ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে শ্যামনগর বিএনপি

আপডেট: 03:25:40 06/01/2019



img

সামিউল মনির, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) : একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে-পরে কোনো পার্থক্য নেই শ্যামনগর উপজেলা বিএনপির রাজনীতিতে। দশম নির্বাচনের পর যেমন ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি, তেমনি একাদশ নির্বাচনের পরও বদলায়নি তিনবার রাষ্ট্র চালানো দলটি।
নির্বাচনের পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও চোখের দেখা তো দূরে থাক, আজ পর্যন্ত কোনো নেতা ফোন করেও কর্মী-সমর্থকদের খোঁজ-খবর নেননি বলে অভিযোগ তৃণমূল নেতাকর্মী সমর্থকদের।
মামলা-হামলা আর ধর-পাকড়ের ভয়ে সেই যে ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে উধাও, আজও প্রভাবশালী ও শীর্ষ সেসব নেতার প্রকাশ্যে দেখা মিলছে না। কদাচিৎ রাস্তাঘাট কিংবা গোপন স্থানে দেখা মিললেও একান্ত নিজস্ব ও পারিবারিক লোকজনের বাইরে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে ওইসব শীর্ষ নেতার ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। দূর-পরবাস কিংবা নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে মাঝে-মধ্যে ফোনালাপে কুশল বিনিময়ের মধ্যে এসব নেতার সাংগঠনিক খোঁজখবর নেওয়া যে কেবলই ‘দায়সারা’, সেই অভিযোগ তৃণমূল নেতাদের।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের একই অভিযোগ- ২০০১ সালে দল ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কর্মব্যস্ততায় দেখা করার সুযোগও মিলতো না। প্রয়োজনে তাদের এপিএসদের বা কাছের মানুষদের দিয়ে নিজেদের সদস্যাগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করা হতো। তখন তাদের পদভারে পার্টি অফিস মুখরিত থাকতো। কিন্তু দীর্ঘদিন সেই চিত্র অনুপস্থিত। অনেকের বিরুদ্ধে সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গে নানা কায়দায় সুসম্পর্ক গড়ে নিজেকে রক্ষা করার অভিযোগ রয়েছে। তাদের একজন ইতালি প্রবাসী নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে লক্ষাধিক টাকা দামের মোবাইল ফোন সেটও পাঠিয়েছেন সরকার দলীয় এক প্রভাশালী নেতার ছেলেকে।
নুর ইসলাম, আছানুর রহমান, মহসিন আলম, আবু হনিফসহ শত শত নেতাকর্মীর অভিযোগ, উপজেলা বিএনপি সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, যুগ্ম-সম্পাদকসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা একই ধরনের কাজে জড়িত। তাদের কেউ প্রকাশ্যে আবার কেউ গোপনে সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছেন।
উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আবুল কাশেম এবং অর্থ সম্পাদক আকবর আলীসহ কয়েকজন একাদশ নির্বাচনের আগেই সরকার দলীয় সংগঠনে যোগ দিয়েছেন।
উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-সম্পাদক সোলায়মান কবীর এক বছর আগে একটি অরাজনীতির ঘটনায় গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে এলাকা ছাড়া। দলীয় কোনো কর্মকাণ্ডে তিনি নেই। যোগাযোগ রাখেন না নেতাকর্মীদের সঙ্গে।
প্রায় অভিন্ন অবস্থা বিএনপির টিকিটে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া এসএম মহসিন-উল মুলকেরও। নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি একটি বারের জন্য বিএনপির কোনো সভা-সমাবেশ বা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না বলে বলছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিএনপির মনোননয়ন নিয়ে এবং জামায়াতের ‘ভোটব্যাংক’কে পুঁজি করে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নির্বাচনের পর দলীয় একটি সভা-সমাবেশও তিনি হাজির হননি বলে অভিযোগ।
তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নৈশ প্রহরী কাম দপ্তরি নিয়োগে মোটা টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। মাঝে এক মাসের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে বহিস্কৃত হলেও ‘ভালো’ যোগাযোগের কারণে তাকে বেশিদিন দায়িত্বের বাইরে থাকতে হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির যুগ্ম-সম্পাদক সোলায়মান কবীরের সঙ্গে মিলে তিনি ‘ঈশ্বরীপুর ফাউন্ডেশন’ নামে একটি এনজিও পরিচালনা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
