পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে গ্রামের ঈদ

আপডেট: 08:09:37 22/06/2017



img

আমিরুল আলম খান

আমার জন্ম এক বিচ্ছিন্ন জনপদে। শালকোনা নামে যে গ্রামে আমার জন্ম সেটি খুশির ঈদের দ্বিতীয়ার চাঁদের মত বাঁকা। সে গ্রামের কথা মনে হলেই আমার গীতাদত্তের বহুলজনপ্রিয় সেই গানটি মনে পড়ে, “নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে।” আমি মনে করতাম, গ্রামটি পুব-পশ্চিমে লম্বা। দু’দিকে বিল। তার মধ্যদিয়ে খুব সরু একটি গ্রাম চলে গেছে প্রায় মাইল দেড়েক। আমাদের বাড়ির দখিন দিকে মাঠে যেয়ে আমার গ্রামটি একসাথেই দেখা যেত ঠিক যে এক বাঁকা চাঁদ, সরু দ্বিতীয়ার চাঁদ। আর সেটাই ছিল আমার ঈদ সম্পর্কিত ভুল ধারণার কারণ। দেখতাম, সারা বছর আমরা নামাজ পড়ি পশ্চিম দিকে কেবলা করে; কিন্তু ঈদের জামাত পড়া হয়, মনে হত উত্তর দিকে কেবলা মেনে!
আমাদের গ্রামের মাঝামাঝি প্রাইমারি স্কুলের পিছনে একটা বড় আমবাগানে ছায়া ঢাকা পরিবেশে ঈদের জামাত হত। বাড়ি থেকে আমরা পশ্চিম দিকে রওনা হয়ে যখন ঈদের মাঠে পৌঁছাতাম ততক্ষণে গ্রামটি দক্ষিণ দিকে এতটাই বেঁকে গেছে যে, আমি দিকভ্রষ্ট হতাম। তাই, পশ্চিমকে আমার চিরকালই মনে হয় উত্তর দিক। আমার ধারণা ছিল, ঈদের নামাজ পশ্চিম নয়, উত্তর দিকে কেবলা করে আদায় করতে হয়। আজও এই ধাঁধা আমার কাটেনি, যদিও ভুলের কারণটি আমি হিসেব করে ঠিকই বের করতে পারি।
আমাদের গ্রামটির আরও একটি বৈশিষ্ট্য আছে। পুবের দিকে আমার গ্রামের বর্ধিত অংশ যে পাকশিয়া গ্রামে মিশেছে তারপরেই বিশাল বিল। আর পশ্চিমে যেখান থেকে গ্রামটি পশ্চিম থেকে ক্রমশ দক্ষিণে বাঁক নিয়েছে তা ছুঁয়ে গেছে পাশাপাশি দুটি গ্রাম (বাজিতপুর আর মালদা) যে দুটো আবার অপেক্ষাকৃত উঁচু। আমার জন্মের আগে আমার বাবা-দাদারা সে পথেই গ্রাম থেকে হাটবাজারে যাতায়াত করতেন। কিন্তু আমাদের সে সুযোগ ছিল না। ১৯৪৭ সালে বঙ্গবিভাগে সিরিল র‌্যাডক্লিপ আমাদের গ্রাম থেকে বেরুবার সেই সহজ পথটি বন্ধ করে দিয়েছিলেন সীমান্তরেখা টেনে। কেমন করে? সে ইতিহাস খুব মর্মান্তিক।
ভারত ভাগের যারা প্রবল বিরোধী ছিলেন সেই কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা ১৯৪৭ সালে জেদ ধরল ভারত ভাগের আগে বাংলাকে ভাগ করতে হবে হিন্দু-মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসেবে। সে হিসেব করা হয় জেলাভিত্তিক। কিন্তু তাতে হিন্দু মহাসভা নেতা শ্যামাপ্রসাদের আসল ইচ্ছে পূরণ হয় না। তিনি জেদ ধরলেন, কলকাতা ভারতে থাকবে, আর এই শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তানের সীমানা যত দূর সম্ভব দূরে ঠেলে দিতে হবে। তাঁর ফর্মুলায় তাই যশোরের বনগাঁ মহকুমাও দু’ভাগ হয়। বনগাঁ মহকুমার শার্শা আর মহেশপুর থানা পাকিস্তান আর বনগাঁ ও গাইঘাটা থানা ভারতকে দেয়া হল। ফলে আমার গ্রামটি হয়ে পড়ল ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত বিভাজক। আর তাতেই আমাদের চলাচলের সব রাস্তা গেল বন্ধ হয়ে। আমরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়লাম।
তা সেই অবরুদ্ধ শালকোনা গ্রামে সেকালে আমরা ঈদ উদযাপন করতাম কীভাবে? ঊনিশশ’ পঞ্চাশ-ষাটের দশকে এই অঞ্চলের মানুষ ছিল খুব গরিব। ফসল বলতে কেবল আমন ধান আর খেজুর গুড়। পাট তেমন ভাল হত না, রবি ফসলের প্রশ্নই অবান্তর। বিলে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু গ্রামটি বনগাঁর সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় তার অর্থনৈতিক বুনিয়াদ ধসে পড়ে। এ এলাকার মানুষ আগে ধান গুড় বিক্রি করতে যেত রানাঘাটে, সেটা ভারতে পড়ল। তাছাড়া যাবার রাস্তাই তো নেই। বয়রা কিংবা বাগদাও ভারতে। তাই কৃষিপণ্য বিক্রি করে সেকালের প্রধান পণ্য কেরোসিন তেল, লবণ কেনার সুযোগ রইল না। এমন অবরুদ্ধ অর্থনীতির খেসারত দিতেই এই জনপদের মানুষের ঈদের আনন্দ মাটি হয়ে যায়।
ছেলেবেলায় আমরা দেখেছি সামান্য একটু পান্তা ভাতে দুধ বা বাড়িতে পাতা দৈ আর গুড় মিশিয়ে তাই খেয়ে সেহরি করত সবাই। ভেজানো কয়েকটা চাল, কয়েকটা ছোলার দানা বা ডাল, একটু গুড় তার সাথে ছোট্ট একফালি আদা মিশিয়ে হাতের তালু ভরে পানি খেয়ে ইফতার হত। সেকালে আরবের খেজুর গাঁ-গ্রামে পাওয়া যেত না। খুব বেশি হলে জুটত গুড় দিয়ে রান্না করা হাতে কাটা সেমাই বা চালের ক্ষীর, তার সাথে খৈ-মুড়ি। সেকালে আমরা পিয়াজু-বেগুনি-মুড়ি দিয়ে ইফতার করতে খুব একটা দেখিনি। যদিও হাটে বাজারে পিয়াজু-বেগুনি, ভাজা পাপড় বিক্রি হত প্রায় সারা বছর। তবে সে পিয়াজু ছিল সত্যিই খুব স্বাদের। এখনকার মত বাজে পিয়াজু সেকালে আমরা দেখিনি।
মেয়েরা দলবেধে চালের আটার সেমাই বানাত। দেখতে তা সমতি চালের মত লম্বাটে। দুধ, গুড়, নারকেলকোরা দিয়ে রান্না করা সে সেমাই বা আলো চালের ক্ষীর হত ঠিক যেন অমৃত। ইফতারিতে দুধ, নারকেলকোরা দিয়ে ভেজানো চিড়াও মজা করে খেতাম আমরা।
