পরিচয় দিতে জাতীয় পার্টির লজ্জা!

আপডেট: 02:47:27 02/03/2018



img

সোহরাব হাসান

মাটি দোআঁশলা হলে ভালো ফসল হয়। কিন্তু রাজনীতি বা রাজনৈতিক দল দোআঁশলা হলে তার ফল ভালো হওয়ার কোনো কারণ নেই। সাবেক স্বৈরাচারী শাসক এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির দ্বৈত পরিচয় নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চার বছর ধরেই আলোচনা হয়ে আসছিল। জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতারা এসব আলোচনা-সমালোচনা আমলে নেননি।
এমনকি এরশাদ প্রকাশ্যে জাতীয় পার্টির মন্ত্রীদের সরকার থেকে পদত্যাগের চরমপত্র দিয়েও সফল হননি। এবারে সরব হয়েছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) জ্যেষ্ঠ কো-চেয়ারম্যান ও সংসদে আলংকারিক বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। তিনি যখন দেখলেন দলের মন্ত্রীদের পদত্যাগ করাতে পারছেন না, তখন খোদ প্রধানমন্ত্রীর শরণাপন্ন হলেন। গত মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতির ভাষণের ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে রওশন এরশাদ জাতীয় পার্টির সম্মান বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। মন্ত্রিসভা থেকে জাপার সদস্যদের পদত্যাগ করার নির্দেশ দিতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তাঁরা দেশে-বিদেশে নিজেদের পরিচয় দিতে পারেন না। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে লজ্জা লাগে। কারণ, সবাই জানতে চায়, জাতীয় পার্টি সরকারি দল, না বিরোধী দল। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বিরোধীদলীয় নেতা প্রশ্ন রাখেন, ‘আমরা সরকারি দল, না বিরোধী দল, কোনটা আমরা?’
প্রথমেই রওশন এরশাদকে ধন্যবাদ জানাই তাঁর এই সত্য ভাষণের জন্য। তিনি স্বীকার করেছেন, জাতীয় পার্টি পরিচয় সংকটে আছে এবং জাতীয় পার্টির অবস্থান নিয়ে বাইরে কথা বলতে লজ্জা পান। অনেক সময় কৌতূহলের সঙ্গে দেখেছি, বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান বা অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথি এসে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। স্পিকারের সঙ্গে দেখা করেন। সুযোগ পেলে বিএনপিপ্রধানও তাঁদের সঙ্গে দেখা করতেন। কিন্তু সংসদে বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে দেখা করেন না।
জাতীয় পার্টির মন্ত্রীদের ওপর এরশাদ কিংবা রওশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ আছে বলে মনে হয় না। এরশাদ কিংবা রওশন জানেন যে তাঁদের কথায় জাতীয় পার্টির কোনো মন্ত্রী পদত্যাগ করবেন না। তাই এখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ-উপরোধ করছেন যেন তিনি তাঁদের মন্ত্রীদের বাতিল করে দেন।
এ কথা ঠিক যে সংসদীয় গণতন্ত্রে মন্ত্রিসভায় কাকে নেওয়া হবে, কাকে বাদ দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীই নিয়ে থাকেন। কিন্তু জাতীয় পার্টি নিজে বিরোধী দল হবে, না সরকারের অংশীদার হয়ে থাকবে, সেই সিদ্ধান্ত তো প্রধানমন্ত্রী নেবেন না। নিতে হবে জাতীয় পার্টির নেতাদের।
রওশন এরশাদ ক্ষোভ ও হতাশার সুরে বলেছেন, ‘টানাটানি করে বিরোধী দল হওয়া যায় না। তাঁরা হয় বিরোধী দল হবেন, না হলে সরকারে থাকবেন। তিনি বলেন, ‘না হয় আমাদের ৪০ জনকে সরকারে নিয়ে নেন। বিরোধী দল দরকার নেই।’ রওশন হতাশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে আরও বলেন, ‘আপনি (প্রধানমন্ত্রী) যদি বলতে পারতেন, ঠিক আছে সব মন্ত্রিত্ব ছাড়ো। মন্ত্রিত্বে থাকার দরকার নেই।’
