ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনি : হোটেল সিয়াম-১

আপডেট: 02:14:12 25/10/2016



img

সুধাংশু শেখর বিশ্বাস

[এটি একটি পাণ্ডুলিপি। বই আকারে প্রকাশের আগমুহূর্তে আমাদের হস্তগত হয়েছে। আমরা এটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করবো। বইটি লেখা সম্পর্কে লেখকের নোট আছে। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, ১৯৯১ সালে সরকারি চাকরির সূত্রে তিনি বিদেশ গিয়েছিলেন। এটা তার প্রথম বিদেশ গমন। একইসাথে থাইল্যান্ড আর ফিলিপাইন।
চার সপ্তাহ ছিলেন ব্যাংককের ব্যানকেন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে। সেইসময় তিনি ঘুরেছেন থাইল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে, ঘুরেছেন গ্রামে, সবুজ প্রান্তরে। তখনকার টুকরো স্মৃতি, ঘটনা, অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির ফসল ‘হোটেল সিয়াম’।
কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের আমেরিকা ভ্রমণকাহিনি ‘হোটেল গ্রেভার ইন’ পড়ে ভীষণ রকমের মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। সেই মুগ্ধতার আবেশ মনের গহিনে ধরে রাখার প্রয়াসে থাইল্যান্ড ভ্রমণ উপন্যাসটির নাম দিয়েছেন ‘হোটেল সিয়াম’। কালের প্রবাহে কত জল গড়িয়ে গেছে। পঁচিশ বছরে কত পরিবর্তন হয়েছে ব্যাংকক শহরের। বদলে গেছে থাই জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, তাদের মন-মানসিকতা। নব্বই দশকের থাই মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবন-যাপন, সংস্কৃতি, মন-মানসিকতা অকৃত্রিমভাবে এই এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
বর্তমান লেখক ছাত্রজীবনে যুক্ত ছিলেন ‘ছাত্র ইউনিয়ন’, ‘উদীচী’, ‘খেলাঘর’ এর সাথে। সাংবাদিকতা করেছেন যশোরের ‘দৈনিক রানার’ পত্রিকায়। পরবর্তী জীবনে সরকারি চাকুরে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ে সহকারী সচিব হিসেবে কর্মজীবন শুরু। মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছেন ইউএনও হিসেবে সিরাজগঞ্জের কাজিপুর ও পিরোজপুরের কাউখালি উপজেলায় এবং এডিসি হিসেবে ঠাকুরগাঁও জেলায়।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরডিএ, বগুড়ার পরিচালক ছিলেন দীর্ঘদিন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে উপ-সচিব, যুগ্ম-সচিব পদে কাজ করেছেন। বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কর্মরত। এর আগে তার একটি লেখা 'ফিরে দেখা' শিরোনামে ধারাবাহিকভাবে সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত হয়েছে। আগের মতোই আশা করি পাঠকের ভালো লাগবে এই লেখাটিও। -বি. স. ]




ভিসা জটিলতা
অবশেষে আকাশে উড়লাম।
জীবনের প্রথম বিদেশ যাত্রা। ভেবেছিলাম যাওয়া হবে না। সরকারি আদেশ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নোট ভারবাল এসব পেতে পেতে বৃহস্পতিবার সকাল দশটা। ফ্লাইট রোববার দুপুরে। শুক্র, শনি বন্ধ। হাতে শুধু একটা দিন। এত স্বল্প সময়ে ভিসা কি পারব নিতে!
সন্দেহের দোলাচলে দুলতে দুলতে পাসপোর্ট, ছবি, কাগজপত্র নিয়ে ছুটি গুলশানের দিকে। ফিলিপাইনস আর থাই এমব্যাসির উদ্দেশে। একইসাথে দুই দেশে প্রোগ্রাম।
থাই এমব্যাসিই আগে পড়ল। ঘড়িতে তখন বেলা এগারোটা। ভাবলাম ওদের ভিসাটাই আগে নিয়ে নিই। কাউন্টারে বসে আছেন বাঙালি একজন। ফরম জমা নিতে নিতে সরকারি আদেশ দেখে বললেন-আপনি তো ফিলিপাইনসেও যাবেন।
: হ্যাঁ।
: ভিসা তো নেন নাই।
: আপনাদের এখানে সেরে ফিলিপাইনস এমব্যাসিতে যাব।
: আরে, করেছেন কী! আগে ওইখানে যান। থাইল্যান্ডে তো পোর্ট এন্ট্রি ভিসার ব্যবস্থা আছে। ব্যাংককে নেমেও নিতে পারবেন। কিন্তু ফিলিপাইনস এর ভিসা এখান থেকেই নিয়ে যেতে হবে। বেলা বারোটার পরে ওরা আর পাসপোর্ট জমা নেয় না। আমরা তো পাঁচটা পর্যন্ত আছি।
: তাহলে আপনাদের ফরম কী করব?
