি পেয়েছিলাম জাপানে। জুঁইই জানিয়েছিলো ই-মেইলে। সদ্য মাতৃহীন ছেলেমেয়েদের বেদনা স্পর্শ করা সম্ভব হয়নি, তবু আমি গভীরভাবে আহত বোধ করেছিলাম। খুব মৃদুভাষী মানুষ ছিলেন, কথাবার্তা বেশি বলতেন না। তবে আমাকে দেখলে সাংঘাতিক খুশি হতেন, এটা বুঝতে পারতাম। তার মৃত্যুর সংবাদে কপোতাক্ষ তীরের সেই বাড়িটাকে ঘিরে আমার সুখ-স্মৃতিগুলো হঠাৎ করেই ডানাভাঙা পাখির মতো মুখ থুবড়ে পড়েছিলো। মায়ের মৃত্যুর ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে সময় লেগেছে, তবে মেধাবী ছেলেমেয়েগুলো শেষমেষ দারুণভাবে উঠে দাঁড়িয়েছে। জীবন-সংগ্রামে এদেরকে বিজয়ী হিসেবে দেখতে পেয়ে আমার অত্যন্ত আনন্দ হয়। শওকত সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করে চর্মরোগের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হিসেবে ঢাকা ও যশোরে প্রাকটিস করছে, বড় মেয়ে কেয়া ঝিকরগাছায় শিক্ষকতা করে, তার স্বামীও কলেজের শিক্ষক। সবার ছোট কান্তা ডাক্তার। প্রকৌশলী স্বামীর সঙ্গে সেও অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। জুঁই ময়মনসিংহ গালর্স ক্যাডেট কলেজের ছাত্রী ছিলো। বুয়েটে ভর্তি হয়েছিলো, কিন্তু পড়েছে অস্ট্রেলিয়ার ’রয়্যাল মেলবোর্ন ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি’ তথা RMIT। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ওদের যোগাযোগের সূত্র জুঁইয়ের এই পড়াশুনো। কর্মজীবনে ব্রিটিশ- আমেরিকান টোব্যাকোসহ বড় বড় কোম্পানির চাকরি করেছে।
জুঁইয়ের ব্যাপারে সবচাইতে বড় করে বলবার মতো সংবাদ বোধ হয় এটা যে ওর স্বামী বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল। আমি বুলবুল ভাইয়ের খেলার ভক্ত। একটা সময় ছিলো যখন ঢাকার মাঠে নিয়মিত ক্রিকেট খেলা দেখতে যেতাম। বুলবুল, নান্নু, মাসুম, রোকন, বিদ্যুৎ, সুমন- এদের কত খেলা যে মাঠে বসে দেখেছি। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান বুলবুল ভাইয়ের সাথে যখন জুঁইয়ের বিয়ে হয়, আমি তখন দেশের বাইরে। বুলবুল ভাই তখন তার খেলোয়াড়ী জীবন প্রায় শেষ করে ফেলেছেন। তাঁর সমৃদ্ধ ক্যারিয়ারের শেষটা উল্লেখ করবার মতো হয়নি। যে বিদায়ী সম্মানটা তার মাঠ থেকে পাওনা ছিল, সেটা তাকে দেয়া হয়নি। তবে এটাতে খুব বেশি অবাক হবার কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না, কেননা বাংলাদেশে কাউকে যথাসময়ে প্রাপ্য সম্মান দেয়ার সংস্কৃতিটাই যে নেই। কোনো বিদায়ী ম্যাচ উনি খেলেননি, আনুষ্ঠানিক বিদায় সংবর্ধনাও তাই হয়নি- সেই হিসেবে বুলবুল ভাই এখনো মাঠেই আছেন। আসলেই তাই। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের ডেভলপমেন্ট অফিসার হিসাবে মাঠে থেকেই ক্রিকেটের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন বুলবুল ভাই। চীন, আফগানিস্তান, তাইওয়ান, মালয়েশিয়াসহ বেশ কিছু দেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়ে যাবার দায়িত্ব পেয়েছেন। এসিসির প্রধান নির্বাহী বাংলাদেশি সৈয়দ আশরাফুল আলমই সম্ভবত একমাত্র ব্যক্তি যিনি বুলবুল ভাইকে মূল্যায়ন করেছেন ও করে চলেছেন। বুলবুল ভাই ও জুঁই দুই ছেলে নাবিল ও মাহদীকে নিয়ে মেলবোর্ন শহরে স্থায়ী হয়েছেন। ওরা ভালো আছে- এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। সন্তানদের ভবিষ্যৎ বিবেচনা করলেও উন্নত বিশ্বে প্রবাসীর জীবন সঠিক সিদ্ধান্ত, তবু বাতাসে একটা দীর্ঘশ্বাস যেন আমি শুনতে পাই।
(ক্রমশ)

আরও পড়ুন