নৈঋত

আপডেট: 03:59:44 20/07/2017



img

ত্বরিকুল ইসলাম


নৈঋতের উঁচা পর্বতটার চূড়া ঘেঁষে চতুর্দিকে একটা ধূসর মেঘের ধোঁয়ার কুণ্ডলী জড়ো হলো, যেন পর্বতটার মাথায় কেউ এসে টোপর পরিয়ে দিয়ে গেছে। ঘন হয়ে আসা মেঘের ধোঁয়াটা লাটিমের মত পাক খাচ্ছে। ওদিকে তাকিয়ে নৈসর্গিক লীলায় বিস্মিত শিখর মং আঙ্গুল উঁচু করে বললো: দেখ দিদি!!

সুখিয়া এক হাতে তার আঁচল বুকের কাছে ঝোলা করে গুটিয়ে অন্য হাতে হেলেঞ্চা কুড়াচ্ছিলো। পাহাড়ি ঝোঁপে-ঝাড়ে অবহেলায় গজিয়ে উঠা হেলেঞ্চার কচি ডগাগুলো ছিড়ে ছিড়ে হলদে সবুজ পত্রপল্লব জড়ো করছে বুকের ওমে। বাতাসের ঝাপটায় শরীরে আঁটোসাঁটো করে প্যাঁচানো দেহাতা পাড়ের শাড়িটা দেহের ভাঁজে ভাঁজে সেঁটে আছে। সুখিয়া এখনো কাঁচুলি পরে না। আঁচলটা পেছন দিক থেকে ঘুরিয়ে এনে ডান বাহুর নিচে দিয়ে মোচড় মেরে বাম কোমরের প্যাঁচে কায়দা করে সেঁধে দেয়। তাতে সদ্য গজিয়ে ওঠা বুকের কুঁড়ি ঢাকা পড়ে; কিন্তু যখন সে উবু হয়ে হেলেঞ্চা কুড়ায়, যৌবনের জোয়ারে ফুঁসে ওঠা ছোট ছোট ঢেউগুলো পাশ থেকে দৃষ্টিসন্ধানী পথযাত্রীদের চোখে ঠিকই ঘাঁই মারে।

সুখিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে পর্বতটার দিকে তাকালো। অনেকগুলো ছোট ছোট পাহাড়ের মাঝখানে হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা উঁচা পর্বতটার চূড়া অন্য সবগুলোকে ছাড়িয়ে এতটাই উপরে উঠে গেছে যে, সেদিকে তাকালে পর্বতটাকে নিঃসঙ্গ রকমের বড় এবং একা মনে হয়। সুখিয়া যখন মাতামুহুরিতে শিখরের বয়সী ছোট ছোট ছেলেগুলোর সাথে কাদামাটি ঘেঁটে জলকেলি খেলে, ভেজা দেহাতি আঁচলটা জলের ঝাপটায় হঠাৎ হঠাৎ ভেসে যায়, তখন নদীর পাশ ঘেঁষে থমকে যাওয়া মেঠো রাস্তাটার পথচারীরা কামাতুর দৃষ্টিতে কৈশোরের বয়স মাপতে থাকে- সেই লোভাতুর দৃষ্টিতে বিদ্ধ হতে হতে সুখিয়া কুঁকড়ে যায়, নিজেকে তখন হঠাৎ নিঃসঙ্গ রকমের বড় মনে হয়। নৈঋতের পর্বতটিও আজ যেন সেই বেদনায় বিদ্ধ!

পর্বতটাকে ঘিরে পুঞ্জিভূত হওয়া মেঘের চক্রটা যেন অনাগত কোন দুঃসংবাদের ভারে গাঢ় নীল হয়ে আছে! ঝড় আসবে কি? কী এক অজানা শংকা বুকে গুলিয়ে ওঠে। ঢিপ ঢিপ করতে থাকে সুখিয়ার টান করে বাঁধা কাঁচুলিবিহীন বুক। সে শিখরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। শিখর বুঝতে পারে না ঠিক কী কারণে পর্বতটার দিকে তাকিয়ে দিদির চেহারায় এমন ভীত-সন্ত্রস্ত কালো ছায়া নেমে এসেছে!

