নেপালে আধিপত্য নিয়ে ভারত-চীন লড়াই

আপডেট: 01:19:50 11/01/2017



img

কমলদেব ভট্টাচার্য

ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির একটি ঘোষণা। তাতে বলা হলো, প্রথমবারের মতো তারা নেপালের সঙ্গে যৌথভাবে সামরিক মহড়ার পরিকল্পনা করছে। যদিও নেপালে চীনা সামরিক সহযোগিতা সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধি পেয়েছে তবুও চীনের এই যৌথ সামরিক মহড়ার প্রস্তাব এটাই প্রথম। এ প্রস্তাব গ্রহণও করে নিয়েছে নেপাল। ভারতের সঙ্গে ১৯৫০ সালে পিস অ্যান্ড ফ্রেন্ডশিপ চুক্তি হয় নেপালের। সেই চুক্তির কিছু কিছু অংশ নেপাল যখন সংশোধন বা পরিবর্তন আনার  কথা বলছে তখনই চীন এমন প্রস্তাব দিয়েছে। ওই চুক্তিতে বলা হয়েছে, তৃতীয় কোনো দেশের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার আগে ভারতকে জানাতে হবে অথবা ভারতের সম্মতি নিতে হবে নেপালকে। এখন চুক্তিটি সংশোধন করে এ সংক্রান্ত বিধিতে পরিবর্তন আনতে চাইছে নেপাল। একই সঙ্গে তারা এর মাধ্যমে নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইস্যুগুলোতে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে। এর আওতায় রয়েছে সামরিক সরঞ্জাম কেনা। নেপাল আর্মিতে সবচেয়ে বড় সামরিক সামগ্রীর যোগানদাতা এখনও ভারত। দু’দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে রয়েছে চমৎকার সম্পর্ক। ১৯৫০ সাল থেকে দু’দেশের সেনাপ্রধানের মধ্যে সম্মানের সঙ্গে আলোচনার রীতি রয়েছে। এতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
এই ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটা পরিষ্কার হয়েছে, ভারতের সঙ্গে সামরিক সম্পর্কে পরিবর্তন আনতে চায় নেপাল। চীন যখন নেপালের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে তার ফলে এমন সিদ্ধান্তে ভারতে অসন্তোষজনক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। চীন ও নেপালের মধ্যে ওই মহড়া হওয়ার কথা রয়েছে ফেব্রুয়ারিতে। তবে এ নিয়ে ভারত থেকে এখনও সরকারিভাবে কোনো অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়নি। ভারতীয় মিডিয়ার খবর ও বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত দিয়েছে, নয়া দিল্লি এমন সিদ্ধান্তে খুশি নয়।
নেপাল-চীন সামরিক মহড়ার বিষয়ে ভারতের উদ্বিগ হওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রকৃতপক্ষে নেপাল ও ভারতের মধ্যে সেনাবাহিনীর বার্ষিক মহড়া হয়ে থাকে। এটা রীতিতেই আছে। একইভাবে বার্ষিকভিত্তিতে নেপাল-যুক্তরাষ্ট্র সামরিক মহড়া হয়ে থাকে। অন্য কোনো দেশের সঙ্গে (এক্ষেত্রে চীন) নেপাল কোনো সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে পারবে না- এমনটা বলার অধিকার নেই ভারতের। এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার সার্বভৌম অধিকার আছে নেপালের। উপরন্তু চীনের সঙ্গে নিজস্ব যৌথ সামরিক মহড়া করে ভারত। তা সত্ত্বেও ২০১৬ সালে সম্পর্ক তিক্ত হয়ে পড়ে ভারত ও চীনের। এর কারণ, ভারত নিউক্লিয়ার সাপ্লাইয়ার্স গ্রুপে যোগ দিতে চায়। তাতে তারা চায় চীনের সমর্থন। কিন্তু চীন তাতে অসম্মতি জানিয়েছে। এ নিয়েই সম্পর্কের এই অবনতি। দু’দেশই ২০১৬ সালের নভেম্বরে ১৩ দিনের যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে। এটা চীন-ভারতের ৬ষ্ঠ সামরিক মহড়া।
তবে ভারতের বিশেষজ্ঞরা এরপরও উদ্বিগ্ন। নয়াদিল্লিতে একজন চীনা বিশেষজ্ঞ হয়াদেবা রানা দে সম্প্রতি ভয়েস অব আমেরিকাকে বলেছেন, নেপাল-চীন সামরিক মহড়ার ফলাফলের দিকে সতর্কতার সঙ্গে দৃষ্টি রাখা উচিত ভারতের। দেখতে হবে এটা কি সেনাবাহিনী-সেনাবাহিনীর মধ্যকার সম্পর্ক নাকি তার চেয়ে বেশি কিছু।
ভারতীয় বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস করছেন যে, যেহেতু ভারতের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে চীনা এমনটা মনে করে ভারত তাই নেপাল-চীন সামরিক মহড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে নয়া দিল্লি। রানা দে বলেন, কৌশলগত স্থান হিসেবে আমরা নেপালের দিকে নজর রাখছি। কারণ, সেখানে এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলছে। ভারত চায় নেপালকে তার প্রভাবের বলয়ে। চীন চায় তার শক্তি বাড়াতে। ভারতের দৃষ্টিতে নেপালে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব শুধু ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য নয়, একই সঙ্গে এটা দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের বৃহত্তর কৌশলের বলয় বৃদ্ধি করা। তবে নেপালে বা নেপাল নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা চলছে তা সাম্প্রতিক কর্মতৎপরতায় পরিষ্কারভাবে ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘ সময় ধরে নেপালে এক্সক্লুসিভ প্রভাব বিস্তারের সুবিধা নিয়েছে ভারত। কিন্তু গত এক দশকে, বিশেষ করে ২০০৮ সালে রাজতন্ত্রের বিলুপ্তির পর অন্য আন্তর্জাতিক দেশ, বিশেষ করে চীন নেপালে তাদের প্রভাব বৃদ্ধির জন্য তৎপরতা শুরু করে। তবে তা করে রাজনৈতিক উদ্দেশে। একই সময়ে চীন নেপালে তার কূটনীতিকে ‘নীরব কূটনীতি’ থেকে ‘ভোকাল’ কূটনীতিতে নিয়ে গেছে। নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়ে চীন তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জোরালোভাবে। এমনটা ভারত অনেক আগে থেকেই করে আসছে বা করেছে। গত বছরে নেপালে সরকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও এক রকম গেম খেলেছে চীন।  ২০১৫ সালে নেপাল তার সংবিধান চূড়ান্ত করে ও ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে টান ধরে। এ সময়ে নেপাল ও চীনের মধ্যে পর্যায়ক্রমিক সম্পর্ক উন্নত হতে থাকে। নেপাল অভিযোগ করে, নেপাল-ভারত সীমান্তে ভারত অবরোধ দিয়েছে। এ অভিযোগ অস্বীকার করে ভারত। এ ‘অবরোধের’ কারণে নেপাল তার নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যদিও এখাতে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম যথেষ্ট ছিল না। নেপাল ও ভারতের মধ্যে উত্তেজনার ফলে যে শূন্যস্থান সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণ করতে, বিশেষত রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে এগিয়ে আসে চীন। এ সময়ে কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফাইড মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট) অথবা সিপিএন-ইউএমএল চেয়ারম্যান কে পি ওলিও’র নেতৃত্বাধীন নেপাল সরকার চীনের সঙ্গে ব্যবসা ও ট্রানজিটবিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর মধ্য দিয়ে তারা নেপালে ভারতের একচ্ছত্র বাণিজ্যকে খর্ব করার চেষ্টা করে। একইভাবে নেপাল-ভারত যৌথ উদ্যোগে রেলওয়ে সম্প্রসারণ ও সড়ক সংযোগসহ বেশ কিছু প্রকল্প গতি পায়। ওলিও সরকারের সঙ্গে কাজ করে স্বস্তি পায় চীন সরকার। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ন্ত্রিত দ্য গ্লোবাল টাইমসসহ চীনা মিডিয়ায় এ বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশ পায়। ওলিও নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর এবং পুষ্প কমল দাহাল ওরফে প্রচণ্ডের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর চীনা মিডিয়ায় সংবাদ ও মতামত প্রকাশিত হয়। তাতে ওলিও সকারের অধীনে যেসব চুক্তি হয়েছে তার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। অন্যদিকে ভারত আশা করে, প্রচণ্ডের অধীনস্ত সরকার ভারতের প্রতি অনুগত হবে। একইভাবে তারা চায়, নেপালে চীনের প্রভাব কমে যাক। আর তার ফলে ভারত তার আগের অবস্থান ফিরে পাক। তবে ক্ষমতায় এসেই প্রচণ্ড ঘোষণা করেন, তিনি ভারত ও চীন ইস্যুতে সবার সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে চলবেন। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নয়াদিল্লি ও বেইজিংয়ে স্পেশাল দূত পাঠান প্রচন্ড। এর মধ্য দিয়ে তিনি দু’দেশের সরকারকে বার্তা দেয়ার চেষ্টা করেন, তিনি কি কি ইস্যুকে অগ্রাধিকার দিতে যাচ্ছেন।
কিন্তু প্রচন্ড নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে যে, তার সরকার ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। নতুন সরকার গঠনের এক মাস পরেই তিনি রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত গিয়েছেন। তার এই সফরের পর পরই ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জী নেপাল সফর করেন। ১৮ বছরের মধ্যে তিনিই প্রথম ভারতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে নেপাল সফর করলেন। তবে নেপালে নতুন সরকার গঠনের পর থেকে নেপাল ও চীনের মধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কোনো সফর হয়নি। নেপালের প্রধানমন্ত্রী প্রচন্ডের চীন সফর ও চীনা প্রেসিডেন্ট সি জিনপিংয়ের নেপাল সফর অচলাবস্থায় উপনীতি হয়েছে।
রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছিল, ২০১৬ সালে নেপাল সফরে আসার কথা ছিল শি জিনপিংয়ের। নেপালে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় ঘাটতি থাকার কারণে শি জিনপিং ওই সফর বাতিল করেন। আরও পরে দ্য বেল্ট অ্যান্ড রোড সংযোগ প্রকল্প স্বাক্ষরের জন্য নেপালকে চাপ দিতে থাকে চীন। চীনের এ সংযোগ প্রকল্পটি পূর্ব এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত। এক্ষেত্রে ভারতের সাড়া ইতিবাচক নয়।
এ সমস্যা প্রচন্ডর জন্য অদ্বিতীয় নয়। নেপালের সাম্প্রতিক প্রতিটি প্রধানমন্ত্রী এ দুটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তবে তারা হয়তো ভারতপন্থি না হয় চীনপন্থি হিসেবে আখ্যা পেয়েছেন। তাই সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার জন্য নেপালের উচিত উভয় দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা।

[কমলদেব ভট্টাচার্য নেপালি সাংবাদিক। তিনি ভূ-রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে লেখালেখি করেন। নেপালের শান্তি ও সংবিধান বিষয়ে লিখেছেন একটি বই। এর নাম ‘ট্রানজিশন: ফ্রম ১২-পয়েন্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিং টু কনস্টিটিউশন প্রোমালগেশন’। দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ আবুল হোসেন।]

আরও পড়ুন