ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনি : অদূরে দক্ষিণে-৯

আপডেট: 03:20:49 23/11/2016



img

আবুল হাসান মুহম্মদ বাশার

(পূর্ব প্রকাশের পর)

বুলবুল ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ ওদের বিয়ের বেশ কয়েক বছর পর- ঝিকরগাছায়। উনি যে কী দারুণ মানুষ- সাক্ষাতের আগে কথাটা আমাকে কেউ বলেনি। জুঁইও না। খেলোয়াড় বুলবুল ভাইয়ের ব্যাপারে যে মুগ্ধতা আমার ছিলো, উনি চমৎকার মানুষ না হলেও সেই মুগ্ধতাবোধে হয়তো খুব একটা আঁচড় লাগতো না। সেদিন দারুণ মানুষ বুলবুল ভাই দারুণ খেলোয়াড় বুলবুল ভাইকে হারিয়ে দিয়েছিলেন। প্রথম সাক্ষাতেই ওনাকে মাটির খুব কাছাকাছি থাকা একজন মানুষ বলে মনে হয়েছিলো। ’ডাউন টু আর্থ’- কথাটা আমার নিজের সর্ম্পকে অনেককে বলতে শুনেছি। অন্য কাউকে একই চরিত্রের অধিকারী দেখলে তাকে ভালো না লেগে উপায় নেই। বলা বাহুল্য, বুলবুল ভাইয়ের ব্যাপারে আমার ভালো লাগার এই অনুভূতিটা দিন দিন জোরালো হচ্ছে।
মেলবোর্নে কোথায় থাকব- তা নিয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ ছিলো না। জুঁইকে অস্ট্রেলিয়ায় আমার সফরসূচি জানিয়েছিলাম। বুলবুল ভাই সেই অনুযায়ী উনার নিজের কাজকর্ম গুছিয়ে নিয়েছিলেন যেন আমাদের সাথে পুরোটা সময় কাটাতে পারেন। সিডনিতে হাসানের বাসায় থাকার অভিজ্ঞতার পর মেলবোর্নের ব্যাপারে আগা স্যার কোনো প্রশ্ন তুলবেন না- এটা অনুমান করেছিলাম। তবে মেলবোর্নে স্যারেরও পরিচিত পরিবার ছিল। আমি অবশ্য নিশ্চিত ছিলাম যে স্যার ’এক যাত্রায় পৃথক ফল’ এখানেও চাইবেন না। খুব ভোরে হাসানের গাড়িতে করে সিডনি বিমানবন্দরে যেতে যেতে বহুল প্রচলিত এই প্রবাদটা নিয়েই ভাবছিলাম। স্যারও গত এক সপ্তাহে কয়েকবার এটা আমাকে বলেছেন এবং সঙ্গত কারণেই।
স্যারের সফরসূচি আমার চাইতে একটু ভিন্ন ছিলো। স্যারের এক বাল্যবন্ধু ব্রুনাইয়ে কর্মরত। স্যার অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছেন শুনে ভদ্রলোক স্যারকে ব্রুনাই ঘুরে যাবার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে বসেন। আর বন্ধুর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে স্যারও তার সফরসূচিকে সেভাবে সাজান। সিডনি থেকে মেলবোর্ন না গিয়ে স্যার ফিরবেন কুয়ালালামপুর, সেখান থেকে ব্রুনাই । বন্ধুর দাওয়াত রক্ষা করে আবার কুয়ালালামপুর যেদিন ফিরবেন, সেদিনই মেলবোর্ন থেকে কুয়ালালামপুর পৌঁছোবো আমি। অতত্রব মেলবোর্নে স্যারের থাকার জায়গার আলোচনা এক পর্যায়ে ছিল অবান্তর। আমাদের যাত্রা শুরুর দু’দিন আগে স্যার আমাকে তাঁর রুমে ডেকে হাসতে হাসতে এই প্রবাদটা বললেন। আমি যখন এটা নিয়ে আকাশ পাতাল ভাবছি, তখন স্যার জানালেন ঘটনা-
’আমার ব্রুনাই যাওয়া হচ্ছে না’।
