নৈশপ্রহরী নিয়োগে সাড়ে তিন কোটি টাকা বাণিজ্য!

আপডেট: 09:10:03 14/07/2017



img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) প্রতিনিধি : যশোরের মণিরামপুরের ৪৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নৈশপ্রহরী কাম পিয়ন নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। মণিরামপুরের সদ্য বিদায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ অতুল মণ্ডল ও প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আশীষকুমার নন্দী নিয়োগপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও গুঞ্জণ। তাদের অর্থবাণিজ্যের কথা এখন উপজেলার মানুষের মুখে মুখে। তাছাড়া তাদের বিরুদ্ধে ফলাফল প্রকাশেও অস্বচ্ছতার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, ইউএনও অতুল মণ্ডল নিয়োগপ্রত্যাশীদের তোপ থেকে বাঁচতে ফলাফল ঘোষণা না করেই মণিরামপুর ছেড়েছেন। এসব বিষয়ে ভুক্তভোগীদের পক্ষ হতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে অভিযোগ জমা পড়েছে। মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) লিংকন বিশ্বাস এই সংক্রান্ত একটি অভিযোগ তার দপ্তরে জমা পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে, নৈশপ্রহরী নিয়োগে দুর্নীতির কারণে মাঠপর্যায়ে নিয়োগ প্রত্যাশীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা যায়, গত ২২ জুন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নৈশপ্রহরী কাম পিয়ন নিয়োগ সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করে। সে মোতাবেক গত ২৮ জুনের মধ্যে অফিস চলাকালীন সময় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে ওই পদে নিয়োগদানে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আগ্রহী প্রার্থীদের কাছ থেকে দরখাস্ত আহবান করা হয়। অফিসের এ আদেশের আলোকে ৪৬টি পদের বিপরীতে সাড়ে তিনশ’ আবেদন জমা পড়ে। এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে সদস্য সচিব করে ৬ সদস্যের একটি  নিয়োগ কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি আবেদনকারীদের কাগজপত্র যাচাই বাছাই করে ২ ও ৩ জুলাই মৌখিক পরীক্ষার সময় নির্ধারণ করেন। এতে ফল প্রকাশের তারিখ নির্ধারণ করা হয় একই মাসের ৩ জুলাই। এছাড়া নিয়োগপত্র ইস্যুর তারিখ দেয়া হয় ৫ জুলাই। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ৬ জুলাইয়ের মধ্যে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে আবেদন চেয়ে পুনরায় ৭ ও ৮ জুলাই পরীক্ষার নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করেন নিয়োগ কমিটি। এই সংক্রান্ত একটি পত্র সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের কাছে প্রেরণ করা হয় সভাপতি ও সদস্য সচিবের স্বাক্ষর বিহীন। একই সাথে কোনো তারিখ ছাড়াই চাকরি প্রত্যাশীদের কাছ থেকে সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য পত্র দেয়া হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণেই এ পত্রে পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার সময় নির্ধারণ করা হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অতুল মণ্ডলের বদলির আদেশ আসে ১৪ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে। তার এ আদেশের আলোকে তিনি ৯ জুলাই অপরাহ্নে নির্বাহীর দায়িত্ব অর্পণ করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) লিংকন বিশ্বাসের উপর। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, ৯ জুলাই তিনি দায়িত্ব হস্তান্তর করলেও পরের দিন গভীররাত পর্যন্ত মণিরামপুরে টানা অফিস করেন অতুল মণ্ডল। এই সময়ের মধ্যে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আশীষকুমার নন্দীকে নিয়ে নিয়োগের সকল কাগজপত্র চূড়ান্ত করেন। যার ভিডিও চিত্র রয়েছে এই প্রতিবেদকের কাছে। তবে নিয়োগ বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিয়োগের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেও গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রত্যাশিত ফলাফল আলোর মুখ দেখেনি। ফলে চাকরিপ্রত্যাশীদের মাঝে চরম হতাশা বিরাজ করছে।
অভিযোগ উঠেছে, নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ অতুল মণ্ডল ও টিইও আশীষকুমার নন্দী তার বিশ্বস্ত একটি চক্রের মাধ্যমে নৈশপ্রহরী নিয়োগে প্রার্থীদের কাছ থেকে প্রায় ৭ থেকে ৯ লাখ টাকা করে নিয়েছেন। বিষয়টি সবার মুখে মুখে হলেও চাকরি পাওয়ার আশায় কেউ মুখ খুলতে চাচ্ছেন না। তবে নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ভুক্তভোগীদের পক্ষে একটি অভিযোগ সংশ্লিষ্ট একাধিক দপ্তরে জমা পড়েছে।
মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) লিংকন বিশ্বাস এই সংক্রান্ত একটি অভিযোগ তার দপ্তরে জমা পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন,‘কে অভিযোগ করেছে তার নাম এই মুহূর্তে জানানো যাচ্ছে না। কারণ আমি ফাইলটি খুলে দেখিনি। রোববার জানাতে পারব।’ 
জানতে চাইলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও নিয়োগ বোর্ডের সদস্য সচিব আশীষকুমার নন্দী বলেন, টাকা নেয়ার বিষয়টি সত্য নয়।’
 নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি সদ্য বিদায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ অতুল মণ্ডল বলেন, ‘আমিতো নিয়মমতই নিয়োগের কাজ ঠিকঠাক করে দিয়ে চলে এসেছি। ফলাফল ঘোষণা করতে হলে স্থানীয় সংসদ সদস্যের স্বাক্ষর লাগবে- নিয়মে এমনই লেখা আছে। ফলাফল ঘোষণা করা আর না করা তাদের ব্যাপার।’
অর্থবাণিজ্যের ব্যাপারে জানতে চাইলে অতুল মণ্ডল বলেন, ‘আমি কেমনে বলব, ভাই। মাত্র ছয় মাসে আমি ওখানকার কয়জনকেই চিনি।’
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেন,‘নিয়োগে কোনো প্রকার অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

আরও পড়ুন