নজরুলের ছোটগল্প : কতিপয় বিবেচনা-৪

আপডেট: 09:30:08 03/06/2017



img

গাজী মো. মাহবুব মুর্শিদ

(পূর্ব প্রকাশের পর)

‘রিক্তের বেদন’ গল্পগ্রন্থের শ্রেষ্ঠ গল্প ‘রাক্ষুসী’। সত্যিকার অর্থে নজরুল-ছোটগল্পের শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম দাবিদার এই গল্পটি। বীরভূমের বাগদী সম্প্রদায়ের আঞ্চলিক ভাষার স্পর্শ রয়েছে গল্পটিতে। ‘স্বামীহারা’ গল্পে নারীর মনোবেদনার যে শিল্পভাষ্য অঙ্কিত হয়েছিল ‘রাক্ষুসী’-তে এসে তা আরও গাঢ় হয়ে সম্ভবত বাংলা সাহিত্যের অন্যতম নারীবাদী ছোটগল্পে রূপান্তরিত হয়।

বাগদী গৃহবধূ বিন্দি স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে-দুঃখে মোটামুটি ভালোভাবেই দিনাতিপাত করছিল। ‘স্বামী আর সন্তানদের সুখেই স্ত্রীর সুখ’ এই চিরন্তন আপ্তবাক্যেই বিন্দির ছিল আস্থা- ‘সোয়ামি আর ছেলেগুলোকে দিতুম ভাত, আর নিজে খেতুম মাড়-শুদ্ধু ভাতের ফেন। মেয়েমানষের আবার সুখ কি, ছেলেমেয়ে যদি ঠান্ডা রইল তাতেই আমাদের জান ঠান্ডা।’ (ন. র. ২ : ২৭৫)
প্রসঙ্গত, ‘স্বামীহারা’ গল্পের মতোই ‘রাক্ষুসী’তেও আত্মকথনরীতিতে কাহিনী বিবৃত এবং উভয়ক্ষেত্রেই শ্রোতা তাদের পরিচিত নারী। যাহোক, বিন্দির সুখের সংসারে ঝড় উঠল যখন তার ‘সোজা ভোলনাথ সোয়ামিকে’ পেয়ে বসল রথো বাগদির দু-তিনটে ‘স্যাঙ্গা-করা’ মেয়েটা। বিন্দির স্বামী পাঁচুর বাপ যে শুধু মেয়েটির প্রেমেই পড়ল তা নয়, বিন্দির তিল-তিল করে বহু কষ্টের জমানো টাকা- যা কিনা বিন্দি জমাচ্ছিল সন্তান-সংসারের ভবিষ্যতের সুখের আকাঙ্ক্ষায়- তা সব লুঠ করে নিল মেয়েটিকে ‘সাঙ্গা’ করবে বলে। এরপর আর কোন্ পথ খোলা থাকে বিন্দির নরকের দুয়ার থেকে স্বামীকে ফেরাবার। অতএব, ‘সোয়ামির পাপ’ তার ‘ইস্ত্রি’কেই নিতে হয়- অনিবার্যভাবে ঘটে একটি হত্যাকাণ্ড। দায়ের কোপে স্বামীর ধড়-মুন্ডু যখন আলাদা হয়ে যায় সেই দৃশ্যের স্মৃতিচারণায় বিন্দির নেই কোন ক্রোধ কিংবা অনুশোচনা, যেন আছে একধরনের অনুকম্পা, হারানো প্রেমের হাহাকার- ‘মাথাটা যখন কাটা গেল, তখন ঐ আলাদা ধড়টা, ক্যাৎলা মাছকে ডেঙায় তুললে যেমন করে, ঠিক তেমনি করে কাৎরে কাৎরে উঠছিল। এত রক্তও থাকে গো একটা এতটুকু মানুষের দেহে।’ (ন. র. ২ : ২৭৯) একজন সমালোচকের মতে, ‘এই হত্যাদৃশ্যের বর্ণনায় গল্পটির শিল্পরূপ উচ্চচূড়া ছুঁয়েছে।’ (কৃষ্ণরূপ ২০১৪ : ২৪০)

