ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনি : হোটেল সিয়াম-২

আপডেট: 02:45:40 14/11/2016



img

সুধাংশু শেখর বিশ্বাস

(পূর্বপ্রকাশের পর)


হারিয়ে যেতে নেই মানা

ফিলিপাইনসের প্রোগ্রাম শেষ। ছয় সপ্তাহের ট্রেনিং সেরে উড়লাম ম্যানিলা থেকে। প্লেন এসে ল্যান্ড করল ব্যাংকক এয়ারপোর্টে। থাইল্যান্ডে প্রোগ্রাম চার সপ্তাহের।
প্লেনের অধিকাংশ যাত্রীই জাপানি। বোঝা গেল, তারা দলবেঁধে প্যাকেজ ট্যুরে বেরিয়েছে।
তাদের পিছু পিছু আমিও ইমিগ্রেশন পার হয়ে লাগেজ কালেক্ট করে বাইরে চলে এলাম। ব্যানকেন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. ইসারা সুকসাথান নিজেই আমাকে রিসিভ করবেন এয়ারপোর্টে। তাঁর সাথে ম্যানিলা থেকেই কথা বলিয়ে দিয়েছে প্রোগ্রাম কর্তৃপক্ষ। একটু বেশি সতর্ক ছিলাম এ কারণে যে, ফিলিপাইনে যাবার সময় ম্যানিলা এয়ারপোর্টে যথেষ্ট ভোগান্তি হয়েছিল। সেই কথা মনে করে আগে থেকেই সাবধানতা অবলম্বন করি। অনেকটা নিশ্চিন্ত এবার।

