নির্যাতিত নারীদের ভরসা মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা

আপডেট: 08:06:40 13/04/2018



img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : হালিমা খাতুনকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন স্বামী আব্দুর রাজ্জাক। আশ্রয় মিলেছিল বাবা মোবারক আলীর বাড়িতে। সেখানে পরিবারের বোঝা হয়ে কষ্টে দিন কাটলেও আর্থিক কারণে মামলা করতে পারেননি হালিমা।
দুই বছর পর তিনি অভিযোগ করেন মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থায়। সেখানে পয়সা ছাড়াই বিচার পেয়েছেন। সংস্থাটি সামাজিক বিচার করে হালিমার দেনমোহর আর খোরপোষের ৫০ হাজার টাকা আদায় করে দিয়েছে।
একইভাবে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা পেয়েছেন স্বামীর বাড়ি থেকে বিতাড়িত আরেক নারী বিউটি খাতুন। তিনিও এখন বাবার বাড়িতে আছেন।
আর স্বামীর সংসারে ফিরে গেছেন আঞ্জুয়ারা খাতুন। তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝি সামাজিক বিচারের (বিকল্প ব্যবস্থায় নিষ্পত্তি) সমাধান করে এই সংস্থাটি।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার ঝিনাইদহ শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, গত দশ বছরে তারা ৬৬৭টি অভিযোগ গ্রহণ করে ৫৪৪টির নিষ্পত্তি করেছেন। যার মধ্যে অধিকাংশ নারীই স্বামীর ঘরে ফিরেছেন। বাকি ১০৩টি দাম্পত্য বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। এই বিচ্ছেদে তারা দেনমোহর আর খোরপোশ আদায় করেছেন এক কোটি ১১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা; যা অসহায় নারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তারা এই টাকা কাজে লাগিয়ে আয়বর্ধক কিছু একটা করছেন।
সংস্থাটির ঝিনাইদহ সদর ইউনিটের সভাপতি আমিনুর রহমান জানান, সমাজে নির্যাতিত, মানবাধিকারবঞ্চিতদের নিয়ে তাদের কাজ। যারা অবহেলিত, যারা অর্থের অভাবে আদালত পর্যন্ত যেতে পারেন না, তারাই চলে আসেন মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার কাছে। নির্যাতিতাদের জন্য এসসিডব্লিউএইচআর প্রকল্প চালু রয়েছে সংস্থাটির। সামাজিক বিচার (বিকল্প ব্যবস্থায়) করে সমস্যার সমাধান করেন তারা।
মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থায় অভিযোগ দিয়েছিলেন ঝিনাইদহের বেতাই গ্রামের মোবারক আলীর মেয়ে হালিমা খাতুন (৫০)। তিনি জানান, বাবা ছিলেন হতদরিদ্র। ছোটবেলায় বিয়ে হয়েছিল তার। সন্তান না হওয়ায় স্বামী তাকে তাড়িয়ে দেন। এরপর কুলবাড়িয়া গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রী মারা গেলে তার সঙ্গে হালিমার বিয়ে হয়। বিয়ের দুই বছর পরই আব্দুর রাজ্জাক ও তার প্রথম স্ত্রীর সন্তানেরা হালিমাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। তাড়িয়ে দেওয়া হয় বাড়ি থেকে। এই অবস্থায় আবারো বাবার বাড়ি আশ্রয় নিয়ে সেই পরিবারের বোঝা হয়ে দিন কাটছিল। মামলা করার সামর্থ্য ছিল না তার।
হালিমা খাতুন জানান, গ্রামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সন্ধান পান তিনি। সেখানে অভিযোগ দিলে তারা উভয় পক্ষকে নিয়ে একটি বিচারের ব্যবস্থা করেন। ওই সংস্থার বিচারে তিনি যে টাকা পেয়েছেন, তা দিয়ে জমি বন্ধক রেখেছেন। এই উপার্জন দিয়েই এখন চলছে তার জীবন।
সদর উপজেলার ডেফলবাড়িয়া গ্রামের বিউটি খাতুন (২২) জানান, একই উপজেলার পোড়া-বাকড়ি গ্রামের শামীম হোসেনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের এক বছরের মধ্যেই স্বামী যৌতুকের জন্য বিউটির ওপর চাপ দিতে থাকে। টাকা দিতে না পারায় বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয় তাকে। কিন্তু তারা তালাক দেয় না। এই অবস্থায় তিনি বাবার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। বাড়িতে ছোট একটি বোন ও একটি ভাই আছে। বাবা শ্রম বিক্রির জন্য আছেন দেশের বাইরে। একদিকে আর্থিক সমস্যা, অন্যদিকে অভিভাবক না থাকায় তিনি মামলা-মোকদ্দমা করতে পারছিলেন না। ঠিক সেই সময়ে মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থায় অভিযোগ দেন। এই অভিযোগ পেয়ে সংস্থাটি বিচারের ব্যবস্থা করে দেনমোহর আর খোরপোষ বাবদ এক লাখ ৩০ হাজার টাকা আদায় করে দিয়েছেন। এই টাকা তিনি ব্যাংকে রেখেছেন। আগামীতে এই টাকা দিয়ে তিনি কিছু একটা করবেন বলে জানান।
সদর উপজেলার পুটিয়া গ্রামের পাপিয়া খাতুনের বিয়ে হয় একই উপজেলার তেতুলবাড়িয়া গ্রামের চান্নু মোল্লার সঙ্গে। বিয়ের পর তাদের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ সৃষ্টি হলে পাপিয়া আদালতে মামলা করেন। কিন্তু এই মামলা চালানোর আর্থিক সক্ষমতা ছিল না পাপিয়ার। পাপিয়া জানান, এ সময় পাশে এসে দাঁড়ায় মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা। পরে তার স্বামী আবারো তাকে ঘরে তুলে নিয়েছেন। বর্তমানে তারা সংসার করছেন।
একইভাবে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কাশিমপুর গ্রামের আঞ্জুয়ারা খাতুন ফিরে গেছেন স্বামীর সংসারে। মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা সামাজিক বিচারের মাধ্যমে তার ভাঙা সংসার জোড়া লাগিয়েছে।
সংস্থাটির সদর উপজেলা শাখার সভাপতি আমিনুর রহমান জানান, সমাজে এখনো অনেক মানুষ আছে যারা আদালতে যেতে সক্ষম নন। আর্থিক সমস্যা আর চেনা-বোঝা মানুষ না থাকায় এরা স্বামীর নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারেন না। ফলে বিচারও পান না। তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থার ঝিনাইদহে অনেক প্রসার ঘটেছে। তাদের সংস্থায় অভিযোগের হার ক্রমে বাড়ছে।
এ ব্যাপারে ঝিনাইদহ জজ আদালতের সিনিয়র আইনজীবী শেখ সেলিম বলেন, ‘এটা খুবই ভালো দিক। কারণ আমাদের সমাজে এখনো অনেকে আদালতে যেতে পারেন না। অনেকে বছরের পর বছর ঘুরে বিচার পান না। কখনো প্রতিপক্ষের ভয়ে মামলা করেন না। তারা এ জাতীয় সংস্থার কাছে নির্ভয়ে অভিযোগ করতে পারেন।’

আরও পড়ুন