: সমস্যা নেই। আমি জমা নিয়ে নিলাম। আপনার জন্য অপেক্ষা করব। বললেন ভদ্রলোক। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দৌড়াই।

রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম। সে সব অতিক্রম করে ফিলিপাইনস এমব্যাসিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় বারোটা। গেট বন্ধ করে তালা লাগানোর উপক্রম করছে উর্দিপরা দারোয়ান।
দ্রুত গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে বলি, আমার ফ্লাইট সামনের রোববার। মাঝখানে শুক্র-শনি ছুটি। আজই ভিসা পেতে হবে। প্লিজ আমাকে একটু হেল্প করেন।
দয়া হলো তার। খুলে দিল গেট। বলল, আমরা তো ছোট মানুষ। তবু দেখি কী করতে পারি! আমাকে নিয়ে সে এগিয়ে চলল কাউন্টারের দিকে।
কোনো মানুষজন নেই। কাউন্টার ক্লোজড। দারোয়ান ভিতরে গিয়ে একজন অফিসারকে ডেকে নিয়ে এলো। সবিস্তারে আমার সমস্যা ব্যক্ত করলাম তাকে। তিনি বুঝলেন, কাগজপত্র দেখলেন। সবকিছু নিয়ে ভিতরে চলে গেলেন।
স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বারান্দায় এসে দাঁড়াই।
দারোয়ান বলল, হয়ে যাবে স্যার। আপনার ভাগ্য ভালো।
পায়চারি করছি। দারোয়ান গেট বন্ধ করে সুখ-দুঃখের কথাবার্তা বলছে আমার সাথে। কিছু একটা আঁচ করে সে এগিয়ে গেল ভিতরের দিকে। ফিরে এসে মুখ কালো করে বলল, সবাই তো চলে যাচ্ছে।
: চলে যাচ্ছে মানে! আঁতকে উঠি আমি। আমার পাসপোর্ট!
ফেরত না পেলে থাই ভিসাও তো নিতে পারবো না। প্রোগ্রামই ক্যানসেল হয়ে যাবে। বুকের ভেতরটা শুকিয়ে যেতে থাকে।
: ওই তো বড় সাহেব গাড়িতে উঠছেন। উনার সাথে কথা বলেন স্যার। নইলে রোববারের আগে আর পাসপোর্ট পাবেন না। গেটম্যান দৌড়ে চলে যায় গেট খোলার জন্য।
কী করবো বুঝে উঠতে পারি না। গাড়ি স্টার্ট দিয়েছে। আস্তে আস্তে এগোচ্ছে সামনের দিকে।
নিরুপায় আমি চোখের পলকে দুই হাত উঁচু করে গাড়ির গতি আটকে সামনে দাঁড়িয়ে যাই।
: দাঁড়াও। তোমার সাথে কথা বলতে চাই।
জিজ্ঞাসু নেত্রে তিনি আমার দিকে তাকান। পরিচয় দিয়ে বলি, দেখো, অফিসিয়াল কাজে তোমাদের দেশে যাব। ভিসার জন্য জিও, ফরেন মিনিস্ট্রির নোট ভারবাল, সব ডকুমেন্টসসহ আমার পাসপোর্ট জমা দিয়েছি। রোববারে ফ্লাইট। তোমরা ভিসা যদি না দিতে চাও, দিও না। কিন্তু আমার পাসপোর্ট ফেরত দাও। যাতে থাই ভিসা নিতে পারি। ওরা আমার জন্য বসে আছে। তোমার রাস্তা আটকানোর জন্য দুঃখিত। কিন্তু আমার পাসপোর্ট ফেরত না দিয়ে তুমি যেতে পারবে না।
কী ভাবলেন ভদ্রলোক জানি না। গাড়ির দরজা খুলে নামলেন। কোনো কথা না বলে সোজা পেছন ফিরে অফিসে ঢুকে গেলেন। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই বের হয়ে আমার হাতে পাসপোর্ট ধরিয়ে দিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লেন।
আমি ধন্যবাদ জানালাম। তিনি মাথা নেড়ে চলে গেলেন।
স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি। ফিলিপাইনে যাওয়া না হোক। থাইল্যান্ড তো আর মিস হচ্ছে না। পকেট থেকে একশ টাকা বের করে গেটম্যানকে দিই। কিছুতেই নিতে চায় না। জোর করে পকেটে গুঁজে দিয়ে তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে রিকশা ধরি।
হন্তদন্ত হয়ে থাই এমব্যাসিতে ঢুকলাম। এটা মিস হলে তো সব গেল।
কাউন্টারে ভিড় নেই। সেই ভদ্রলোকই বসে আছেন।
: আপনার অপেক্ষায়ই আছি। পেয়েছেন ভিসা?