এরপর যথারীতি বিচারে বিন্দির জেল হয়, একসময়ে মুক্তিও পায়। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ-দৃষ্টির কাছে থেকে কি অতো সহজে তার মুক্তি মিলবে! আইনের বিচারে বিন্দি মুক্ত হলেও সমাজমানসে সে হয়ে উঠল পাগলি, রাক্ষুসী। কিন্তু বিন্দি জানে, একই অপরাধে নারী-পুরুষের বিচারের ক্ষেত্রে এই সমাজের মানদ- হয়ে যায় পৃথক। আর এজন্যই নারীবাদের ‘ন’ না জেনেও নিম্নবর্গের বিন্দি বাগদীর পক্ষেই সম্ভবপর হয় পুরুষতন্ত্রকে লক্ষ্য করে এমন উচ্চারণ :
আর পুরুষেরা ও-রকম চেঁচাবেই- কারণ তারা দেখে আসছে যে, সেই মান্ধাতার আমল থেকে শুধু মেয়েরাই কাটা পড়েছে তাদের দোষের জন্যে। মেয়েরা পেথম পেথম এই পুরুষদের মতোই চেঁচিয়ে উঠেছিল কিনা এই অবিচারে, তা আমি জানি না। তবে ক্রমে তাদের ধাতে যে এ খুবই সয়ে গিয়েছে এ নিশ্চয়। আমি যদি ঐ রকম একটা কান্ড বাঁধিয়ে বসতুম আর যদি আমার সোয়ামি ঐ জন্য আমাকে কেটে ফেলত, তাহলে পুরুষেরা একটি কথাও বলত না। তাদের সঙ্গে মেয়েরাও বলত, ‘হাঁ, ওরকম খারাপ মেয়েমানুষের ঐ রকমেই মরা উচিত।’ কারণ তারাও বরাবর দেখে আসছে, পুরুষদের সাত খুন মাফ। (ন. র. ২ : ২৭৯-২৮০)


কাজী নজরুল ইসলামের তৃতীয় ও শেষ গল্পগ্রন্থ ‘শিউলিমালা’। এর প্রকাশকাল প্রথম দুটি গল্পগ্রন্থ হতে বেশ দূরবর্তী- ১৯৩১, গল্পের সংখ্যাও তুলনামূলক কম- মাত্র চারটি। ‘শিউলিমালা’ ছাড়া এ গ্রন্থের বাকি তিনটি গল্পের পটভূমি গ্রামীণ জীবন। ‘জিনের বাদশা’ ও ‘অগ্নি-গিরি’ পূর্ববাংলার গ্রামীণ জনপদের সমাজচিত্র যেমন ধারণ করেছে, একইভাবে এই অঞ্চলের ভাষা, সংলাপ, প্রবাদ-প্রবচন, লোকছড়া-গল্প দুটিতে অভিদ্যোতিত হয়েছে। নজরুলের ছোটগল্পের সমকালীন প্রতিক্রিয়ায় আমরা শিউলিমালার ইতিবাচক সমালোচনাই লক্ষ করি। মাসিক মোহাম্মদীর কার্তিক, ১৩৪১ সংখ্যায় মুজীবর রহমান খাঁ-র মন্তব্য :
সাধারণ মানব-জীবনের লীলায় সে একটা বলিষ্ঠ প্রাণবন্ত আদিম জীবনের সুর আছে... তার ‘শিউলি-মালা’ গল্পগুলির মধ্যে সেটি পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। তার চিত্রিত মানুষগুলি গ্রামের তরুলতা ফুলফলের মত সজীব, মধুর ও স্বাভাবিক। আল্লারাখা, সবুর, নূরজাহান, জোহরা প্রভৃতি চরিত্রগুলি পল্লীর আবেষ্টনের সঙ্গে অচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। পশ্চাদ্ভূমির সাথে তাদের জীবনকে বিচ্ছিন্ন করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। বাংলার পল্লীবাসীর জীবন অনেকেই অঙ্কিত করেছেন, কিন্তু এমন নিবিড় পরিচয়, এতখানি ঘনিষ্ঠতার উত্তাপ আর কারো চিত্তে পেয়েছি বলে মনে হয় না। গল্পলেখক নজরুলের এখানেই বড় স্বকীয়তা। (মুস্তাফা ১৯৮৩ : ১৬৪)

