নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই ঘর ধসে পড়া দেখলেন ইউএনও

আপডেট: 06:35:25 06/08/2018



img
img

চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি : চৌগাছায় প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে দেওয়া আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ‘যার জমি আছে ঘর নাই, তার নিজ জমিতে গৃহ নির্মাণ’ প্রকল্পের ঘর নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হওয়ার আগেই ধসে পড়ার সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর দৌড়-ঝাপ শুরু করেছেন ইউপি মেম্বার আব্দুল মান্নান। রোববার দিনভর তিনি স্থানীয় নেতা এবং সাংবাদিকদের কাছে ধরনা দিয়েছেন এ বিষয়ে যেন আর কোনো সংবাদ প্রকাশ না হয়।
পাশাপাশি ভুক্তভোগীরা মেম্বারের টাকা নেওয়ার কথা প্রকাশ করে দেওয়ায় ওয়ার্ড মেম্বার আব্দুল মান্নান তাদের নানাভাবে হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, রোববার উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রকল্প এলাকায় গিয়ে নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই ঘর ধসে পড়ার সত্যতা দেখতে পেয়েছেন।
গত শনিবার অনলাইন নিউজপোর্টাল সুবর্ণভ’মিতে এবং রোববার স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় উপজেলার স্বরুপদাহ ইউনিয়নের দেবালয় গ্রামের শুকুর আলীর ‘ঘর নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই ধসে পড়েছে’ মর্মে খবর প্রকাশিত হয়। একই রিপোর্টে ঘর পাওয়ার জন্য ভুক্তভোগী শুকুর আলী, তার সহোদর ইউনুস আলী ও গ্রামের সামাদের কাছ থেকে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়।
অভিযুক্ত ইউপি মেম্বার আব্দুল মান্নান এই বিষয়ে বলেছেন, ‘আমি এই প্রকল্পের সাথে যুক্ত নই। উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং ইউপি চেয়ারম্যান শেখ আনোয়ার হোসেন এই প্রকল্পের সাথে সরাসরি যুক্ত।’
সোমবার স্বরুপদাহ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে কথা হয় ঘর পাওয়া অনেকের সঙ্গে। তারা প্রত্যেকেই অভিযোগ করেছেন, ইউপি চেয়ারম্যান শেখ আনোয়ার হোসেনের কাছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পৌঁছানোর আগে কেউই প্রধানমন্ত্রীর উপহারের এই ঘর পাননি। আর খড়িঞ্চা ওয়ার্ডে চেয়ারম্যান শেখ আনোয়ারের হয়ে টাকা আদায় করেছেন ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নান।
তাদের অভিযোগ, টাকা নেওয়ার কথা না থাকলেও ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নান সুবিধাভোগীদের দিয়ে তিন ট্রলি করে স্থানীয় বালি কিনিয়েছেন ঘরের মেঝে ভরাট করার জন্য। ঘরের ভিতের ড্যাটো রঙ করার জন্যও টাকা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। ইউনিয়নের অন্যান্য ওয়ার্ডেও কোথাও ইউপি সদস্য, কোথাও ‘নিজের লোকদের’ মাধ্যমে এই টাকা নিয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান শেখ আনোয়ার হোসেন। গত ইউনিয়ন নির্বাচনে নৌকার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া এই ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পরই নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন বলে জানান স্থানীয়রা।
এদিকে, আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ঘর নির্মাণে অনিয়মের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পরই এবিষয়ে নানা তথ্য গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে আসতে শুরু করেছে। হাকিমপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি সদস্য আক্তারুজ্জামান মিলন দাবি করেছেন, তার ওয়ার্ডে টাকা দিতে না পারায় অতি দরিদ্র হওয়া সত্তে¡ও তার দেওয়া তালিকার কাউকে ঘর দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে যারা টাকা দিয়েছেন তাদের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
