নির্মাণ শেষের আগেই ধসে পড়ছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর

আপডেট: 08:41:47 04/08/2018



img

স্টাফ রিপোর্টার : যশোরের চৌগাছায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই ধসে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে দেওয়া আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ‘যার জমি আছে ঘর নাই, তার নিজ জমিতে গৃহ নির্মাণ’ কর্মসূচির আওতায় ঘরগুলো তৈরি করা হচ্ছি।
উপজেলার স্বরুপদাহ ইউনিয়নের দেবালয় গ্রামের শুকুর আলীর ঘর নির্মাণ এখনো শেষ হয়নি। কিন্তু গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ভবন ধসে পড়েছে।
এদিকে ঘর বরাদ্দ দেওয়া বাবদ ভুক্তভোগী শুকুর আলী, তার সহোদর ইউনুস আলী ও গ্রামের সামাদের কাছ থেকে ১০-১২ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে ওয়ার্ড মেম্বার আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে। কোনো টাকা নেওয়ার কথা না থাকলেও তিন ট্রলি করে স্থানীয় বালি কিনতে হয়েছে শুকুর আলীকে। এছাড়া ঘরের মেঝে ভরাট করার জন্য এবং ঘরের ভিতের ড্যাটো রঙ করার জন্যও টাকা দিতে হয়েছে বলে দাবি করে শুকুর আলীর স্ত্রী বলেন, ‘আগে তো ভাঙা ঘর ছিল; এক প্রকার ছিলাম। এই ঘর তো এখন ভেঙে আমাদের গায়ের ওপর পড়বে। এ তো আমাদের জন্য মরণ ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। দিনে একশ টাকা মজুরিতে কামলা খাটি। আমাদের কাছ থেকে এভাবে টাকা নিয়েই যদি ঘর দেওয়া হয়, তাহলে দেওয়ার দরকার কী ছিল?’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছে দশ হাজার টাকা করে না দিলে ঘর হবে না। এই টাকা উপজেলায় দিতে হবে। পরে ঋণ করে দশ হাজার টাকা করে দেওয়ার পর আমাদের ঘর দিয়েছে।’
গত বৃহস্পতিবার ধসে পড়া ওই ঘরের ছবি তুলতে গেলে উপজেলা পরিষদের কর্মচারী ভেবে সাংবাদিকদের দিকে তেড়ে আসেন এক বৃদ্ধ। পরে সাংবাদিক পরিচয় দিলে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমাদের এত কষ্টের টাকা নিয়েই যদি ঘর দেওয়া হয়, তাহলে দেওয়ার দরকার কী ছিল?’
তবে এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নানের ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর থেকে ঘুষ নেওয়ার ঘটনার সংবাদ সম্প্রতি একটি আঞ্চলিক দৈনিকে প্রকাশিত হয়। এর পর গত ২৪ জুলাই উপজেলা পরিষদের মাসিক উন্নয়ন সমন্বয় সভায় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এসএম হাবিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর থেকে প্রতিটিতে ১০-১৫ হাজার টাকা করে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তোলেন চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইবাদত হোসেনের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে সে সভায় উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইবাদত হোসেন। এক পর্যায়ে তিনি সভাকক্ষ ছেড়ে বেরিয়েও যান। সেদিন উপজেলা চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের বলেন, ‘তিনি (ইউএনও) যে ঘরপ্রতি ১০-১৫ হাজার টাকা করে নিয়েছেন তার প্রমাণ আমার কাছে আছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় ‘যার জমি আছে ঘর নাই, তার নিজ জমিতে গৃহ নির্মাণ’ কর্মসূচিতে যশোরের চৌগাছা উপজেলায় মোট ৫৫০টি ঘর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ৪০৭ ব্যক্তির তালিকা প্রকল্প পরিচালক বরাবর পাঠান চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। সেখান থেকে ২৭ মে ২০১৮ প্রকল্প পরিচালক (যুগ্ম সচিব) আবুল কালাম শামসুদ্দিন স্বাক্ষরিত পত্রে ২৫০ ব্যক্তির তালিকা অনুমোদন করা হয় এবং আড়াই কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে দ্বিতীয় পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরো ৩০০ ব্যক্তির নামের তালিকা প্রকল্প পরিচালক বরাবর পাঠান। গত ৪ জুন প্রকল্প পরিচালক (যুগ্ম সচিব) আবুল কালাম শামসুদ্দিন স্বাক্ষরিত পত্রে ৩০০ ব্যক্তির তালিকা অনুমোদন করা হয় এবং তিন কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ উঠেছে, যারা কেবলমাত্র ইউএনও-কে বিভিন্ন মাধ্যমে টাকা দিয়েছেন তাদের নামের তালিকাই কেবল অনুমোদন করিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইবাদত হোসেন। উপজেলা চেয়ারম্যান এসএম হাবিবুর রহমানসহ জনপ্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইবাদত হোসেন এই প্রকল্প থেকে এক কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন।
জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক জনপ্রতিনিধি জানান, যারা টাকা দিয়েছে, তাদের নামেই বাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বঞ্চিত অনেকে অভিযোগ দিচ্ছেন। কিন্তু জনপ্রতিনিধিরা তাদের জন্য কিছুই করতে পারছেন না।
তিনি বলেন, ‘কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিজেই তার কিছু লোক দিয়ে কাজ করাচ্ছেন। এতে সরকারের বদনাম হচ্ছে।’
যদিও ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইবাদত হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে উপকারভোগীর তালিকা তৈরি করা হয়েছে। কাজ বাস্তবায়ন করছে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটি। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা প্রকৌশলী, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান। আগামী এক মাসের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে আশাবাদী তিনি।
সাংবাদিকেদের কাছে তিনি জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগের বিষয়টিও অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি তো কারো কাছ থেকে টাকা নিইনি। কারো কাছে চাইওনি। যদি কেউ আমার নামে টাকা তোলে, তারা বাটপার। কেউ টাকা চাইলে আমাকে জানাবেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘চেয়ারম্যানদের মাধ্যমেই মূলত উপকারভোগীর তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের পাঠানো প্রস্তাবিত তালিকা উপজেলায় পাঠানো হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। এরপর চৌগাছা উপজেলার ৫৫১টি বাড়ি নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কাজও শুরু হয়েছে। যারা বাড়ি পাননি, তারা পর্যায়ক্রমে পাবেন।’
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যেমন সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের আড়াইশ ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ৫৭টি বাড়ি।

আরও পড়ুন