উপজেলা সহ-সভাপতি ও সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী বাবু, নুরনগরের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম আলমগীর ও পদ্মপুকুরের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আমজাদুল ইসলামের বিরুদ্ধেও নেতাকর্মীদের এড়িয়ে চলার অভিযোগ রয়েছে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার এক মাস আগে যখন গাযেবি মামলা শুরু হয় তারও আগে থেকে এক সময়ের শ্যামনগরের প্রভাবশালী বিএনপি নেতা লিয়াকত আলী এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিলেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। আজ পর্যন্ত তিনি এলাকার ফেরেননি। অথচ তিনি সর্বশেষ বারের জন্য সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন।
একাদশ নির্বাচনের আগে কারাগারে যাওয়া যুবদল বুড়িগোয়ালিনীর রুস্তম, কৈখালীর শাহাজান পাড়, ডা. অব্দুর রশিদ, ধুমঘাটের যুবদল নেতা আব্দুর রহমানসহ অনেকের অভিযোগ, তারা যাদের নেতৃত্বে বিএনপিতে এসেছেন, তারাই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কারাবন্দি অবস্থায়ও তারা একটিবারের জন্য খোঁজ নেননি।
শ্যামনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ মাস্টার আব্দুল ওয়াহেদ ২০১৮ সালের আগস্টে হওয়া কুরবানির ঈদের পর পালিয়ে যান। একাদশ নির্বাচন অতিবাহিত হওয়ার পাঁচ দিন পরেও তিনি এলাকায় ফেরেননি। আর দেশব্যাপী ধরপাকড় শুরু হলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে আমেরিকা ও ভারত গিয়ে কৌশলে নিজেদের রক্ষা করেন। নেতাকর্মীরা জানান, উপজেলা সভাপতি মাঝেমধ্যে পারিবারিক কাজে গোপনে এলাকায় ফিরলেও গোপনেই তিনি এলাকা ছাড়েন। ভুরুলিয়া এলাকার জনৈক হাবিবুর রহমান এবং নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপর একজন রাজনৈতিক কর্মী দাবি করেন, তিনি (আব্দুল ওয়াহেদ) বিকল্পধারার হয়ে মহাজোটের বিদ্রোহী প্রার্থী গোলাম রেজার পক্ষে কুলা প্রতীকে ভোট প্রদানের জন্য ওই প্রার্থীর একান্ত সচিব হাসান মিয়াকে মোবাইলে নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন।
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাদেকুর রহমান সাদেম ‘অসুস্থতার কারণে’ অসংখ্যবার ভারতে গিয়ে সেখানে অবস্থান করেছেন। যদিও অভিযোগ রয়েছে, যখনই এলাকায় ধরপাকড় শুরু হয় তখনই তিনি চিকিৎসার নামে ভারতে যান; যা অব্যাহত ছিল একাদশ নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত।
একাধিক নেতার অভিযোগ, দীর্ঘ ১৩ বছরেরও বেশি সময় ঈশ্বরীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকারী সাদেকুর রহমান তার কর্মী সর্মথকদের একাদশ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের পক্ষে প্রচারণার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বিএনপির উপজেলা কমিটির এই সাধারণ সম্পাদক নিজে কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে নৌকায় ভোট দিতে ভোটারদের উৎসাহিত করেছিলেন বলে অভিযোগ। তবে তার ছোট ভাই ডালিম ২ জানুয়ারি বিকেলে ফোনে এক সংবাদকর্মীকে বলেন, ‘আমার মেজ ভাই ও বড় ভাই কেন্দ্রে আসেনি। তবে আমরা সরাসরি নৌকার পক্ষে কাজ করেছি।’
উল্লিখিত দুই নেতা ছাড়াও তাদের প্রিয়ভাজন সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আলমগীরসহ শীর্ষ অধিকাংশ নেতাই বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে দলবিরোধী নানা তৎপরতায় জড়িত। তাদের তৎপরতায় শ্যামনগর উপজেলা বিএনপি ধ্বংসের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে বলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ। পুরস্কার হিসেবে এই তিন নেতাকে গত দশম নির্বাচনের পর থেকে একটি বারের জন্য কারাভোগ করতে হননি।
পক্ষান্তরে শুধু রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামসহ দলীয় কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-সম্পাদক আশেক-ই এলাহী মুন্না, রজমাননগর বিএনপির সভাপতি শহীদুজ্জামান শহীদ, ভুরুলিয়ার আব্দুল মতিন, নুরনগরের মোবারক, মন্টু, যুবদল নেতা আজিজুর রহমান আজিবরসহ ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ের শত শত নেতাকর্মী একাধিকবার কারাবরণ করেছেন। কৈখালীর শাহাজান সিরাজ, হবি মোল্যা, আবুল খায়েরসহ হাজার হাজার নেতাকর্মী মামলা আর হুলিয়া মাথায় নিয়ে পলাতক জীবনযাপন করছেন।
এই সব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য উপজেলা বিএনপি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে একাধিকবার রিং করা হলেও তারা রিসিভ করেননি।

আরও পড়ুন