চৌগাছা সদর ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলামের অভিযোগ, তার ইউনিয়নে টাকা ছাড়া মাত্র চারজন ব্যক্তিকে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। টাকা দিতে হবে বলে ধুলিয়ানি ইউপি চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান কোনো তালিকাই প্রদান করেননি। পরে বিভিন্ন দালালের মাধ্যমে যারা টাকা দিয়েছেন তাদের জন্য ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উপজেলার অধিকাংশ জনপ্রতিনিধিই এভাবে ঘুষ নিয়ে ঘর বরাদ্দ দেওয়ার প্রতিবাদ করেছেন।
সুখপুকুরিয়া ইউপি চেয়ারম্যান তোতা মিয়া একটি ঘর দেখতে তার ইউনিয়নের একটি গ্রামে গিয়ে গেঁথে রাখা একটি ঘরের ভিতের উপর উঠতে গেলেই তা ভেঙে যায়।
একটি সূত্র জানিয়েছে, পাতিবিলা ইউনিয়নের মুক্তদাহ গ্রামের ‘উজ্জ্বল স্যানিটারি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ঘরের জন্য কংক্রিটের খুঁটি নির্মাণের অর্ডার দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। চুক্তি ছিল প্রতিটি খুঁটির মধ্যে চারটি করে রড দিতে হবে। কিন্তু ঘর নির্মাণের সময় ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে ওই খুঁটি ভেঙে দেখা যায়, একটি করে রড দেওয়া হয়েছে। পরে ওই স্যানিটারি ব্যবসায়ী উজ্জ্বলের কাছ থেকে ২০টি ঘরের খুঁটি নিয়ে বাকি অর্ডার বাতিল করা হয়। এ ঘটনায় ওই ব্যবসায়ীকে পুলিশ আটকও করে বলে সূত্রটি দাবি করেছে।
২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে দেশের অতি দরিদ্র নাগরিকদের জন্য ‘যার জমি আছে ঘর নাই, তার নিজ জমিতে গৃহ নির্মাণ’ উপখাতে দেশের বিভিন্ন স্থানের দল-মতনির্বিশেষে ঘর বরাদ্দ দেওয়া শুরু হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কর্মসূচির আওতায় চৌগাছা উপজেলায় মোট ৫৫০টি ঘর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ৪০৭ ব্যক্তির তালিকা প্রকল্প পরিচালক বরাবর পাঠান চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। সেখান থেকে ২৭ মে ২০১৮ প্রকল্প পরিচালক (যুগ্ম সচিব) আবুল কালাম শামসুদ্দিন স্বাক্ষরিত পত্রে ২৫০ ব্যক্তির তালিকা অনুমোদন করা হয় এবং আড়াই কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে দ্বিতীয় পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরো ৩০০ ব্যক্তির নামের তালিকা প্রকল্প পরিচালক বরাবর পাঠান। গত ৪ জুন ২০১৮ প্রকল্প পরিচালক স্বাক্ষরিত পত্রে ৩০০ ব্যক্তির তালিকা অনুমোদন করা হয় এবং তিন কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ করা হচ্ছে, যারা ইউএনও-কে বিভিন্ন মাধ্যমে টাকা দিয়েছেন তাদের নামের তালিকাই কেবল অনুমোদন করিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইবাদত হোসেন। উপজেলা চেয়ারম্যান এসএম হাবিবুর রহমানসহ জনপ্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইবাদত হোসেন এই প্রকল্প থেকে এক কোটি টাকা বাণিজ্য করেছেন।
তবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইবাদত হোসেন টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সোমবার তিনি স্বরুপদাহ ইউনিয়নের দেবালয় গ্রামের শুকুর আলীর বাড়ি ধসে পড়ার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, সেটি মেরামত করে দেওয়া হয়েছে।
এভাবে ভেঙে যাওয়ার প্রশ্নে তিনি বলেন, পাঁচ ইঞ্চি ইটের গাঁথুনী, নির্মাণের পরেই ধাক্কা লাগলে তো ভাঙতেই পারে।
তবে সুবিধাভোগী নিশ্চিত করেছেন, কোনো ধাক্কা লাগেনি। নির্মাণ কাজে ফাঁকি দেওয়ার কারণে এ অবস্থা হয়েছে।

আরও পড়ুন