পরিত্যক্ত ভবনে পাঠদান

আপডেট: 04:30:24 07/08/2017



img

অভয়নগর (যশোর) প্রতিনিধি : অভয়নগর উপজেলার চলিশিয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত একটি গ্রাম বেদভিটা। প্রায় পাঁচ হাজার লোকের বসবাস এ গ্রামে। দেশ স্বাধীনের পর থেকে এ পর্যন্ত গ্রামে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি।
উপজেলা সদর থেকে আট কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। ভবদহের করাল গ্রাসে গ্রামটি প্রতি বছর বর্ষার মৌসুমে পানিতে ডুবে থাকে। গ্রামে বিদ্যুৎ নেই। তিন কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা হেঁটে সড়কে উঠতে হয়।
গ্রামের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেদভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি জরাজীর্ণ। একটু বৃষ্টি হলেই স্কুলটিতে পানি বেধে যায়।
স্কুলটি স্থাপিত ১৯৬০ সালে। দেশ স্বাধীনের অনেক আগে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় স্কুলটি পরিচালিত হতো। এরপর ১৯৯৪ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর একটি ভবন নির্মাণ করে দেয়। ভবনটিতে অল্প সময়ে ফাটল ও ভাঙন দেখা দেয়। পরে বেদভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনটি ২০১৩ সালের প্রথম দিকে উপজেলা শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা এসে পরিত্যক্ত ভবন ঘোষণা করেন। পরিত্যক্ত ঘোষণার পরও নতুন ভবন তৈরি হয়নি স্কুলটিতে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয় হলেও ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য নেই কোনো ক্লাসে দরজা- জালানা, নেই প্রয়োজনীয় বসার বেঞ্চ, যা রয়েছে তার অধিকাংশই ভাঙা। বিদ্যুৎ সংযোগ নেই । তীব্র গরমে অতি কষ্টে তাদের পাঠদান করতে হয়ে বলে শিক্ষির্থীরা জানায়। পরিক্তাক্ত ভবন শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে ক্লাস করার সময় খোলা আকাশের নিচে বসে পাঠদান করতে হয়। ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে শিশুরা আঁতকে ওঠে- না জানি কোন দুর্ঘটনা ঘটে!
শিক্ষকরা বলেন, ‘গত বছর ঝড়ে আমাদের একটি বেড়া ও টিনের তৈরি একটি ঘর উড়ে যায়। জলাবদ্ধতার কারণে তা নষ্ট হয়ে গেছে। এতে ক্লাস পরিচালনা ব্যাহত হচ্ছে।’
শিক্ষিকা লিপিকা মল্লিক জানান, তিনি চার বছর স্কুলটিতে কাজ করছেন। ঝড়ের সময় তিনি ভয়ে শিশুদের আগলে রাখেন। ভবন না থাকায় অনেক সমস্যা হয় বলে তিনি জানান।
বর্ষা মৌসুমে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যবহত হয় বলে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানিয়া সুলতানা (১১) জানায়।
তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী মাহফুজা খাতুন জানায়, ক্লাস রুম না থাকায় প্রতিদিন খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করতে মন চায় না।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মনোজকান্তি রায় বলেন, ‘অফিস কক্ষ না থাকায় স্কুলের মূল্যবান কাগজপত্র হারিয়ে ও নষ্ট হয়ে যায়। এতে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। ঝড়ে গত বছর একটি টিনের চালা ঘর উড়ে গেলে চেয়ারম্যানের তহবিল থেকে ছোট একটি টিনের ঘর নির্মাণ করা হয়। তবু কক্ষ সংকট রয়েই গেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ঝড় এলে ওই টিনের ঘরে থাকাটা বিপজ্জনক হয়ে পড়ে। এই কারণে এই স্কুলে ছেলে মেয়েরা আসতে চায় না। অনেক দূরের স্কুলে যায়। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বসার জন্য কক্ষ নেই। ভালো কোনো চেয়ার-টেবিলও নেই। গুরুত্বপূর্ণ কাগজ দলিলপত্র রাখার আলমারি নেই।’
সব রকম বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করেও শিক্ষকরা শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে সহকারী শিক্ষকরা জানান।
বর্তমানে চারজন শিক্ষক ও ৫২ জন শিক্ষার্থী দিয়ে চলছে বিদ্যালয়টি। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অক্লান্ত পরিশ্রম করে বিদ্যালয়ে আসতে হয়।
অভিভাবক ফারুক খান বলেন, ‘আমাদের এই স্কুলটি প্রত্যন্ত এলাকায় হওয়ায় কোনো অনুদান পাওয়া যায় না। তাই কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে না। ভবনটি ২০১৩ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা হলেও নতুন অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। যদি নতুন ভবন হতো, তাহলে অনেক ছেলে-মেয়ে এখানে পড়াশুনা করতে পারতো। আমার মনে হয় ছেলেমেয়েদের দুর্দশার চিত্র দেখে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর আবার একটি নতুন ভবন তৈরি করে দেবে।’
স্কুল পরিচালনা পরিষদের সভাপতি তারাপদ বিশ্বাস বলেন, ‘আমি অনেক দিন যাবত এই দায়িত্ব পালন করে আসছি। ভবন সম্পর্কে শিক্ষা অধিদপ্তরকে অনেক বার জানিয়েছি। কিন্তু কোনো ফল পাইনি।’
এ ব্যাপারে শিক্ষা অফিসার আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমি স্কুলটি পরিদশর্ন করেছি। শিক্ষা অধিদপ্তরে বিষয়টি জানিয়েছি।’

আরও পড়ুন