শুনে তো আমি আকাশ থেকে পড়লাম। কী ব্যাপার! না, ব্রুনাইয়ের ভিসাই নাকি নেয়া হয়নি। স্যার জানতেন বিমানবন্দর থেকে ভিসা নেয়া যাবে। এখন জানা গেল, তথ্য ঠিক নয়। দু’দিনে কাগজপত্র গুছিয়ে ভিসা পাওয়া যেহেতু সম্ভব নয়, তাই সফরসূচির পুনর্বিন্যাস। এখন তা পুরোপুরি আমার মতো। ভালো হলো না মন্দ হলো- সে বিচার অবশ্যই আমার নয়, স্যারের। বিশ বছর পর বাল্যবন্ধুর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ হাতছাড়া হলো, এটা মন্দ; আবার ভুল তথ্যের উপর ভর করে ব্রুনাইয়ের পথে রওনা দিয়ে ভোগান্তির শিকার হওয়া থেকে বাঁচা গেলো- সেটা স্বস্তির। কোনটার ওজন কতটুকু- আমার তা বুঝার কথা নয় যেহেতু ঘাড়টা এক্ষেত্রে আমার নয়। স্বস্তির ওজনটাই কিছু বেশি হওয়া সম্ভব- কুয়ালালামপুর বা ব্রুনাই বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে ভিসাহীন স্যারের বিপর্যস্ত চেহারাটা কল্পনা করে অন্তত তাই মনে হলো। এক যাত্রায় পৃথক ফল হচ্ছে না। আমরা এক সাথে মেলবোর্নগামী বিমানে চড়তে সিডনি বিমানবন্দরের ভেতরে ঢুকলাম। তার আগে হাসানের সঙ্গে বিদায়ী আলিঙ্গন- তুমুল ব্যস্ততার কারণে দীর্ঘ নয়, তবে এক বুক উষ্ণ।
আমাদের দেরি হয়ে গেছিলো। চেক-ইন কাউন্টারে গিয়ে দেখি লম্বা লাইন। ঘড়ির কাঁটা এদিকে বোর্ডিং টাইম ছুঁই ছুঁই করছে। এই লাইন অতিক্রম করে সময়মতো বোর্ডিং গেটে পৌঁছোনো অসম্ভব। ফ্লাইট মিস করে ফেলবো- এই ভয় দেখা দিলো। কী করা যায়! কোনো উপায় আছে কিনা জিজ্ঞেস করবো ভেবে একজন মহিলা কর্মীর দিকে এগুচ্ছি- হঠাৎ একপাশে নজরে পড়লো ’ডিপার্টিং ফ্লাইটস চেক-ইন’ কাউন্টার। ফাঁকা। লাগেজ ঠেলে সেখানে যেতেই সাথে সাথে চেক-ইন হয়ে গেল। বোর্ডিং পাস আর ক্যারি-অন লাগেজটা হাতে নিয়ে দৌঁড় দিলাম বোর্ডিং গেটের দিকে। সেও খানিকটা পথ। পৌঁছোবার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে বোর্ডিং কল করা হলো। চেক-ইন কাউন্টারের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে পরিণতি কী হতো? ’ফ্লাইট মিস’- আগা স্যার আমার সাথে সম্পূর্ণ একমত হলেন। আমাদের সিডনি থেকে মেলবোর্নগামী বিমান যখন আকাশে উড়লো, সূর্য তখনো ওঠেনি। জানালার বাইরে ভোরের আলো আঁধারী। নিচে প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশি। ঘোর কালো। মাঝে মাঝে অমাবশ্যার আকাশে তারার মতো সমুদ্রের বুকে ভাসমান নৌযানের আলো চোখে পড়ে। সাদা মেঘের পর্দাগুলো ফুটো করে আমাদের বিমান উপরে উঠে এলো। দেড়-ঘণ্টার ফ্লাইট। রাতে ঘুম কম হয়েছে। বিছানায় যেতে দেরি হয়েছিলো। কারণ সুনন্দন। মাগুরার ছেলে ডা. সুনন্দন আমার সাথে দেখা করতে হাসানের বাসায় এসেছিলো রাত ১১টার দিকে। গল্প করতে করতে আমরা সময়ের হিসেব হারিয়ে ফেলেছিলাম। সুনন্দনও ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র। আমাদের দু’ব্যাচ জুনিয়র। ওরা যখন পাশ করে বের হয়, আমি তখন মনবুশো বৃত্তি নিয়ে জাপানে। দেশে ও কতদিন ছিলো, কী করছিলো- কিছুই জানতাম না। এখন সিডনিতে আছে- অস্ট্রেলিয়া আসার কিছুদিন আগে খবরটা পেয়েছিলাম। ফোন নম্বরটা পেয়েছিলাম