ব্যাংকক এয়ারপোর্ট দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। পরিষ্কার ঝকঝকে তকতকে। আয়নার মতো চকচকে মেঝে। নিজের চেহারা দেখা যায়। ইচ্ছে করে মেঝেতেই চিৎ পটাং হয়ে শুয়ে পড়ি। এয়ারপোর্টও বিশাল। এ মাথা থেকে ও মাথা দেখা যায় না। পঁয়তাল্লিশ নম্বর পর্যন্ত গেট তো আমার নজরেই পড়ল। আরো আছে নিশ্চয়ই। সে তুলনায় ম্যানিলা এয়াপোর্ট বড়ই দীনহীন।
ব্যাংকক এয়ারপোর্টেই প্রথম অটো ডোর দেখলাম। সামনে গিয়ে দাঁড়ালে আপনা আপনি দরোজা খুলে যায়। কী আশ্চর্য! যেন আলাদীনের চেরাগ! টয়লেট, ওয়াশরুমেও 'অলৌকিক' সব ব্যাপার-স্যাপার। হাত পাতলে জল পড়ে। গরম বাতাস বের হয়। হাত সরিয়ে নিলে আপনা আপনিই বন্ধ হয়ে যায়।
তেলেসমাতি কারবার! প্যাঁচ দিয়ে কল বন্ধ করতে হয় না।
কিন্তু ইসারা সুকসাথান! তিনি কোথায়!
রিসিভ করতে আসা লোকজন দাঁড়িয়ে আছে গেস্টের নাম বা তাদের দেশের নাম লেখা প্লাকার্ড হাতে নিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশ অথবা আমার নাম লেখা কোনো প্লাকার্ড নজরে পড়ে না। বর্ণনা মতো কাউকে ড. ইসারা বলেও মনে হয় না। ম্যানিলা এয়ারপোর্টে যে গাড্ডায় পড়েছিলাম এখানেও কি তার পুনরাবৃত্তি হবে!
অপেক্ষায় থাকি। মনকে বোঝাই, ইসারা নিশ্চয়ই এসে যাবেন। হয়তো ট্রাফিক জ্যামে পড়েছেন। হাঁপাতে হাঁপাতে এক্ষুণি এসে বলবেন, স্যরি, কিছু মনে কোরো না। একটু দেরি হয়ে গেল।
কিন্তু না। কাউকে দেখি না। অস্থির হয়ে পায়চারি করতে থাকি।
ড. ইসারার বাসার একটা ফোন নম্বর আছে আমার কাছে। সেটা বের করে কয়েন ঢুকিয়ে টেলিফোন বক্স থেকে কল করি। একটা বাচ্চা মেয়ে ফোন ধরে। কিন্তু কী যে বলে, মাথা মুণ্ডু বুঝি না কিছুই।
বারবার বোঝানোর চেষ্টা করি, এয়ারপোর্টে অনেকক্ষণ বসে আছি আমি। ড. ইসারার আমাকে রিসিভ করার কথা। কিন্তু তাঁকে পাচ্ছি না। তড়বড় করে মেয়েটি কী যেন বলে যায়, বুঝি না কিছুই। আরো দুই বার ট্রাই করলাম। রেজাল্ট সেই একই। দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে ভাবি, কপালের ভোগ কে আর খণ্ডাবে!
সামনে এক ভদ্রলোক অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে। মনে হয় কাউকে রিসিভ করতে এসেছেন। অপেক্ষার প্রহর কাটাতে পায়ে পায়ে পায়চারি করছেন। হাতে বড় সাইজের ওয়াকিটকির মতো মোবাইল সেট। মাঝেমধ্যে কথা বলছেন ফোনটা কানের কাছে তুলে। এগিয়ে যাই তার দিকে। সবিনয়ে বলি -তুমি কি ইংরেজি জানো?
: জানি। বাট, নট সো ফ্লুয়েন্ট। কেন বল তো?
: ভীষণ কৃতজ্ঞ থাকব, যদি আমাকে একটু সাহায্য কর। আমি বিদেশি। ম্যানিলা থেকে ফিলিপাইনস এয়ারে এখানে এসে নেমেছি। আমাকে রিসিভ করার কথা ছিল ব্যানকেন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. ইসারা সুকসাথানের। প্রায় দুই ঘণ্টা এখানে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু পাচ্ছি না তাকে। বাসায় ফোন করছি। যে রিসিভ করছে সে ইংরেজি বোঝে না। আর আমিও থাইভাষা বুঝি না।
: ও আচ্ছা। এখন বলো, আমি তোমাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি।
: তুমি এই নম্বরটায় ফোন করে তোমাদের ভাষায় কথা বলে একটু যদি একটু জেনে দাও যে, ড. ইসারা এয়ারপোর্টে এসেছেন কিনা! তিনি আমার প্রোগ্রামের কো-অর্ডিনেটর। মুশকিল হলো, আমার থাকার ব্যবস্থাও উনি করেছেন। কিন্তু কোথায়, সেটা জানি না।
: ও কে। বলে ভদ্রলোক ফোন করলেন। নিজেদের ভাষায় বেশ কিছুক্ষণ কথা বললেন। তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, উনি তোমাকে নিতে এয়ারপোর্টে এসেছেন যথাসময়েই। তুমি কি গ্রুপে এসেছো?
: না, আমিতো একাই।
: তাহলে তুমি এই গেট দিয়ে বের হয়েছো কেন? দেখি তোমার পাসপোর্ট।
আমি পাসপোর্ট এগিয়ে দিই। তিনি দেখে বলেন, ভুল করেছো। এই গেট তাদের জন্য, যারা প্যাকেজ ট্যুরে থাইল্যান্ড বেড়াতে আসে। তোমার বের হবার গেট নম্বর হলো এক। আচ্ছা দাঁড়াও।
তিনি আমাকে অনুসন্ধান ডেস্কে নিয়ে যান। বুঝিয়ে বলেন ওদেরকে।
বারবার ঘোষণা হতে থাকে, ড. ইসারা সুখসাথান, তোমার বাংলাদেশি গেস্ট মি. বিছওয়াচ এক্সিট গেট থ্রিতে ইউনিভার্সাল বুক স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ভুল করে এই গেটে চলে এসেছেন। প্লিজ ইসারা, এয়ারপোর্টে থাকলে রেসপন্ড করো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই এক নম্বর গেটের এনকোয়ারি থেকে জানানো হলো, বিছওয়াচ ওখানেই থাকুক। ইসারা পনের মিনিটের মধ্যেই তাকে পিক করবেন।