শিউলিমালার গল্পগুলো কাছাকাছি সময়ের রচনা। ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের সওগাত পত্রিকায় পরপর তিনটি সংখ্যায় ‘জিনের বাদশা’, ‘অগ্নি-গিরি’ ও ‘শিউলিমালা’ প্রকাশিত হয়। ‘পদ্মগোখরো’ অবশ্য সাপ্তাহিক দুন্দুভিতে বের হয়েছিল। নজরুল-রচনাবলীর প্রথম সংস্করণের সম্পাদক নজরুল-বিশ্লেষক আবদুল কাদির ‘অগ্নি-গিরি’ ও ‘শিউলিমালা’ সম্পর্কে যে অভিমত জানিয়েছেন, তা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে :
নজরুলের ‘অগ্নি-গিরি’ নামক সুবিখ্যাত গল্পে বীররামপুর গ্রামের উল্লেখ আছে; বোধ হয় ‘দরিরামপুর’ নামটিই গল্পে বীররামপুর হয়েছে। ... নজরুল কৈশোরে মৈমনসিংহের দরিরামপুর গ্রামে কিছুদিন পড়াশোনা করেছিলেন; তাঁর তৎকালীন জীবনের যৎকিঞ্চিত ছায়া এ গল্পে আছে- এ তথ্য তাঁরই মুখে একদা শুনেছিলাম...।
১৯২৮ সালের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে নজরুল ঢাকা মুসলিম সাহিত্য-সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধন করেন; ...সে-সময় অধ্যক্ষ শ্রীসুরেন্দ্রনাথ মৈত্র ও অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ঘটে; সেই সৌহার্দ্যের স্মৃতি তাঁর সুবিখ্যাত ‘শিউলিমালা’ গল্পে কিছু ছায়া ফেলেছে। (ন. র. ৪ : ৪২২)

রোমান্টিক প্রেমের গল্প শিউলিমালা। প্রেম, প্রেমের আকুলতা, বিরহ, বিরহ-ব্যথা, রোমান্টিক ভাবোচ্ছ্বাসে গল্পটি ভরপুর। মুসলিম যুবকের সঙ্গে হিন্দু তরুণীর অপ্রস্ফূটিত, অচরিতার্থ প্রেম ‘শিউলিমালা’র উপজীব্য। রোমান্টিক প্রেমের গল্প হলেও নজরুলের প্রথম পর্যায়ের রোমান্টিক গল্পসমূহের সঙ্গে এর বিস্তর ব্যবধান। কাহিনি উপস্থাপনা, চরিত্র বিনির্মাণ, নাটকীয়তা ও গঠনকৌশলে এখানে গল্পকার নজরুল অনেক পরিণত।

মহানগরী কলকাতা এবং শৈল-শহর শিলং-কে কেন্দ্র করে নজরুল ইসলামের এই নগরকেন্দ্রিক গল্পটি বিস্তারিত। কলকাতার নামকরা তরুণ মুসলিম ব্যারিস্টার আজহারের বৈঠকখানায় নিত্য যে আড্ডাটি বসে তার সঙ্গে কেউ কেউ প্রমথ চৌধুরীর ‘চারইয়ারী কথা’, কিংবা শরদিন্দুর বরদাসিরিজের অথবা পরশুরামের বংশলোচনা বাবুর বৈঠকি গল্পগুলোর মিল খুঁজে পেয়েছেন। (দ্র. সিরাজ ১৯৯০ : ৯২, কৃষ্ণরূপ ২০১৪ : ২৪৩)
এই আড্ডার আসরেই আজহার তার স্মৃতির ঝাঁপি উন্মোচিত করে শিউলকথা বিবৃত করে। দাবা খেলতে যেয়ে আজহারের সঙ্গে প্রফেসর চৌধুরী ও তাঁর কন্যা শিউলির পরিচয়। আজহার আর শিউলির সামাজিক-অর্থনৈতিক-শিক্ষাগত যোগ্যতা, কোন কিছুরই বৈষম্য ছিল না, ছিল কেবল ধর্মের পার্থক্য। গল্পে স্পষ্ট করে উচ্চারিত না হলেও বিরহের মূল কার্যকারণ পাঠকচিত্তে অবিদিত থাকে না। নায়কের হৃদয়-ছোঁয়া অন্তর্গত ক্রন্দনের চিত্র ‘শিউলিমালা’ থেকে :
আর তার সাথে দেখা হয়নি- হবেও না। একটু হাত বাড়ালেই হয়তো তাকে ছুঁতে পারি, এত কাছে থাকে সে। তবু ছুঁতে সাহস হয় না। শিউলি ফুল- বড় মৃদু, বড় ভিরু, গলায় পরলে দু দণ্ডে আঁউরে যায়। তাই শিউলি-ফুলের আশ্বিন যখন আসে- তখন নীরবে মালা গাঁথি আর জলে ভাসিয়ে দিই। (ন. র. ৪ : ৪১০)