: না। বিরক্তি প্রকাশ করে পুরো ঘটনা খুলে বলি।
: ব্যাটারা বদমাইশ। কোনো কাজ নেই, কর্ম নেই। সারাদিনে একটা মাছিও ভিসার জন্য ফিলিপাইনস এমব্যাসিতে যায় কিনা সন্দেহ। আবার ভাব দেখায়, না জানি কত ব্যস্ত। কত কড়া নিয়ম কানুন তাদের। ভালো করেছেন পাসপোর্ট নিয়ে এসে। আপনারা সরকারি অফিসার। জোর করে চেপে ধরলে হয়তো ভিসা দিয়েও দিত।
: দরকার নাই। বদমাইশদের দেশে না যাওয়াই ভালো। বিরক্তিতে নাক কুঁচকাই।
ভদ্রলোক পাসপোর্ট নিয়ে পৃষ্ঠা ওল্টাতেই অবাক হয়ে বললেন, ভিসা তো দিয়েছে। দেখেন নাই!
: তাই নাকি! বিস্মিত আমি। কই দেখি। সত্যি সত্যি জ্বলজ্বল করছে এমব্যাসির সিল মারা পৃষ্ঠাটা। ভিসা দিয়েই পাসপোর্ট ফেরত দিয়েছে তাহলে! কিন্তু ব্যাটার চেহারায় সেরকম কোনো ভাব তো দেখলাম না। বরং চোখেমুখে লেপটে ছিল রাজ্যের বিরক্তি।
: ব্যাটাদের ঘাবড়ে দিয়েছিলেন। ভয় পেয়ে তাই ভিসা দিয়ে দিয়েছে। হা হা হা... স্যরি, মজা করলাম। একটু দাঁড়ান। সিলটা দিয়ে নিয়ে আসি। হাসতে হাসতে ভিতরে চলে যান ভদ্রলোক।
বিশ্বাস হতে চায় না। দুই দেশেই যাওয়া হচ্ছে তাহলে!
: উইশ ইয়োর গুডলাক। পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে বলেন ভদ্রলোক।
ধন্যবাদ জানিয়ে বের হয়ে স্কুটারে উঠে পড়ি। রাজ্যের ক্লান্তি ঘিরে ধরে আমাকে। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে...
সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজে বড় দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ি একটা।


হোটেল সিয়াম
ফ্লাইট দুপুরের পর পর। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। আকাশে শান্তির নীড়।
সরকারি কাজে বিদেশে গেলে বাংলাদেশ বিমানে ভ্রমণের বাধ্যবাধকতা আছে (সে সময়ে ছিল, এখন নেই)। পুরো রুটে বিমানের সার্ভিস না থাকলে যে পর্যন্ত তাদের ফ্লাইট আছে সে পর্যন্ত বিমানেই যেতে হবে। তারপর অন্য ফ্লাইট। ম্যানিলাতে বিমান যায় না। তাই আমার রুট হলো ঢাকা-ব্যাংকক বিমানে এবং ব্যাংকক-ম্যানিলা ফিলিপাইনস এয়ারলাইনসে।
এয়ারপোর্টে গিয়েই শুনি একঘণ্টা লেট। সেই লেট প্রলম্বিত হলো আরো একঘণ্টা। অবশেষে প্লেনে ওঠার ডাক আসে। জীবনে প্রথম প্লেনে চড়া। অনুভূতিটা অন্যরকম। সম্পূর্ণ ভিন্ন। মনের মধ্যে অজানিত শঙ্কা। কী যেন এক ভয় ভয় শিহরণ।
সিট পড়েছে জানালার পাশে। কাচের জানালা ভেদ করে বাইরের দিকে তাকাই। শেষ বিকেলের নরম রোদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে বিচিত্র সব রঙ। গোধূলির নিস্তব্ধতা নেমে আসছে একটু একটু করে।
শুনলাম বার্মার (বর্তমানে মায়ানমার) রেঙ্গুন (বর্তমানে ইয়াঙ্গুন) টাচ করে যাবে প্লেন। এক ঘণ্টার স্টপ ওভার। ভালোই লাগল শুনে। রেঙ্গুন দেখে যেতে পারব। আশেপাশে বেশিরভাগই বাঙালি যাত্রী। কয়েকজনের কাছে শুনলাম, তারা যাচ্ছে বিজনেস ট্রিপে। কম বয়সী ছেলে। দেখে ব্যবসায়ী মনে হয় না। আর একজন ব্যাংককেই থাকেন। চাকরি করেন। পরিচয় হলো দুজন স্টুডেন্টের সাথে। এআইটিতে (এশিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলোজি) মাস্টার্স করছে তারা। আলাপ চলতে থাকে সমান তালে। জমে ওঠে গল্পের আসর।
কিছুক্ষণের মধ্যেই প্লেন ল্যান্ড করল রেঙ্গুন এয়ারপোর্টে। কিন্তু আমাদের নামতে দেবে না। ভেবেছিলাম, এয়ারপোর্টের ডিউটি-ফ্রি শপগুলো ঘুরে ঘুরে দেখবো। ইমিগ্রেশন পার না হয়ে গেলেই তো হলো। কিন্তু প্লেনের লোকজন বলল, সিকিউরিটি প্রবলেম।
এক ভদ্রলোক ব্যস্তসমস্ত হয়ে দ্রুতপায়ে বিমানের লেজের দিকে যাচ্ছিলেন। মনে হলো, বিমানবালাদের উপরে হবে তাঁর অবস্থান। বিনয়ের সাথে বলি, ভাই, রেঙ্গুনে আসার সুযোগ আর কোনোদিন হয় কি, না হয়। আমাদেরকে যদি একটু নীচে নামতে দিতেন তাহলে নাতি-নাতনিদের কাছে অন্তত গপ্প মারতে পারতাম, যে রেঙ্গুনের মাটিতেও পদচিহ্ন রেখে এসেছিলাম।
ভদ্রলোক হেসে ফেলেন। বলেন, ঠিক আছে, যান। তবে প্লেনের পাশে সিঁড়ির কাছেই থাকবেন। দূরে যাবেন না। নইলে বিপদে পড়ে যাব আমি।
: না না। বিপদে ফেলব কেন আপনাকে! আমরা সিঁড়ির নীচেই থাকবো। দূরে যাবো না। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
: ঠিক আছে। তিনি চলে যান। যাবার সময় দরোজার কাছে দাঁড়ানো বিমানবালাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে যান।
আমরা সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামি। নিয়ন বাতির আলো সারিসারি। এই লাইন ধরেই প্লেন ছুটবে। একসময় টেক অফ করে উঠে যাবে দূর আকাশে। চলে যাবে পৃথিবীর আর এক প্রান্তে।
রেঙ্গুন থেকে যারা প্লেনে উঠল, অবাক দৃষ্টি মেলে তাদেরকে দেখতে থাকি। যেন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো এইমাত্র। দু’একজনের মাথায় আবার পাখির পালকের মতো কিছু গোঁজা। অবাক হয়ে ভাবি, এই নব্বই দশকেও এমন বেশ!
লক্ষ্য করে দেখি, তেল চুপচুপে বড় বড় চুল বেশির ভাগেরই। উদ্ভট পোশাক-আশাক। রং বেরঙের ঢোলা আলখাল্লাও আছে দু’একজনের গায়ে। একজনের মাথায় তো রীতিমতো মাঠে কাজ করা কৃষকের টোকা। সেটা পরেই সে গটগট করে প্লেনে উঠে সিটে গিয়ে বসে পড়ল।
আমার এতদিনের ধারণা বদলে যেতে থাকে। কল্পনা ছিল, প্লেনের যাত্রী হবে আধুনিক পোশাক পরিহিত। কোট-টাই পরা ফিটফাট চেহারা। কল্পনার ধারকাছ দিয়েও তো যায় না এরা।
ব্যাংকক এসে গেছে প্রায়। মনে পড়ল, আমাকে তো রাতে থাকতে হবে কোনো হোটেলে। কাল সকালে ম্যানিলার ফ্লাইট। ব্যাংককে আসিনি কখনও। সবই অচেনা। এয়ারপোর্টের কাছাকাছি কোথায় হোটেল, কীভাবে যেতে হবে, কিছুই তো জানি না।
পাশে বসা এআইটির স্টুডেন্টকে বললাম আমার সমস্যার কথা। তিনি অবাক হয়ে বললেন, কেন বিমান আপনার জন্য হোটেলের ব্যবস্থা করে নি?