এলাকার এক বড় ভাইয়ের কাছ থেকে। এখানে আসার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই কথা হচ্ছে। দেখা হলো একেবারে শেষ বেলায়। দেখলাম একটু মুটিয়ে যাওয়া ছাড়া সুনন্দন মোটামুটি অপরিবর্তিত আছে। কথাবার্তায়ও আগের মতই নরম সরম ও বিনয়ী। ওর মুখেই শুনলাম ওর অস্ট্রেলিয়ায় আসা ও এখানে স্থায়ী হবার কাহিনি। এই মুহূর্তে সিডনি শহরতলীর এক হাসপাতালে রেজিস্ট্রার হিসেবে কাজ করছে ও। পরীক্ষা দিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পর্যায়ে উন্নীত হবার চেষ্টায় আছে। দেশে যায়নি অনেক দিন, তবে যোগাযোগ রাখে। ওদের গ্রামের বাড়ি আমাদের গ্রামের কাছাকাছি; সেখানে দাতব্য চিকিৎসালয় ধরনের কিছু একটা করার চেষ্টা করছে বলে জানালো। স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ এখানে ও ভালোই আছে- আমি তাই বুঝলাম। বিদায় নেবার আগে আমরা দু’জন সেলফির ফ্রেমে বন্দি হলাম। আমাকে ওর বাড়িতে নিয়ে আপ্যায়ন করতে না পারার আফসোস ও ’আবার দেখা হবে’- এই আশাবাদ ব্যক্ত করে ও যখন বিদায় নিলো- ঘড়ির কাঁটা তখন ১টা পেরিয়ে গেছে। ভোর ৬টার ফ্লাইট ধরতে হলে বাসা থেকে অবশ্যই ৪টায় বেরুনো চাই। ঘুমের জন্য সময় কোথায়! ফ্লাইটের দেড় ঘণ্টা তাই ঘুমের কাজে লাগানোই বুদ্ধিমানের কাজ ভেবে সিটে হেলান দিয়ে বসলাম।

মেলবোর্ন
লাগেজ সংগ্রহ করে বিমানবন্দরের অ্যারাইভাল লাউঞ্জের বাইরে এসে দাঁড়ালাম। বেশ ঠাণ্ডা এদিকে। কান ঢাকা টুপিটা মাথায় পরে চারদিকে দেখলাম। না জুঁইরা এখনো আসেনি। আসার কথা। মিনিট দশেক অপেক্ষার পর স্যারকে বলে আমি কয়েন ফোন থেকে জুঁইকে ফোন করতে গেলাম। রিসিভার কেবল উঠিয়েছি তখনই পেছন থেকে বুলবুল ভাইয়ের গলা শুনতে পেলাম-
’ফোন করছেন কোথায়! আমরা এসে গেছি’।
এয়ারর্পোটের ভেতরের ’দৌঁড়-খাবারের’ দোকান থেকে দীর্ঘ আলাপচারিতার সাথে দীর্ঘতর প্রাতরাশ সেরে আমরা বুলবুল ভাইয়ের বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। ওরা থাকে বারউইক এলাকায়। জায়গাটা শহর থেকে বেশ খানিকটা বাইরে। চমৎকার রাস্তা দিয়ে ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম। বারউইক মেলবোর্ন শহরতলির আবাসিক এলাকা। ঝকঝকে বাড়িঘর রাস্তাঘাট দেখে মনে হলো আবাসিক এলাকা হিসেবে এই জায়গাটা অপেক্ষাকৃত নতুন। পুরো এলাকাটাতে সবুজের আধিপত্য আর রাজত্ব শূন্যতার। মানুষজন নেই বললেই চলে। রাস্তাঘাটে গাড়ি চলছে বটে, কিন্তু সেটা সংখ্যায় আমার গ্রাম দেলুয়াবাড়ির কাঁচা-পাকা রাস্তায় বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকারের চাইতে সামান্যই বেশি। রাস্তার ঘোর কালো পিচের বুকে ধবধবে সাদা লাইনগুলো এলাকাটার নতুনত্বের পক্ষে ওকালতি করছিলো। আমরা এসে দাঁড়ালাম এ রকম একটা রাস্তার ওপর ১০০ নম্বর বাড়িটার সামনে। একতলা বাড়িটা রাস্তা থেকে সামান্য উঁচুতে। সামনে ছোট্ট সবুজ লন। দু’পাশে প্রায় একই ধরনের বাড়িঘর। সামনে