নয় গ্রামের হাজারো মানুষ নদী ভাঙন আতঙ্কে

আপডেট: 06:21:13 21/12/2016



img
img

রূপক মুখার্জি, লোহাগড়া (নড়াইল) : নড়াইলের লোহাগড়া শালনগর ইউনিয়নে শুকনো মৌসুমেও মধুমতির ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। নদীর পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
ফলে মধুমতি নদী তীরবর্তী উপজেলার ওই ইউনিয়নে শিয়রবর, মাকড়াইল, কাশিপুর, রামচন্দ্রপুর, চর-শালনগর, চর-মাকড়াইল, নওখোলা, দিগনগর, কাতলাশুর গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। স্রোতের তোড়ে শালনগর ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী প্রায় দশ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনের কবলে পড়েছে এলাকার হাটবাজার, বাড়িঘর, দোকানপাট, মসজিদ, স্কুল, আবাদি জমি ও রাস্তা। ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মধুমতির ভাঙন চলতে থাকলেও তা রোধে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
রোববার ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভাঙনের মুখে পড়ে এলাকাবাসী সরিয়ে নিচ্ছেন ঘরবাড়ি। ভাঙন-আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এসব গ্রামের বাসিন্দারা। ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে কেউ প্রতিবেশী বা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে, আবার কেউবা রাস্তার পাশে ছাপড়া তুলে আশ্রয় নিয়েছেন। নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন অনেকে। তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
শালনগর ইউনিয়নের কাশিপুর গ্রামের আয়েশা বেগমের বাড়ি নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘১৫ বছর বয়সে বউ হয়ে এখানে আসি। জমিজমাসহ শ্বশুরবাড়িতে সুখের সংসার ছিল। নদীর ভাঙনে সব হারিয়েছি। দুইবার বসতঘর সরাতে হয়েছে। এখন পরের জায়গায় ছাপড়া তুলে কোনো রকম আছি। তাও সরিয়ে নিতে বলেছেন জায়গার মালিক। এখন কোথায় যাব?’
একই গ্রামের মো. আমিনুর মোল্যা বলেন, ‘আমার বলার কিছুই নেই। বাপদাদার সামান্য কৃষি জমি ছিল। সেই জমি চাষবাস করে বেঁচে থাকলেও তা এবার সর্বনাশা নদী গিলেছে। চার শতক জমিতে বসতভিটা আছে। শুকনো মৌসুমে যেভাবে নদী ভাঙছে যদি সরকার কোনো পদক্ষেপ না নেয় তাহলে এবার হয়তো তাও হারাতে হবে বলে আশঙ্কা করছি।’
শিয়রবর বাজারের প্রবীণ ব্যবসায়ী নারায়ণ চৌধুরী বলেন, ‘১৯৭৫ সাল থেকে এ বাজারে ব্যবসা করে আসছি। শুরুতে বাজারটি প্রায় ২০ একর এলাকা জুড়ে ছিল। সে সময়ে কয়েক জেলার মধ্যে এই বাজাটি ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। মধুমতি নদীর অব্যাহত ভাঙনে এখন বাজারটি সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেলেও ভাঙন রোধে সরকারি কোনো পদক্ষেপ আজো দেখা যায়নি। ’
একই বাজারের হোটেল ব্যবসায়ী মো. আনোয়ার শেখ বলেন, ‘চলতি বছরেই ভাঙনের কবলে পড়ে তিন বার দোকানঘর সরাতে হয়েছে।’
হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী রাজ্জাক মোল্যা বলেন, ‘বাজারের এমন কোনো দোকান নেই যা তিন থেকে চার বার সরাতে হয়নি।’
এ বিষয়ে শালনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খান তসরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের নয়টি গ্রাম নদী ভাঙনের কবলে পড়েছে। বহু পরিবার বসতভিটা হারিয়ে এখন নিঃস্ব। ভাঙন প্রতিরোধে দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে দিনে দিনে এসব জনপদ বিলীন হয়ে যাবে। বিষয়টি জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) জানিয়েছি।’
লোহাগড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা বলেন, ‘আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। নদীভাঙন এলাকার মানুষ যাতে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় দশ টাকার চাল পেতে পারে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের অবগত করেছি।’
নড়াইল পানি উন্নয়ন বের্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহনেওয়াজ তালুকদার বলেন, ‘আমরা ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। ইতিপূর্বে ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর পাঠিয়েছি। আশা করছি ভাঙন রোধে বিশেষ করে শিয়েরবর বাজার এলাকায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারব।’

আরও পড়ুন