মোবাইল ফোনওয়ালা ভদ্রলোককে অনেক ধন্যবাদ জানাই। কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি। দেখতে দেখতে ইসারা এসে পড়েন।
: তোমার জন্য অপেক্ষা করতে করতে হতাশ হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু প্লেনের প্যাসেনজার লিস্ট চেক করে দেখলাম, তুমি এসেছো। অথচ তোমাকে পাচ্ছি না। আমি তো চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়েছিলাম। যা হোক চলো, আগে বের হই এখান থেকে। বলে ইসারা আমার ব্যাগ হাতে তুলে নেন।
: আরে করো কী, করো কী। বলে তার হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে নিই।
: তাহলে হ্যান্ডব্যাগটা অন্তত আমাকে দাও। তোমাকে সাহায্য করি। নিশ্চয়ই অনেক খিদে পেয়ে গেছে তোমার।
এতক্ষণ টেনশনে খিদের কথা মনে ছিল না। ইসারার কথায় খিদে পেটের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে। আমরা এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠে যাই।


ইসারা সুখসাথান

: এই রেস্টুরেন্টটা মোটামুটি ভালো। ইসারা গাড়ি দাঁড় করিয়ে ফেলেন রাস্তার পাশে।
ভিতরে ঢোকার জন্য দরোজা খুলি। বিদঘুটে বোটকা একটা গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা দেয়। গা গুলিয়ে ওঠে আমার।
কীসের গন্ধ এটা!
অবাক হয়ে ইশারার মুখের দিকে তাকাই। তিনি বোঝেন না, কেন আমি তাকিয়ে আছি তার দিকে জিজ্ঞাসু নেত্রে।
: কী খাবে? স্বাভাবিক কণ্ঠেই জানতে চান তিনি।
: তার আগে বলো, বিশ্রী এই গন্ধটা কীসের?
: বিশ্রী গন্ধ! ও আচ্ছা। এটাকে বিশ্রী বলছো কেন! এতো জমাট বাঁধা রক্তের গন্ধ। খুবই স্বাস্থ্যকর খাবার।
বলে কী! পাগল নাকি!
: স্বাস্থ্যকর খাবার মানে? তোমরা রক্তও খাও নাকি!
: নানা, তুমি যা ভাবছো তা নয়। মাংসের সাথে যে রক্ত মিশে থাকে সেটাকে না ধুয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে প্রসেস করে রান্না করা হয়। খুবই সুস্বাদু। এই রান্নাটায় এরা স্পেশালিস্ট। টেস্ট করে দেখ একবার।
: প্রশ্নই ওঠে না। চলো বের হই এখান থেকে। রক্ত মেশানো মাংস তো দূরের কথা, এখানকার কোনো খাবারই আমার মুখে রুচবে না। আর কিছুক্ষণ যদি এই রেস্টুরেন্টের ভিতরে থাকি, নির্ঘাৎ বমি করে ফেলব।
ঘাবড়ে যায় ইসারা। তাড়াতাড়ি আমাকে নিয়ে বাইরে চলে আসেন।
: তাহলে খাবে কী? বাটার, রুটি, দুধ, ফ্রুটস এসবে চলবে? চিন্তিত হয়ে বলেন তিনি।
: তা, চলবে। তবে ফ্রাই করা হলে চিকেন, ফিস, এগ কোনোটাতেই সমস্যা নেই।
: তাহলে চলো তোমাকে ফুটপাতের দোকানগুলোতে নিয়ে যাই। ওখানে ফ্রাই খাবার পাওয়া যায়। খুবই সস্তা। দশ পনের বাথেই যে খাবার পাবে তাতে পেট ভরে যাবে। স্ট্রিট ফুড বলে নাক সিটকিও না। খাবারের মান বেশ ভালো এবং স্বাস্থ্যসম্মত। ব্যাংককের সর্বত্র ফুটপাতে দেখবে শত শত এই রকম খাবারের দোকান।
চাকাওয়ালা রিকশা ভ্যান। উপরে কাচঘেরা। তার ভিতরে খাবার দাবার। পাশে বড় স্টোভের মতো চুলা। চুলার উপরে বিশাল সাইজের তাওয়া। সারাক্ষণ চলছে ভাজাভুজি। পাতলা স্লাইস করা মাটন বেসনে ডুবিয়ে ভেজে দিলো। নরম বনরুটি দিয়ে গরম গরম খেতে বেশ লাগল। ভাজা চিংড়ি খেলাম অনেকগুলো। সাথে নুডলস। ভেজিটেবল আইটেমও আছে কিছু কিছু। অনেকটা আমাদের বেগুনি-পেঁয়াজুর মতো।
মনে মনে মহাখুশি আমি। কিন্তু ইসারাকে বুঝতে দেই না। সস্তা খাবার। তার ওপরে মানসম্মত। অনেকগুলো ডলার বাঁচাতে পারবো।