অনেক দেরিতে হলেও রওশন স্বীকার করেছেন, টানাটানি করে বিরোধী দল হওয়া যায় না। এখন জাতীয় পার্টি থেকে যেসব নেতা মন্ত্রিসভায় আছেন, তাঁদেরই ঠিক করতে হবে, তাঁরা মন্ত্রী থাকবেন না বিরোধী দলে বসবেন। মন্ত্রী থাকলে বিরোধী দলে বসা যায় না। কিংবা বিরোধী দলে থাকলে মন্ত্রী হওয়া যায় না।
আসলে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যানের ভয়, দল থেকে কাউকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে বললে তাঁরা শুনবেন না। মঙ্গলবার যখন টেলিভিশনে রওশনের বক্তৃতা শুনছিলাম, তখন তাঁর পাশেই বসে ছিলেন মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান। তাঁদের চেহারায় কোনো ভাবান্তর দেখা যায়নি। এর আগেও তাঁরা অনেকবার এ ধরনের কথা শুনেছেন। হয়তো দেখা যাবে, পদত্যাগের কথা বললে, মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে বললে তাঁরা দল ছেড়ে আওয়ামী লীগেও হিজরত করতে পারেন।
এ কারণেই দলীয় নেতাদের প্রতি হুকুমনামা জারি না করে রওশন প্রধানমন্ত্রীর কাছে জাতীয় পার্টিকে বাঁচানোর আরজি জানিয়েছেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের নেতারা সরকারপ্রধানের কাছে গণতন্ত্র বাঁচানোর আহ্বান জানান। কিন্তু রওশন জানালেন জাতীয় পার্টি বাঁচানোর আবেদন। তাঁর উপলব্ধি, ‘আমরা যখন বাইরে যাই, তখন সবাই বলে, তুমি কোথায় আছ, সরকারে না বিরোধী দলে? আমরা তো বলতে পারি না।’
তবে রওশন এরশাদের এসব আবেদন-নিবেদন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী তথা সংসদ নেত্রী শেখ হাসিনা কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি রওশন এরশাদের প্রশংসা করে বলেছেন, গণতন্ত্র চর্চা কীভাবে সুষ্ঠু করা যেতে পারে, তার নজির সংসদে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, রওশনের এই আহাজারির পেছনে জাতীয় পার্টিকে বিশুদ্ধ বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা নয়, সুযোগসন্ধানী মতলব কাজ করে থাকতে পারে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতার শরিক জাতীয় পার্টির অনেক নেতাই মনে করেন, বিএনপি আগামী নির্বাচনে নাও যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টিকে বিরোধী হিসেবে সংসদে আসতে হবে। জনগণের কাছে ভোট চাইতে হবে। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে সরকার থেকে বেরিয়ে গেলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দর-কষাকষিতেও সুবিধা হবে।
তবে সে রকম সুবিধা জাতীয় পার্টির নেতারা নাও পেতে পারেন। কেননা, বিএনপির মনোভাব হলো যত প্রতিকূল অবস্থাই হোক না কেন তারা নির্বাচনে যাবে। এমনকি মামলার কারণে খালেদা জিয়া যদি নির্বাচনে যাওয়ার সুযোগ নাও পান, তাহলেও বিএনপির মনোভাব হলো নির্বাচনে যাওয়া। খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার আগে দলের নেতাদের সে রকম বার্তাই দিয়ে গেছেন।
বিএনপি নির্বাচনে এলে জাতীয় পার্টির বর্তমান অস্তিত্ব সংকট আরও ঘনীভূত হবে। কয়েক দিন আগে জাতীয় পার্টির প্রধান এরশাদ বলেছিলেন, বিএনপির কতিপয় নেতা শিগগিরই তাঁর দলে যোগ দেবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ যোগ দেয়নি। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে যোগ-বিয়োগের সব হিসাব-নিকাশ যে বদলে যাবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
রওশন এরশাদের কথায় শুধু জাতীয় পার্টি নয়, গণতন্ত্রের পরিচয় সংকটও ঘনীভূত হয়েছে।
[লেখক : সাংবাদিক। প্রথম আলো থেকে।]