নড়াইলে ফোর লেন রাস্তা তৈরিতে যত প্রতিবন্ধকতা

আপডেট: 08:49:20 27/03/2019



img
img

মৌসুমী নিলু, নড়াইল : শহরকে যানজটমুক্ত ও শোভাবর্ধন করতে নড়াইল শহরে ফোর লেন রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পের মূল প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে পৌরসভার পাঁচটি সুপার মার্কেটসহ ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত প্রভাবশালীদের কয়েকটি অবৈধ স্থাপনা। সড়ক বিভাগের অধিগ্রহণ করা জমিতে অবৈধভাবে নির্মাণ করা এ সকল বহুতল ভবন মামলা জটিলতায় উচ্ছেদ করতে পারছেন না সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা।
ইতিমধ্যে রাস্তার দুই প্রান্তের ফুটপাথের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হলেও বহাল তবিয়তে ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন বহুতল ভবনে গড়ে উঠা বড় ব্যবসায়ীরা। অভিযানে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (স্থাপনা) উচ্ছেদ করা হলেও প্রভাবশালীদের অবৈধ প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে সড়ক বিভাগ বলছে, মামলা জটিলতার কারণে এ সব ভবন উচ্ছেদ করা হয়নি।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) নেতা ও নড়াইল নগর পরিকল্পনাবিদদের দাবি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে এবং শহরের শোভাবর্ধন করতে মালিবাগ মোড় থেকে নতুন টারমিনাল পর্যন্ত দ্রæত ফোর-লেন রাস্তা নির্মাণ করা হোক।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নড়াইল শহরে যানজট নিরসনের জন্যে মালিরবাগ মোড় থেতে নতুন টারমিনাল পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার শোভাবর্ধনকারী ফোর-লেন রাস্তা নির্মাণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যার ধারাবাহিকতায় রাস্তার দুই পাশের অবৈধ দখলদারদের সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। মামলা জটিলতার কারণে পৌরসভার পাঁচটি সুপার মার্কেটসহ স্থানীয়দের কয়েকটি বহুতল ভবন উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। উচ্ছেদ অভিযান চলমান থাকবে। অল্পদিনের মধ্যে সব জমি উদ্ধার করা হবে।
২০০৩ সালে তৎকালীন চার দলীয় জোট ক্ষমতা থাকাকালে নড়াইলের প্রাণকেন্দ্র পুরনো বাসটারমিনালে সড়ক বিভাগের জায়গায় পৌরসভা একটি (জিয়া প্লাজা) বহুতল ভবন নির্মাণ করে। ভবনের কাজ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়ক বিভাগ জায়গা নিয়ে আপত্তি জানালেও তৎকালীন প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় বাধা উপেক্ষা করে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নামে ‘জিয়া প্লাজা’ তিন তলা ভবন নির্মাণ করে ব্যবসায়ীদের কাছে বরাদ্দ দেন।
এর কয়েক বছর আগে নড়াইলের রূপগঞ্জ বাজারে সড়ক বিভাগের জায়গায় এক এক করে চারটি সুপার মার্কেট (বহুতল ভবন) নির্মাণ করে পৌর কর্তৃপক্ষ। ওই সময়ও সড়ক বিভাগ কাজে বাধা দিলে স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় সুপার মার্কেট করতে সক্ষম হন পৌরসভা।
এদিকে স্থানীয় কয়েক ক্ষমতাশালী ব্যক্তি সড়ক বিভাগের জায়গায় কয়েকটি বহুতল ভবন নির্মাণ করে ঐ সব জায়গা তাদের নিজেদের দাবি করে আদালতে মামলা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে পৌরসভার কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেন, পৌরসভা ভবনগুলো নির্মাণ করার সময় সড়ক বিভাগের অনুমতি নিয়েই করা হয়েছে। ভবন নির্মাণের অনেক পরে সড়ক বিভাগ জায়গা নিয়ে আপত্তি জানালে আদালতে মামলা করা হয়েছে।
পৌরসভার সচিব ওহাবুল আলম বলেন, এ সকল জায়গায় ভবন নির্মাণ করার সময় কিছু কিছু জায়গায় সড়ক বিভাগের অনুমতি নিয়ে করা হয়েছে। কিছু কিছু জায়গার জমি পৌরসভার অনুকূলেও রয়েছে। এই জায়গাগুলো পৌরসভা কীভাবে মালিকানা পেল তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এই কর্মকর্তা।
সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এলএ ৫০-৫১ এবং এল এ ৬১-৬২ মামলায় নড়াইল সড়ক বিভাগের অধীনে রাস্তার দুই পাশে জমি অধিগ্রহণ করা হয়। অধিগ্রহণ সূত্রে এই জমির মালিক নড়াইল সড়ক বিভাগ। বিভিন্ন সময় নড়াইল পৌরসভা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এক এক করে পাঁচটি বহুতল ভবন নির্মাণ করে সুপার মার্কেট বানিয়েছে। যখনই পৌরসভা ভবনগুলো নির্মাণ কাজ শুরু করেছে তখনই সড়ক বিভাগ বাধা দিয়েছে। তবুও সেই বাধা উপেক্ষা করে অবৈধভাবে মার্কেটগুলো নির্মাণ করে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সঙ্গে ১৫-২০ বছর যাবৎ মোট ১৮টি মামলা চলমান ছিল, যার মধ্যে পাঁচটি হাইকোর্টে রয়েছে। নতুন করে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করার কথা শুনে এলাকার কয়েকজন আরো ছয়টি নতুন মামলা করেছেন। বর্তমানে মোট ২৪টি মামলা চলমান রয়েছে। যে জমিতে মামলা চলমান রয়েছে তার বাজার মূল্য অন্তত ২০ কোটি টাকা। মামলাকৃত জমিতে এলাকার প্রভাবশালী মহল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে প্রায় দশটি। আর এসব ভবনে বিভিন্ন অফিসসহ পাঁচ শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গোপালগঞ্জের ভাটিয়াপাড়া-কালনা-নড়াইল-যশোর মহাসড়কের ২৩তম কিলোমিটার (নড়াইল শহরের আলাদাতপুর কবরস্থান) থেকে ২৬তম কিমি (নড়াইল নতুন বাসটারমিনাল) পর্যন্ত তিন কিমি সড়কের উভয় পাশে সওজ-এর অধিগ্রহণকৃত অবৈধভাবে স্থাপিত সকল স্থাপনা উচ্ছেদের অভিযান চালানো হয়। গত ৪ মার্চ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর খুলনার এস্টেট ও আইন কর্মকর্তা সিফাত মেহনাজের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। এদিন বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত দেড় শতাধিক পাকা, আধা পাকা এবং কাঁচা স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়।
ওই সময় রেন্ট এ কারের অফিস, গোরস্থানের পাশের মাদরাসার পিলার, ক্রীড়া সংস্থার একটি মার্কেট, পুরনো টারমিনালে অবস্থিত পৌরসভার কাঁচা বাজার ও মার্কেট, রূপগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের কয়েকটি স্থাপনাসহ রাস্তার পাশের ছোট ছোট দোকান ঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙা হয়। তবে সড়কের জায়গা দখল করে নির্মাণ করা ৮-১০টি ভবন উচ্ছেদ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে বেশ কয়েকজন দোকান ঘরের মালিককে স্ট্যাম্পের ওপর লিখিতভাবে সময় দেওয়া হয়েছে তাদের স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য। ব্যক্তি মালিকানার কয়েক অবৈধ দখলদার কোর্টের স্থগিতাদেশ আনায় তাদের স্থাপনা ভাঙা হয়নি।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) নড়াইল জেলা সভাপতি খাইরুল আলম বলেন, শহরের মধ্যে দিয়ে মালিবাগ মোড় থেকে নতুন টারমিনাল পর্যন্ত রাস্তা অনেক সরু। ফলে এখানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনা এড়াতে এখানে দ্রæত ফোর-লেন রাস্তা নির্মাণের দাবি এই নেতার।
সরকারি সম্পদ রক্ষার জন্য বিভিন্ন সময় নড়াইলে আন্দোলন করেন কাজী হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে সড়ক বিভাগের সব সম্পত্তি উদ্ধার করা জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে মালিবাগ মোড় থেকে নতুন টারমিনাল পর্যন্ত দ্রæত ফোর-লেন রাস্তা নির্মাণ করা হোক।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর খুলনার এস্টেট ও আইন কর্মকর্তা সিফাত মেহনাজ বলেন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের জমিতে অবৈধভাবে দখল করে নির্মিত স্থাপনা উচ্ছেদ করে জমি দখলমুক্ত করা হচ্ছে। এই অভিযানে প্রায় পাঁচ একর জমি উদ্ধার করা হয়েছে।
নড়াইল সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফরিদ উদ্দিন জানান, শহরে যানজট নিরোসনের জন্যে মালিরবাগ মোড় হতে নতুন টার্মিনাল পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার রাস্তা ফোর-লেন করার জন্যে চেষ্টা করা হচ্ছে। যার ধারাবাহিকতায় রাস্তার দুই পাশের অবৈধ দখলদারদের সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। মামলা জটিলতার কারনে কয়েকটি বহুতল ভবন উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। উচ্ছেদ অভিযান চলমান থাকবে। অল্পদিনের মধ্যে সকল জমি উদ্ধার করা হবে বলে মন্তব্য এই কর্মকর্তার।
জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা বলেন, মালিবাগ মোড় থেকে নতুন টারমিনাল পর্যন্ত রাস্তাটি গুরুত্বপূর্ণ। এই রাস্তা দিয়ে শহরের বহু লোক চলাফেরা করেন। এই সড়কটি ফোর-লেন করার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা বাস্তবায়ন হলে শহরের যানজট অনেক কমে যাওয়ার পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনাও অনেক কম হবে এবং শহরের শোভাবর্ধন হবে।

আরও পড়ুন