: না তো! করার কথা নাকি? বিস্মিত হয়ে জানতে চাই।
: অবশ্যই করার কথা। আপনি পরে ক্লেইম করলেও হোটেল ভাড়ার টাকা পাবেন।
: তাই নাকি! আমাকে তো বলল না ওরা! প্রথম বিদেশ ভ্রমণ, তাই অনেক কিছুই জানি না। জানলে তো ঢাকা থেকেই সব ঠিকঠাক করে আসতাম।
: বিমানের টিকেট কিনেছেন। ওদেরই দায়িত্ব রাতে আপনার থাকার ব্যবস্থা করা। এয়ারপোর্টে ওদের বুক করা হোটেল আছে ট্রানজিট প্যাসেঞ্জারদের জন্য। আপনি কিছু বলেননি। ওরাও সেটা আপনাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি।
: সে তো পরের কথা। এখন এটিআই যাবার পথে আপনাদের চেনা এমন কোনো হোটেলে আমাকে যদি একটু ড্রপ করে যান তাহলে নিশ্চিন্ত হতে পারি। রাত হয়ে গেছে। চিনি না, জানি না কিছুই। ভয় পাচ্ছি একটু।
: ঠিক আছে। চিন্তা করবেন না। পরিচয় যখন হয়েছে, তখন আপনাকে কোনো হোটেলে উঠিয়ে দিয়েই যাব।
এয়ারপোর্ট থেকে ব্যাংকক মূল শহরের দিকে যে রাস্তা তার উল্টোদিকে এআইটি। ওরা দুজনেই থাই ভাষা জানে। পরে জেনেছিলাম, থাই ভাষার উদ্ভব পালি ভাষা থেকে। সে কারণে বাংলা, সংস্কৃতি, এমনকী হিন্দি অনেক শব্দের সাথে থাই শব্দের মিল পাওয়া যায়।
রীতিমতো দামদস্তুর করে ওরা ট্যাক্সি ঠিক করে ফেলল এআইটি পর্যন্ত। আমরা রওনা হয়ে গেলাম। শহরের বাইরে, তবে এয়ারপোর্ট থেকে খুব একটা দূরে নয়, রাস্তার পাশে একটা হোটেল পাওয়া গেল। বড় বড় লাল অক্ষরে ইংরেজিতে নাম লেখা ’হোটেল সিয়াম’। লেখাগুলো জ্বলছে, নিভছে। অনেক দূর থেকেই নজরে পড়ে।
অনুমান করি, সিয়াম নয়। বাংলায় বললে দাঁড়াবে ’শ্যাম’। মনে পড়ল, থাইল্যান্ডের নাম তো একদা ‘শ্যামদেশ’ই ছিল।
ট্যাক্সি হোটেলের লবিতে ঢুকে পড়ল। পুরো অন্ধকার। লোডশেডিং নাকি! কিন্তু না! চারপাশ তো আলো ঝলমলে।
নীচে টর্চ হাতে একজন দাঁড়িয়ে। দৌড়ে সে আমাদের ট্যাক্সির কাছে চলে আসে। রুমভাড়া পাঁচশ বাথ। তাই সই। আমার কাছে তখন টাকা-পয়সা বিষয় নয়। দরকার রাতের আশ্রয়। ছেলেটির হাতে আমাকে হাওলা করে দিয়ে ওরা চলে যায় এআইটি’র দিকে। কৃতজ্ঞচিত্তে বারবার ধন্যবাদ জানাই ওদের।
: হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কে বলে রাখবেন, যেন ভোরে আপনাকে কল করে জাগিয়ে দেয় আর এয়ারপোর্টে ড্রপ করার জন্য একটা ট্যাক্সি ঠিক করে দেয়। ছয়টার মধ্যেই বেরিয়ে পড়বেন। বলে গেল ওরা।
আমাকে রুমে পৌঁছে দিয়ে টাকা নিয়ে টর্চওয়ালা ছেলেটা ছুটে বেরিয়ে যাবার উপক্রম করে। রেজিস্ট্রারে নাম লেখাল না, সই সাবুদ কিছুই নিল না। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি, ব্যাপারটা কী!
