নীরব ঘাতকের করাল গ্রাসে জনপদ

আপডেট: 03:56:51 04/05/2018



img
img

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি :    নীরব ঘাতক আর্সেনিক ছড়িয়ে পড়ছে চুয়াডাঙ্গায়। আর্সেনিকের প্রকোপে নীরবে মরছেন মানুষ। কিন্তু তাদের বাঁচানোর উদ্যোগ খুবই সীমিত।
১৫ বছরেও আর্সেনিক আক্রান্তদের শনাক্ত করতে সরকারিভাবে কোনো নতুন জরিপ হয়নি। ফলে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকপ্রবণ এলাকার মানুষরা পাচ্ছেন না ওষুধ এবং নিরাপদ পানি।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গা। আর্সেনিক আক্রান্ত জেলাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এখানকার পানির একমাত্র উৎস নলক‚প। এ জেলার ২৭.৭৩ শতাংশ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক রয়েছে। ৮০% থেকে ১০০% আর্সেনিক আক্রান্ত গ্রামের সংখ্যা ২৯। ৫০% আর্সেনিক আক্রান্ত গ্রাম ১৭৫টি। সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগ গত ২৪ জানুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ও লাইন ডাইরেক্টর বরাবর পাঠানো একটি চিঠিতে দেখা যায়, জেলায় আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় ৫৭১, আলমডাঙ্গায় ৯৮৭, দামুড়হুদায় ৭৭৩ এবং জীবননগর উপজেলায় ১১৮ জন। এর মধ্যে আক্রান্ত নারী এক হাজার ৭৯ জন ও পুরুষ এক হাজার ৩৭০ জন। এছাড়া দামুড়হুদা উপজেলায় আর্সেনিক আক্রান্ত হয়ে ২৭ জন মারা গেছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বেসরকারি সূত্র মতে, চুয়াডাঙ্গায় আর্সেনিকের প্রকৃত বাস্তবতা আরো ভয়াবহ। জেলার চার উপজেলার পানিতেই আর্সেনিকের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি রয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর জানিয়েছে, এ জেলায় সরকারি ও বেসরকারিভাবে স্থাপিত নলকূপের সংখ্যা এক লাখ ১৭ হাজার ৫২৪। এর মধ্যে এক লাখ ১৩ হাজার ৫১টি নলকূপ চালু রয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক রয়েছে ৩১ হাজার ৩৫১টি নলকূপের পানিতে। আর্সেনিক দূষণের পরিমাণ গড়ে ২৭ দশমিক ৭৩ ভাগ। চুয়াডাঙ্গা জেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে আর্সেনিক দূষণের মাত্রা এবং রোগীর সংখ্যা অনেক।
আলমডাঙ্গা উপজেলার নাগদাহ ইউনিয়নের বেনাগাড়ী গ্রামের মরহুম আকবার আলীর ছেলে রহমতউল্লাহ (৬০) ও তার স্ত্রী মেলেছা খাতুন (৪০), একই গ্রামের আশাবুল হকের মেয়ে ঘোলদাড়ী বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী রহিমা খাতুন (১৪), মরহুম নূর মোহাম্মদের ছেলে অব্দুল মান্নান (৫০), মরহুম আলী মোহাম্মদের ছেলে আব্দুর রহমান (৫০), তোফাজ্জেল হকের স্ত্রী সানজুরা (৪৫), মরহুম জামাল উদ্দিনের ছেলে মিনারুল হক (৩৩), মরহুম আব্দুল কুদ্দুসের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন ( ৫০), মরহুম মহিউদ্দিনের স্ত্রী আঙ্গুরা (৫০), মরহুম আমোদ আলীর দুই ছেলে মোহাজ্জেল (৬০) ও তোফাজ্জেলসহ (৬০) আশপাশের অনেকেই আর্সেনিকে আক্রান্ত।
তারা জানান, তাদের গ্রামে অনেক ঘরবাড়ি ও মানুষের বসবাস ছিল। গত ২৫-৩০ বছর এ গ্রামে আর্সেনিনক বিষে আক্রান্ত হয়ে অনেকেই মারা গেছে। অনেকে গ্রাম ছেড়ে অন্য কোনোখানে চলে গেছেন। বর্তমানে ওই গ্রামে ৩২ ঘরের বসবাস। এসব পরিবারের অনেক সদস্য আর্সেনিক আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে জমি কিনে বসতবাড়ি করার মতো সাধ্য নেই।
আর্সেনিক আক্রান্ত এ গ্রামের অনেকেই জানান, তাদের শরীরে আর ওষুধ কাজ করে না। তাদের শরীরে আর্সেনিকের বিষক্রিয়া মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। কিন্তু দেখার কেউ নেই। তাদের এলাকায় কোনো স্বাস্থ্যকর্মী আসেন না, দেন না তাদের ওষুধপথ্য। এই গ্রামের বাসিন্দাদের আর্সেনিকযুক্ত পানিই ব্যবহার করতে হচ্ছে। তারা সংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় কাজ ওই পানি দিয়েই সারেন। তারা পানও করেন বিষমিশ্রিত পানি। নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য কেউ এগিয়ে আসেননি। কোনো জনপ্রতিনিধি নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে গভীর নলকূপ বসানোর প্রস্তাবনা জমা দেননি।