ঈদ মানে খুশির বন্যা বটে। কিন্তু তাতে বাড়াবাড়ি তেমন ছিল না। গ্রামের ওস্তাজির (দর্জি) কাছে জামা বানাতে দেয়া হত। অনেকেই তা ঈদের সকালেও পেত না। তাদের ঈদ আনন্দ মাটি হয়ে যেত। রেডিমেড পোশাকের ধারণাই তখন ছিল না। বাজার থেকে কেনা যেত লুঙ্গি আর শীতকালে হালকা লাল রঙের সুতির চাদর। গ্রামে গ্রামে কাবুলিওলারা জিন্নাটুপি, তুর্কি টুপি, জায়নামাজ, তসবি, আতর বিক্রি করত। রোজার মাসে কাবুলিওয়ালা গ্রামে আসলে এসব কেনার ধুম পড়ত। তারা এসব বিক্রি করত অনেক বেশি দামে, বাকিতে এবং চড়া সুদে। আমরা যখন টুপি কেনার বায়না ধরতাম বাবা-ভাইয়েরা তখন সে দাম কী করে শোধ করবেন তাই নিয়ে ভাবনায় পড়তেন। কাজেই কান্নাকাটি লেগেই থাকত। সেকালে জুতো পরার চল ছিল না। বড়জোর কেউ কেউ খড়ম পরতেন। কাঠের রঙিন খড়ম। অধিকাংশ মানুষই খালি পায়ে যেত ঈদের মাঠে। ষাটের দশকে বাজারে এলো স্পঞ্জের স্যান্ডেল। কিন্তু দাম এত বেশি যে তা কেনে এমন সাধ্য ছিল খুব কম মানুষের। একজোড়া স্পঞ্জ স্যান্ডেলের দাম ছিল সাত/আট টাকা যা আধমণ ধান বা একমণ পাটের মূল্যের সমান বা একজন প্রাইমারি স্কুল শিক্ষকের ১৫ দিনের বেতনের সমান!
আমাদের শালকোনা গ্রামে দু’জন হাজি ছিলেন। আলহাজ্ব হারুন আলী আর আলহাজ্ব আবেদ আলী মুন্সি। তারা যৌথভাবে ঈদের নামাজ পড়াতেন। স্কুলের উপরক্লাসে যখন পড়ি, তখন ঈদের জামাতে আমি নিয়মিত বক্তৃতা করতাম। আমি কোরান-হাদিস নিয়ে কথা বলতাম না। বলতাম শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে, মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কে। সংক্ষিপ্ত সে বক্তৃতা হাজী সাহেবরা বা গ্রামের মুসল্লিরাও শুনতেন খুব আগ্রহ নিয়ে।
নামাজ পড়ে গ্রামের বন্ধুদের বাড়িতে বাড়িতে দেখা করে, সেমাই খেয়ে তবে বাসায় ফিরতাম আমরা। দলবেধে ঘুরে বেড়াতাম। কিংবা সাইকেল নিয়ে চলে যেতাম নানিবাড়ি। সেকালের মাটির রাস্তায় সাইকেলই ছিল সহজ যানবাহন। ঈদের দিনে ঘরের মোরগ-মুরগিই ছিল ভরসা। গ্রামে ভাগে ছাগল, গরু জবাই হত। সেখান থেকে গোসত কেনা যেত। কোরবানীর ঈদে খুব কম সংখ্যক লোক কোরবানী দিতে পারত। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা দল বেধে কোরবানীর গোসত সংগ্রহ করত। হাটে-বাজারে গরু-ছাগল জবাই করে গোসত বিক্রি সেকালে আমাদের এলাকায় ভাবাও যেত না।
আমাদের ছেলেবেলায় ঈদ ছিল একেবারেই সম্পূর্ণ এক ধর্মীয় অনুষ্ঠান। তখন মানুষে মানুষে প্রীতি ভালোবাসায় খাদ ছিল না। আর ছিল না বড়লোকী দেখানোর স্বভাবও। এখন মানুষের সামর্থ্য বেড়েছে, বেড়েছে বিত্ত ও ক্ষমতা দেখানোর অসুস্থ মানসিকতা। আর বেড়েছে রোজা, ঈদে রাজনীতি, যা সেযুগে ছিল কল্পনার অতীত।

লেখক : শিক্ষাবিদ, সমাজচিন্তক; সাবেক চেয়ারম্যান, যশোর শিক্ষাবোর্ড