ব্যাটা কোনো উত্তর না দিয়ে চলে যায়। পরে বুঝেছি, সে ইংরেজির কিছুই বোঝে না।
রুম দেখে মুগ্ধ হতেই হলো। কিন্তু পেটে খিদে জানান দিচ্ছে বারবার। মুগ্ধতার আবেশ একপাশে সরিয়ে রেখে কোনোমতে চোখেমুখে জল দিয়ে নীচে নেমে যাই। খাবারের কোনো হোটেল আছে কিনা খুঁজতে থাকি।
অন্ধকার চারিদিকে। আশেপাশে কোনো আলো দেখি না। শুধু দূরে সেই ছেলেটা টর্চ হাতে এদিক-ওদিক করছে। কোনো গাড়ির হেডলাইট দেখলেই ছুটে চলে যাচ্ছে সেদিকে।
টর্চওয়ালার কাছে গিয়ে জানতে চাই, আশেপাশে কোনো রেস্টুরেন্ট বা খাবারের দোকান আছে কিনা!
সে ব্যাটা কিছুই বোঝে না। বিব্রত হয়ে অসহায়ের মতো হাত নাড়ে।
মাথায় বুদ্ধি খেলে যায়। ডান হাত মুখের কাছে তুলে খাবারের ভঙ্গী করি। আর বাম হাত দিয়ে পেট দেখাতে থাকি। বডি ল্যাংগুয়েজ সর্বজনীন। এই ভাষা সবাই বোঝে। ছেলেটার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না। আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল হোটেল বিল্ডিংয়ের পেছন দিকটায়। সত্যিই খাবারের ব্যবস্থা আছে। ছেলেটা চলে যায়। আমি রেস্টুরেন্টের ভিতরে ঢুকে পড়ি।
একজনই মাত্র বসা। তিনি খাচ্ছেন। খরিদ্দার নিশ্চয়ই।
: এখানকার লোকজন কই? জিজ্ঞেস করি তাঁর কাছে।
: আমাকে বলতে পারো। খেতে খেতেই বলেন ভদ্রলোক।
: খাবার কিছু আছে? জানতে চাই অবাক হয়ে।
: কী ধরনের খাবার খেতে চাও তুমি? সুন্দর ইংরেজিতে উত্তর দিলেন ভদ্রলোক।
: ইন্ডিয়ান রেসিপি হলে ভালো হয়। রাইস আছে?
: হ্যাঁ, রাইস আছে। তবে স্টিকি।
বিষয় কী! লোকটা কে হতে পারে! ভ্রু কুঁচকে তাকাই তাঁর দিকে।
আমার মনোভাব বুঝলেন তিনি। বললেন, কিছু মনে কোরো না। এই রেস্টুরেন্টটা আমার। এখন ক্লোজিং টাইম। খরিদ্দার নেই। এই সুযোগে ডিনারটা সেরে নিচ্ছি। ওয়েটাররাও ভিতরে খাচ্ছে।
: ও আচ্ছা! আর এই হোটেল?
: এই হোটেলের মালিকও এই অধমই বটে।
: তাই!
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। তার চেহারা-সুরত দেখে আমার বিশ্বাস হতে চায় না যে, তিনি এতবড় একটা হোটেলের মালিক। খাবার শেষ করে ভদ্রলোক সামনে এসে বসলেন।
: হোটেল তো বেশ বড়। দেখতেও অনেক সুন্দর। কিন্তু বাইরেটা অন্ধকারে ঢেকে রেখেছো কেন?
: এটা উইক এন্ড হোটেল। এখানকার খদ্দেররা বেশিরভাগই আসে শুক্রবার রাতে তাদের বান্ধবীদের নিয়ে ফুর্তি করতে। আলোতে তারা শাই ফিল করে। সেজন্য বাইরে অন্ধকার। বাট ডোন্ট ওরি। রুমের ভিতরে অনেক আলো। বলতে পারো আলোর প্রাচুর্য। ওয়ালের চারধারে গ্লাস। এমনকী মাথার উপরেও বেড সাইজের আয়না সেট করা আছে। আলোর প্রতিফলন হয়ে ভিন্ন মাত্রিক এক আবহ তৈরি হয়। যা করবে তার পুরোটা নিজের চোখে দেখে নয়ন সার্থক করতে পারবে। হা হা হা...