ইসারা এবার আমাকে নিয়ে যান ‘সেভেন ইলেভেন’ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। এতদিন জানতাম খাবারের দোকানে খাবার, কাপড়ের দোকানে কাপড়, মুদির দোকানে মুদি সামগ্রি পাওয়া যায়। এখানে এসে দেখি, এক দোকানেই সবকিছু। এজন্যই বুঝি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরস।
ঘুরে ঘুরে জিনিস পছন্দ করা। র্যা্ক থেকে ট্রলিতে তুলে নেওয়া। একবারে কাউন্টারে গিয়ে দাম পরিশোধ করা। এমনটা আগে দেখিনি কখনও। দর কষাকষি নেই। জিনিসপত্রের গায়েই দাম লেখা। ভাবতে থাকি, ঢাকা থেকে ব্যাংকক, মাত্র তো দুই ঘন্টার দূরত্ব। অথচ কত পার্থক্য!
ইসারা ব্রেড, বাটার, জেলি, দুধ, কফি, চিনি সবকিছু কিনে দিলেন আমাকে। কিন্তু দাম দিতে দেন না কিছুতেই। আপত্তি জানাতেই হেসে বলেন -তুমি আমাদের গেস্ট। প্রথমবারের সুযোগটা অন্তত আমাকে নিতে দাও।
: তা কেন? তুমি তো গেস্ট হিসাবে যা করার তা পুরোপুরিই করছো।
: বাদ দাও। তুমি এখন ক্লান্ত। চলো পৌঁছে দিয়ে আসি। পাশেই তোমার ডরমিটরি। এখান থেকে কেনাকাটা করে সহজেই রুমে চলে যেতে পারবে। আর একটা কথা। হোটেলে না রেখে তোমাকে ডরমিটরিতে রেখেছি তার কারণ, এটার ভাড়া অনেক কম, তবে মান ভালো। নিরিবিলি পরিবেশ। আর ভার্সিটির মধ্যে আমাদের কাছাকাছি তুমি থাকলে সবদিক থেকেই সুবিধা। মনের মধ্যে আবারও খুশির রেশ ছড়িয়ে পড়ে। হোটেল ভাড়াও বেশি একটা গুনতে হবে না।
এবার আমাকে নিয়ে গেলেন ফুটপাতের উল্টোপাশে। বড় বড় পেয়ারা কিনলেন। বাংলাদেশে যা কাজি পেয়ারা হিসেবে পরিচিত। কিনলেন আঙুর, কমলা আর রামবুতান। রামবুতান ফলের খোসা লোমে বোঝাই। ভিতরের মাংসটা লিচুর মতো মিষ্টি। বিচিটা খেজুরের মতো।
খচ্চর ফল নাকি এটা! মনে মনে ভাবি।

(ক্রমশ)

আরও পড়ুন