পাকিস্তানে চীনা সামরিক ঘাঁটি

আপডেট: 02:21:13 09/07/2017



img

আসিফ হাসান

চীন তার সামরিক বাহিনীর সামর্থ্য বাড়াচ্ছে, সেইসঙ্গে শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতাও গড়ে তুলছে। আর এই লক্ষ্যেই দেশটি বিদেশের মাটিতে দ্বিতীয় ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করছে। পাকিস্তানকেই দ্বিতীয় ঘাঁটি স্থাপনের জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছে দেশটি। সম্প্রতি চীনা সামরিক বাহিনী সম্পর্কে এক প্রতিবেদনে পেন্টাগন এসব কথা জানিয়েছে।
চীনা গণমুক্তি বাহিনী (চায়না পিপলস আর্মি, পিএলএ) বিদেশের মাটিতে প্রথম ঘাঁটি স্থাপন করেছিল ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ হিসেবে পরিচিত জিবুতিতে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। আগামী বছর তা শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। চীন আগে বলেছিল, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আরো বেশি অংশগ্রহণ, সোমালিয়া এবং এডেন উপসাগরীয় এলাকার আশপাশের পানিসীমায় পাহারা কার্যক্রম চালানো এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তারা এই ঘাঁটিটি প্রতিষ্ঠা করছে।
পেন্টাগনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশের মাটিতে ঘাঁটি স্থাপন করা হলে চীন আরো ভালোভাবে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। তবে বিদেশে ঘাঁটি নির্মাণে চীনা সামর্থ্য ‘হয়তো দেশগুলোকে তাদের বন্দরে পিএলএ-র উপস্থিতি সমর্থন করতে রাজি হতে বাধ্য করবে।’
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, চীনা নেতারা তাদের সামরিক বাহিনীর ভীতি সৃষ্টিকারী সামর্থ্য বৃদ্ধি, বৈরী শক্তির আস্ফালন প্রতিরোধ এবং তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ মোকাবিলা করার দিকে নজর দিয়ে যাচ্ছেন। এ কারণেই শক্তি প্রদর্শন ক্ষমতা চীনা বলয়ের বাইরেও ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি পিএলএ’র আধুনিকায়ন কর্মসূচিতে অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই আধুনিকায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবেই তারা পূর্ব চীন সাগরে ৪০টিরও বেশি বিমান মোতায়েন করেছে; ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে মিয়াকো প্রণালী ও ফিলিপাইন সাগরে বিশেষ ধরনের প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেছে। চীনাদের মোতায়েন করা জিয়ান এইচ-৬কে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ক্যারিয়ার গুয়ামে মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানতে পারে বলে পেন্টাগন ধারণা করছে। এইচ-৬কে হলো আধুনিকায়ন করা চীনা নির্মিত, সোভিয়েত আমলের টোপোলেভ টু-১৬ ‘ব্যাজার’ সাবসনিক বোমারু বিমান। এগুলো দূরপাল্লার আক্রমণে ব্যবহার করা যায়। আর ব্যালাস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণের দিক থেকে চীন এখন শীর্ষ পর্যায়ের দক্ষতা অর্জন করেছে বলেও পেন্টাগনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। চীনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থাও উন্নত হচ্ছে। তাদের এইচকিউ-১৯ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা তিন হাজার কিলোমিটার পাল্লার ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও রুখে দিতে পারে।
চীনা সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন কর্মসূচির আওতায় সেনা, নৌ ও বিমান- সব বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে বলেও পেন্টাগন মনে করছে।
চীনা নৌবাহিনী অত্যন্ত দ্রুতগতিতে টাইপ ০৫২ ফ্লিট ডিফেন্স ডেসট্রয়ার, টাইপ ০৫৪ ফ্রিগেট নির্মাণে এগিয়ে যাচ্ছে বলেও প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে চীনা সামরিক কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা প্রদান করা হলেও বেশ কিছু দুর্বলতাও চোখে পড়েছে। ডিফেন্স নিউজের মতে, পেন্টাগনের প্রতিবেদনে বেশ কিছু ভ্রান্তি বা সেকেলে তথ্য রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন চেঙদু-জে-২০ পঞ্চম প্রজন্মের জঙ্গিবিমানের উৎপাদন বাড়াচ্ছে। কিন্তু খবর হলো, গত বছরই চীন এই বিমানের উৎপাদন হার কমিয়ে দিয়েছে।
তাছাড়া প্রতিবেদনে যেসব মানচিত্র ও ইনফোগ্রাফিকস ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোতে ত্রুটি সহজেই চোখে পড়ে। যেমন হাইনান দ্বীপে চীনা গুরুত্বপূর্ণ নৌবাহিনী ঘাঁটিটির কথা প্রতিবেদনে উল্লেখই নেই। আবার চীনের নর্দার্ন থিয়েটর কমান্ডের বিমান ঘাঁটিটিকে ভুল করে বিমান বাহিনীর বোমারু বিমান ঘাঁটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আবার চীন নিজেও পেন্টাগনের প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তাদের শক্তি প্রদর্শনের কোনো পরিকল্পনা নেই।
যুক্তরাষ্ট্র হয়তো চীনা সামরিক শক্তি সম্পর্কে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আবার চীনও তাদের সুপ্ত ইচ্ছাটিও অস্বীকার করেছে। দুই বক্তব্যের মাঝামাঝি কিছু একটা কিন্তু থাকতেই পারে। চীনের ‘‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’’- ইনিশিয়েটিভ যেসব দেশের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে, সেগুলোর কয়েকটিতে অস্থিতিশীল উপাদান তীব্রভাবে সক্রিয় রয়েছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর ওই প্রকল্পেরই অংশবিশেষ। আর পাকিস্তানে ওই করিডোরের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি উত্তপ্ত বেলুচিস্তানে অবস্থিত। সেটার নিরাপত্তা বিধানের জন্য চীন যদি সেখানে সৈন্য মোতায়েন করে, তবে তাতে কি আশ্চর্য হওয়ার কিছু আছে? আফগানিস্তানের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো নয়। ভারতের সাথে তো নয়ই। ভারত ওই চীনা প্রকল্পের বিরোধিতা করছে প্রকাশ্যেই। ফলে প্রকল্পটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি চীনাদের মধ্যে থাকবেই।
চীনা প্রকল্পটির অন্যান্য অংশের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমাদের আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।
[আমাদের বুধবার থেকে]