উঁচু পর্বতের চূড়ার দিকে তাকালে শিখরের ছোট্ট বুকটার ছাতি যেন গর্বে ফুলে ওঠে। দিদি বলেছে, তার নামের অর্থ পাহাড়ের চূড়া। শিখর জানে- বানিয়াচঙের নৈঋতে হঠাৎ উঁচা হয়ে ওঠা ঐ পর্বতের মত একদিন সেও অনেক অনেক বড় হবে। সবাইকে ছাড়িয়ে যাবে। বাবা বলেছে, আগামী আশ্বিনে তাকে টোলে পাঠাবে। সে লেখাপড়া শিখে শহরে যেয়ে শার্ট-প্যান্ট পরা বাবুদের মত চাকরি করবে। শুদ্ধ শুদ্ধ ভাষায় কথা বলবে। কালো পাহাড়ের নিচের একচালা ঝুপড়িটা ছেড়ে তারা কোন টিলার উপর টিনের ঘর বেঁধে বসত করবে। ঘরের চারপাশে আনাজপাতি রুয়ে সবুজে ছেয়ে দেবে। আনাজপাতির কথা ভাবতেই দিদির কথা মনে পড়লো শিখরের। দিদিকে তখন টিলায় টিলায় ঘুরে হেলেঞ্চা কুড়াতে হবে না।

হেলেঞ্চার ডগাগুলো গুটানো আঁচল থেকে উঁকি মেরে চেয়ে আছে। সেগুলো বুকের সাথে লেপ্টে ধরে অন্য হাতে শিখরের কচি বাহুটা নাড়া দিয়ে সুখিয়া বললো : বাড়িত চল, ঝড় আইবো।