‘জিনের বাদশা’ও প্রেমের গল্প যদিও শেষাবধি তা ট্রাজেটিতে পর্যবসিত। বস্তুত, নজরুল সাহিত্যে; আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি- প্রেমের ক্ষেত্রে বিরহ আর ব্যর্থতাই যেন অমোঘ নিয়তি। তবে ‘জিনের বাদশা’কে কেবল রোমান্টিক গল্পরূপে বিবেচনা করা যথেষ্ট নয়, আরো অন্তত দুটি বৈশিষ্ট্য গল্পটিকে প্রাতিস্বিক করে তুলেছে। একটি হচ্ছে নজরুল এই প্রথম একটি সফল হাস্যরসাত্মক গল্প বিনির্মাণ করলেন, অন্যদিকে পূর্ববঙ্গের মুসলমান অধ্যুষিত গ্রামীণ জীবনযাত্রা এই গল্পে কৃতিত্বের সাথে শিল্পভাষ্যে রূপায়িত । এর পাশাপাশি ‘জিনের বাদশা’র সংলাপে আঞ্চলিক ভাষার সুপ্রয়োগ বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

‘ফরিদপুর জেলায় আড়িয়াল খাঁ নদীর ধারে ছোট্ট গ্রাম। নাম মোহনপুর। অধিকাংশ অধিবাসীই চাষী মুসলমান। গ্রামের একটেরে ঘরকতক কায়স্থ যেন ছোঁয়াচের ভয়েই ওরা একটেরে গিয়ে ঘর তুলেছে।’ (ন. র. ৪ : ৩৭২)
-এভাবেই ‘জিনের বাদশা’ গল্পটির সূত্রপাত। অসাম্প্রদায়িক নজরুল এখানে কোন সম্প্রদায়ের প্রতি কটাক্ষ করেননি, বরং সমাজের বাস্তব রূপটিকেই তুলে ধরেছেন। এই গ্রামের মাতব্বর গোছের চুন্নু ব্যাপারির ছেলে আল্লা­রাখা ও মধ্যবিত্ত চাষী নারদ আলীর মেয়ে চান ভানু এই গল্পটির নায়ক নায়িকা। আল্লা­রাখার নামকরণ প্রসঙ্গে গল্পকারের বক্তব্য পাঠকচিত্তে যথেষ্ট হাস্যরসের সৃষ্টি করে :
চুন্নু ব্যাপারির তৃতীয় পক্ষের দুই দুইবার মেয়ে হবার পর তৃতীয় দফায় যখন পুত্র এল, তখন সাবধানী মা তার নাম রাখলে আল্লা­রাখা। আল্লাকে রাখতে দেওয়া হল যে ছেলে, অন্তত তার অকালমৃত্যু সম্বন্ধে- আর কেউ না হোক মা তার নিশ্চিন্ত হয়ে রইল! আল্লাহ হয়তো সেদিন প্রাণ ভরে হেসেছিলেন! অমন বহু ‘আল্লা­রাখা’কে আল্লা ‘গোরস্থানে রাখা’ করেছেন, কিন্তু এর বেলায় যেন রসিকতা করেই একে সত্যি সত্যিই জ্যান্ত রাখলেন। মনে মনে বললেন, ‘দাঁড়া, ওকে বাঁচিয়ে রাখব, কিন্তু তোদের জ্বালিয়ে মেরে ছাড়ব। (ন. র. ৪ : ৩৭২)

লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া