: বুঝলাম। এখন আমার খাবারের ব্যবস্থা করো। প্রচণ্ড খিদে পেটে। তুমি কি ডিমের ওমলেট আর ভেজিটেবল দিতে পারবে?
: তা পারবো। চিকেনও ফ্রাই করে দেয়া যাবে।
: তাহলে দাও। রাইস, চিকেন, ভেজিটেবল। সাথে ডাবল ডিমের ওমলেট। ফ্রাইটা যেন কড়া হয়।
তিনি খাবারের অর্ডার কিচেনে পৌঁছে দিলেন। আমি বসে রইলাম।
: খাবার কি শুধু তোমার জন্য! নাকি রুমে সঙ্গী আছে?
: না না, আমি একাই। ভালোই হলো তোমাকে পেয়ে। আমাকে সাড়ে পাঁচটায় ওয়েক আপ কল দিয়ে ঘুম ভাঙানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আর একটা ট্যাক্সি ডেকে দিতে হবে। আমার ফ্লাইট সকাল আটটা চল্লিশে। ঠিক ছয়টায় হোটেল থেকে বের হতে চাই। বিশ মিনিটেই তো এয়ারপোর্টে পৌঁছে যাব, তাই না?
: হ্যাঁ, তা পৌঁছে যাবে।
ইন্টারকমে তিনি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে দেন। বললেন, ঠিক টাইমে ট্যাক্সি নীচে থাকবে। কল দিয়ে তোমার ঘুম ভাঙাবে সাড়ে পাঁচটায়। ছয়টা বাজার পাঁচ মিনিট আগে এটেনডেন্ট তোমার রুমে গিয়ে লাগেজ নিয়ে ট্রাক্সিতে তুলে দেবে।
: অনেক ধন্যবাদ তোমাকে।
: কোথা থেকে এসেছো তুমি, ইন্ডিয়া?
: না, বাংলাদেশ। বাংলাদেশের নাম শুনেছো?
: হ্যাঁ শুনেছি। কিন্তু যাইনি কখনও। রাতে কোনো সঙ্গী লাগবে তোমার? কমবয়সী ভালো মেয়ে আছে। তবে আগেই সাবধান করে দিই, এইডস-এর রিস্ক আছে। সুতরাং কনডম মাস্ট।
: দেখ, আমি ভীষণ টায়ার্ড। কোনো ঝামেলা চাই না। আমার দরকার ভালো একটা ঘুম। কেউ যেন আমাকে ডিস্টার্ব না করে।
খাবার এসে পড়ে। চিকেন গতানুগতিক। কিন্তু ওমলেটটা দারুণ! প্রচণ্ড খিদেয় গরম ভাতের সাথে খেতে অমৃতের মতো লাগল। আহা, সাথে যদি এক চামচ গাওয়া ঘি থাকতো!
সবজিটাও মন্দ নয়। ভাপে সেদ্ধ। গল্প করতে করতে ভালোই ডিনার হলো।
রুমে ফিরে সবগুলো বাতির সুইচ অন করে দিলাম। আলোয় ঝলমল করে উঠল পুরো ঘর। চারধারের দেয়ালের আয়নায় আলো প্রতিফলিত হয়ে সত্যিসত্যিই অলৌকিক এক আবহ তৈরি হলো। বিছানায় শুয়ে উপরের দিকে তাকালাম। পুরো বিছানাটাই আয়নায় দৃশ্যমান। ব্যাটা তো ঠিকই বলেছে।
ঘুমানোর চেষ্টা করি। কিন্তু ঘুম আসে না। চোখ বুজে আকাশের তারা গুনতে থাকি। তারপর আর কিছু জানি না। ঘুম ভাঙলো ওয়েক আপ কলে।
রেডি হয়ে ট্যাক্সি, এয়ারপোর্ট, ফিলিপাইনস এয়ারলাইনস।
সিটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতে ভাবি যাচ্ছি নতুন আরেক দেশে... ফিলিপাইনসে।
(ক্রমশ)

আরও পড়ুন