ঝড়!!! শিখরের বুকটা ধক করে উঠলো। ঝড় আইবো? মেঘের লাহান আন্ধার, মহামারীর লাহান তীব্র, দেও-দানবের লাহান ভয়ঙ্কর ঝড়? তার চোখের সামনে থেকে দৃশ্যগুলো সরে যেতে শুরু করে। নৈঋতের বিশাল পর্বতটা ঝাপসা হতে হতে যেন মিলিয়ে যায়! তার সম্মুখে ভেসে ওঠে আকাশ কালো করা মেঘের ঘূর্ণি। প্রচণ্ড বাতাসে নুয়ে পড়া শাল গাছ। মানুষের আর্ত চিৎকার। শিশুর কান্নার শব্দ। সোঁ সোঁ করে বইছে বাতাস। কান ঝিম ধরে যাচ্ছে শব্দে। মা চিৎকার করে ডাকছে : শিখর...শৈল... তোরা খডে...?? বাজান... মা সুখিয়া...
প্রচণ্ড শব্দে আকাশে যেন বোমা ফাটলো। আলোর তীব্র ঝলকানিতে সবার চোক্ষে ধাঁধা লেগে গেছে। ঠিক তখুনি আমগাছের ডালখানা মট করে ভেঙ্গে পড়লো ঘরের ছাউনির উপর। টিলার উপরে অর্জুন গাছের তলা জাপ্টে ধরে বসে থেকে নিচে তার ঘর ভেঙ্গে যাওয়া দেখছিলো শিখর।
ভাগ্যিস, অর্জুন গাছটার গোঁড়ায় শিকড়টা প্যাঁচিয়ে প্যাঁচিয়ে বসার আসনের মত গোল হয়ে খাঁজ তৈরি করেছিলো। সেটাতে বসে মাথায় একটা বড় কচুপাতা দিয়ে ঢেকে সামনের শিকড় শক্ত করে ধরে রেখে শীতে এবং আতংকে কাঁপতে কাঁপতে শিখর দেখলো : টিলার দক্ষিণ প্রান্তে, যেখানে একটা বড় নারকেলগাছ হঠাৎ বাঁকা হয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে, গাছটার গুঁড়িসহ পাহাড়ি মাটির একটা বড় স্তূপ আচমকা হুড়মুড় করে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে... গড়াতে গড়াতে চাকার মত গোল হয়ে আসা মাটির চাক ঠিক তার ঘরের ছাদের উপর আছড়ে পড়লো। একটা আর্তচিৎকার ভেসে আসলো মাটিতে চাপা পড়া বিধ্বস্ত একচালা ছনের নড়বড়ে ঘরটি থেকে। চিৎকারের কর্কশ কণ্ঠটা বড় চেনা। এত উপর থেকেও শিখর শোনা মাত্রই চিনে ফেললো কণ্ঠটা।
‘শৈ... ল...অ...অ......’ ঝড়ে বিধ্বস্ত বানিয়াচং-এ কেউ শিখরের ডাক শুনে পেছন ফিরে তাকিয়েছিলো কিনা, জানি না। তবে জানি, শৈলের আর্তচিৎকার কানে আসার সাথে সাথে শিখর দিগ্বিদিক ভুলে ছুটতে শুরু করেছিলো। কীভাবে, কোন পথ দিয়ে, ঠিক কতক্ষণে সে নেমে এসেছে- জানা নেই। তবে নেমে এসেছিলো। তীব্র বাতাসের ঝাপটা পেরিয়ে নেমে এসেছিলো। নামতে নামতে একবার শুধু ঘাড় তুলে তাকিয়ে দেখেছিলো- গড়াতে গড়াতে কাঁটাঝোঁপে আটকে যাওয়া উপড়ানো প্রকাণ্ড নারকেলগাছটা হঠাৎ ঝোঁপঝাঁড় ছিড়ে আবার গড়িয়ে নিচে নামতে শুরু করেছে।
শিখর যখন টিলার একেবারে নিচে তার বাসার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে, তার মা মিন্তি মং সন্তানদের খুঁজতে খুঁজতে গলা ফাটিয়ে অবশেষে সুখিয়াকে পেয়ে তার কচি আনাজের ডাঁটার মত বাহুখানা ধরে চ্যাংদোলা করে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র, ভেতরের লুণ্ঠিত ছাউনি ঘর দেখে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, শিখরের গোঙানি শুনে পেছন ফিরে তাকিয়ে শিখরকে একা দেখতে পেয়ে আতংকে এবং জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখুনি টিলার উপড়ানো নারকেলগাছটা এসে বিধ্বস্তপ্রায় একচালা ঘরটার উপরে পড়লো। ভেতর থেকে ক্ষীণ একটা আর্তনাদ বেজে উঠে হঠাৎ যেন থেমে গেলো। বোবা আতংক নিয়ে শিখর একচালা ঘরটার নুয়ে পড়ে মাটির সাথে মিশে যাওয়া দেখতে লাগলো।
‘থিয়াই রইয়্যুস ক্যাঁ? দুড়্যাই চল।'- দিদির তাড়া খেয়ে সজোরে আছড়ে পরে বর্তমানে ফিরে আসে শিখর। হতভম্বের মতো ডানে বামে তাকায়। দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের উঁচা পর্বতটা দেখতে পায় সে, পর্বতের অন্য নাম নাকি শৈল! পর্বতের সাথে সেদিন তার অনুজ শৈল মং ধসে গিয়েছিলো। লাশটা যখন বের করা হয় মাটি খুঁড়ে, রক্তে মাটিতে মাখামাখি হয়ে সে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। সেদিন শৈল যেন মিশে গিয়েছিলো পর্বতে।
শৈলের কচি মুখখানা দৃশ্যপটে ভাবতে ভাবতে দিদির হাত ধরে ছুটতে থাকে শিখর। আবার ঝড় আসবে!