রাস্তার উল্টো দিকে বিশাল সবুজ মাঠ। মনে হলো কেউ যেন জলরঙে একটা ছবি এঁকেছে। ছবিতে আবর্জনা থাকে না, এখানেও নেই। গাড়ি থেকেই রিমোট কন্ট্রোলে চাপ দিয়ে গ্যারেজের শাটার খুললেন বুলবুল ভাই। ততক্ষণে নাবিল ও মাহদী দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। ওদেরকে শেষবার দেখেছি বেশ কয়েক বছর আগে। এরই মধ্যে দু’জনই আরো খানিকটা বেড়ে উঠেছে। দু’ভাইয়ের মধ্যে নাবিল বড়। ক্লাস নাইনে পড়ছে। জুঁই জানালো ও খুব ভালো একটা স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে। কয়েক হাজার ছাত্রের মধ্যে শ’খানেক নেবে। চান্স পেলে সাংঘাতিক একটা ব্যাপার হবে। নাবিলকে দেখে আমি চান্স না পাবার কোনো কারণ দেখলাম না। মাহ্দী স্কুলে যাচ্ছে- এলিমেন্টারি ক্লাস ফাইভ।
’পড়াশুনো তো কিছু না। শুধু যাওয়া আসা, খেলাধুলা আর আমোদ-ফূর্তি। তাই না মাহদী! আমরা একদিন স্কুলে গিয়ে দেখি মাহদী ক্লাসের মধ্যে শুয়ে আছে। ’
বুলবুল ভাই মাহদীর সঙ্গে খুঁনসুটি করলেন। ঘরে ঢুকে চমৎকৃত হলাম। দারুণ সাজানো গোছানো বাড়িটা। ঠিক মাঝখানে কিচেন, একপাশে বসার ঘর, অন্য পাশ দিয়ে তিনটে শোবার ঘর- এক সারিতে, তার পাশে ছেলেদের পড়ার ঘর। যথেষ্ট জায়গা ঘরের ভেতরে। বাড়ির পেছন দিকটাতেও একটা লন, সবুজ ঘাস ঢাকা। বারবিকিউসহ ছোট খাটো বাগানও সম্ভব সেখানে।
’বাড়িটা ভাইয়া আমরা কিনেছি অনলাইনে’।
বাড়িটার ব্যাপারে আমার মুগ্ধতা লক্ষ্য করে জুঁই জানালো।
’হ্যাঁ শুধু একবার এসে কাগজপত্রে সই করে গেছিলাম। পছন্দ করেছি অনলাইনেই।’ -বুলবুল ভাই যোগ করলেন।
অনলাইন শপিং আজকাল খুব চলছে। বিদেশে তো অনেক আগে থেকেই। ইদানীং দেশেও এর খুব রমরমা। বিক্রয় ডটকম, এখানেই ডটকম, রংবাহার ডটকম- ডটকমের বাজার ভালোই জমেছে এদেশে। কিন্তু তাই বলে অনলাইনে বাড়ি কিনে ফেলা! উদ্বেলিত হবার মতো ব্যাপারই বটে- স্বীকার করতে বাধ্য হলাম। আরো বুঝলাম- এধরনের বেচাকেনায় তথ্যগত সততার ও জবাবদিহিতার ব্যপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ অর্থাৎ অনলাইনে যেসব তথ্য দেয়া হচ্ছে, বাস্তবে ঠিক তাই পাওয়া যাচ্ছে কি না। দেশটা অস্ট্রেলিয়া বলেই হয়তো এ ব্যাপারে দুশ্চিন্তা করতে হয়নি ওদের। বাংলাদেশ হলে! হ্যাঁ বাংলাদেশ হলে কী হতো পারতো- সে গল্প পরে শুনেছিলাম জুঁইয়ের মুখে। না অনলাইন নয়- পুরোপুরি অফলাইন এবং মুখোমুখি আলাপের কেনাবেচা। ওরা জমি কিনেছিলো আশুলিয়ায়, বেশ কয়েক বছর আগে। টাকা পয়সা দেয়া শেষ। রেজিস্ট্রেশনের সময় এসে দেখা গেলো জমিতে ভেজাল। রেজিস্ট্রেশন ঝুলে গেলো। টাকা ফেরতও সম্ভব নয়। লোকটা আবার পাঁচ ওয়াক্ত নামাজি ও লম্বা দাঁড়িওয়ালা। নামাজে ইমামতিও করে। সেই অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে জুঁই বললো-
’এবার লোকটাকে কী বললাম জানেন ভাইয়া! বললাম, আমার টাকার দরকার নেই, কিন্তু আপনার নামাজে ইমামতি করা উচিৎ না, আপনার পেছনে তো নামাজ হবে না।’
(ক্রমশ)