গ্রামবাসীর জোরালো দাবি নতুন প্রজন্ম যারা এখন আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে, তাদের বাঁচানোর জন্য নিরাপদ পানি সরবরাহের দ্রæত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। সেই সঙ্গে আর্সেনেকি আক্রান্তদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ জরুরি।
দামুড়হুদা উপজেলার হরিরামপুর গ্রামে আর্সেনিকমুক্ত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সহযোগিতায় পাইপলাইন ওয়াটার সাপ্লাই সিস্টেম চালু করা হয়েছে। এই গ্রামের ২০০টি পরিবার মাসে ২০ টাকার বিনিময়ে প্রত্যেকদিন তিন বেলা আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহ পাচ্ছেন। এই পানি সরবরাহ পেতে গ্রাহকদের টাকায় পাম্পের বিদ্যুৎ বিল ও তত্ত্বাবধায়কের বেতন বাবদ খরচ হচ্ছে তিন হাজার ৬০০ থেকে চার হাজার।
হরিরামপুর দক্ষিণপাড়ার রাজ্জাক আলীর ছেলে তত্ত্বাবধায়ক টুটুল আলী (১৮) বলেন, এই পানি খাওয়া ও রান্নার কাজে ব্যবহার করার কথা থাকলেও গ্রাহকরা অন্য কাজে পানি অপচয় করেন। উদ্বুদ্ধ করতে পারলে তারা বিশুদ্ধ পানি অপচয় না করে তা সঠিক কাজেই লাগাবেন।
একই গ্রামের পূর্বপাড়ার মরহুম হজরত আলীর ছেলে মকলেছুর রহমান (৪০) বলেন, এই গ্রামে পানি সরবরাহ বাড়ানোর জন্য আরো ট্যাঙ্ক তৈরি করা প্রয়োজন। তাছাড়া এ গ্রামের অনেকেই এখনো আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করেন; যা উদ্বেগজনক।
তিনি আরো বলেন, এখনো এক হাজার বাড়িতে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করলে এ গ্রামটি আর্সেনিকের করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পাবে।
ওই গ্রামের ক্লাবপাড়ার আবুল হাশেমের স্ত্রী আসলিমা খাতুন (৫০) বলেন, গ্রামে সর্বক্ষণিক আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহের ব্যবস্থা রাখতে হবে। গৃহস্থালী কাজে পানি ব্যবহারের কথা মাথায় রেখে এ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সর্বাধিক আর্সেনিককবলিত গ্রামের নাম দামুড়হুদা উপজেলার হাউলী ইউনিয়নের বড়দুধপাতিলা। এই গ্রামের মোট পরিবার ৬২০টি, মোট জনসংখ্যা দুই হাজার ৯৯০। বড়দুধপাতিলা গ্রামের প্রায় ৮০ ভাগ নলকূপের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকের উপস্থিতি রয়েছে। এই একটি গ্রামেই এপর্যন্ত আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৭ জন। নীরব ঘাতক আর্সেনিকের করাল গ্রাসে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে চুয়াডাঙ্গা জেলার বড়দুধপাতিলা গ্রাম। আর্সেনিকের ভয়াল থাবায় এ গ্রামে কর্মক্ষম লোকের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন, কারো শরীরের অংশ কেটে ফেলতে হয়েছে, কেউ কেউ বিছানায় ধুঁকে ধুঁকে মরণের প্রহর গুনছে। আর্সেনিকের কবলে পড়ে এ গ্রাম থেকে ‘শান্তি’ নির্বাসনে গেছে।
বড়দুধপাতিলা গ্রামে যারা আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে তাদের মধ্যে একজন সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নান। তার শরীরে প্রথম মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক চিহ্নিত করা হয় ১৯৯৪ সালের দিকে। আর্সেনিকে আক্রান্ত আব্দুল মান্নান ও ওই গ্রামের আনছারের স্ত্রী আলেয়াকে (৫০) নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকায়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু তারপরও বাঁচানো যায়নি মান্নানকে। ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছেন আলেয়া।
আর্সেনিকের কারণে বড়দুধপাতিলা গ্রামের মাঝের পাড়ার রেণু খাতুনের (৪৫) সংসার ভেঙে যায়। বিয়ের পর রেণুর হাত-পায়ের ক্ষত যখন বড় হতে থাকে তখন শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়ন। আর যাওয়া হয়নি শ্বশুরবাড়িতে। হাতে-পায়ে পচন ধরে। এক পা কেটে ফেলতে হয়েছে। একে একে কেটে ফেলতে হয়েছে হাতের সবগুলো আঙুল। এখন দুচোখের জল ছাড়া আর কিছু নেই রেণু খাতুনের।
বড়দুধপাতিলা গ্রামের মাঝেরপাড়ার মরহুম আব্দুস সামাদের ছেলে কৃষক আসাদুজ্জামান (৪৮) বলেন, আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে তিনি চুয়াডাঙ্গার দর্শনা ও মেহেরপুরে চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু কাজ হয়নি। প্রায় নয় মাস আগে তার ডান পা কাটতে হয়। এখন তিনি স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারেন না।
একই গ্রামের ঈদগাপাড়ার দর্শনা কেরু অ্যান্ড কোম্পানিতে কর্মরত আনসার আলী (৬৫) ও তার স্ত্রী পারুলা বেগম (৫৫) এবং তাদের ছেলে আতিয়ার (২৬) আর্সেনিকে আক্রান্ত। এর মধ্যে বিছানায় মৃত্যুর প্রহর গুনছেন পারুলা বেগম। তিনি খুব কষ্টে বিছানায় বসতে পারেন। অনেক চিকিৎসা করলেও কাজ হচ্ছে না। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। সব সময় শরীর অস্থির লাগে। কোনো কিছুই ভালো লাগে না। কারো সহযোগিতা ছাড়া তিনি উঠে দাঁড়াতে পারেন না। ২৫ বছর ধরে আর্সেনিক আক্রান্ত হলেও সরকারিভাবে তার চিকিৎসা হয়নি। এখন তিনি তিলে তিলে মরতে বসেছেন। তিনি কষ্টের সঙ্গে বলেন, কোনো স্বাস্থ্যকর্মীই তার চিকিৎসার খবর নিতে আসেননি।
চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন খায়রুল আলম জানান, জেলায় আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সদর উপজেলায় ৫৭১, আলমডাঙ্গায় ৯৮৭, দামুড়হুদায় ৭৭৩ এবং জীবননগর উপজেলায় ১১৮। এর মধ্যে নারী এক হাজার ৭৯ জন, পুরুষ এক হাজার ৩৭০ জন। এ পর্যন্ত আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৭ জন। গত ২৪ জানুয়ারি আর্সেনিক রোগীর হালনাগাদ তথ্য ঢাকা মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) বরাবর পাঠানো হয়েছে। এছাড়া আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়ার ব্যাপারে তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুয়ায়ী চিকিৎসার যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, আর্সেনিক আক্রান্তদের চিকিৎসার আওতায় আনার জন্য আক্রান্তদের শনাক্তের ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে এখনও দাপ্তরিক পদক্ষপে নেয়নি। তবে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কবলিত এলাকায় পদক্ষেপ সম্বন্ধে জানতে চাইলে চুয়াডাঙ্গা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মুন্সী মো. হাচানুজ্জামান বলেন, আর্সেনিকমুক্ত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য কিছু কার্যক্রম চালু রয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ৭০ হাজার ৫০০ জনকে তিন হাজার ৪৯২টি বিভিন্ন ধরনের পানির উৎস স্থাপন করে দিয়েছে। এছাড়া ৫৯ হাজার ১৫০ জনের জন্য ৩৩৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লক নির্মাণ, ২৮ হাজার জনের জন্য ৪৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এআইআরপি নির্মাণ, ২৮ হাজার জনের জন্য ৩৩৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গভির নলকূপ স্থাপন, দর্শনা ও জীবননগর পৌরসভায় ৩৭ হাজার ৯৪০ জনের জন্য ৩২ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন, জীবননগর পৌরসভায় ২৪ হাজার ৩০০ জনের জন্য একটি ভূগর্ভস্থ পানি শোধনাগার নির্মাণ করা হয়েছে।
তিনি জানান, চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার ৫৫ হাজার ৭০২ জনের জন্য ৪০ কিলোমিটার বিভিন্ন ব্যাসের পাইপলাইন স্থাপন ও একটি ভূগর্ভস্থ পানি শোধনাগার নির্মাণ এবং জাপান সরকারের অর্থায়নে একটি গভির উৎপাদক নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছে। এছাড়া আলমডাঙ্গা উপজেলার বটিয়াপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে সোলার অ্যানার্জি পাম্পের সাহায্যে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রকল্পগুলো পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে এ জেলার মানুষ প্রতিনিয়ত আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহ পাবেন বলে আশা প্রকৌশলী হাচানুজ্জামানের।

আরও পড়ুন