পালপাড়ার দীনহীন জীবন

আপডেট: 03:03:08 06/12/2016



img
img

রূপক মুখার্জি, লোহাগড়া (নড়াইল) : দীনহীন জীবনযাত্রা। গোটা পাড়াতেই সব সময় লেগে আছে নিদারুণ অভাব। বাসিন্দাদের পরনে নিতান্তই পুরনো-ময়লা পোশাক। পুষ্টিহীনতার শিকার শিশুদের দীপ্তি নেই চোখে মুখে।
এ দৃশ্য লোহাগড়ার কুন্দশী, চোরখালি, জয়পুর, দিঘলিয়া, ঘোষিয়াবাড়ি, আখড়াবাড়িয়া, শালনগর, কুমারডাঙ্গা, রায়গ্রামের পালপাড়াগুলোতে।
বংশপরম্পরায় এখানকার মানুষেরা মাটি দিয়ে নানা সামগ্রী তৈরি করে বাজারজাত করেন। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য তাদের পৈত্রিক পেশায় ভয়ানক আঘাত হেনেছে। পালদের তৈরি পণ্য চাহিদা হারিয়েছে। অথচ তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় লাগেনি আধুনিকতার ছোঁয়া। মান্ধাতার আমলের উৎপাদন ব্যবস্থা যে আর পেটের ক্ষুধা মেটাতে পারবে না, তা বুঝে গেছেন অনেকেই। বাধ্য হয়ে তারা বেছে নিচ্ছেন অন্য কোনো পেশা।
লোহাগড়ার পালপাড়াগুলোর পাঁচ শতাধিক পরিবার যুগ যুগ ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এসব পরিবারে লোকসংখ্যা যে হারে বেড়েছে, সে হারে মৃৎশিল্পের চাহিদা বাড়েনি। বরং দিনদিন মৃৎশিল্পের চাহিদা কমে যাওয়ার ফলে এ সম্প্রদায়ের লোকজনদের মধ্যে দেখা দিয়েছে আর্থিক সংকট, বেড়েছে দারিদ্র্য।
যেসব হিন্দু পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত তারা স্থানীয় ভাবে ‘রুদ্রপাল’ বা ‘কুমার’ নামে পরিচিত। এই সম্প্রদায়ভুক্ত লোকেরা শিক্ষা-দীক্ষায় অনগ্রসর হওয়ার কারণে অন্য পেশায় জড়িয়েও যে খুব ভালো আছেন, তাও নয়।
কুন্দশী কুমারপাড়ায় গিয়ে পালদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেউ তাদের খোঁজ-খবর নেয় না। জানতেও চায় না তাদের সুখ-দুঃখ, সুবিধা-অসুবিধার কথা। তবে ভোটের সময় তাদের কদর বাড়ে।
মৃৎশিল্পী তপন পাল বলেন, ‘সারা মাস হাড়ি-পাতিল, সরা-কলস, খোড়া, দোনাসহ বিভিন্ন ধরনের মাটির সামগ্রী তৈরি করে শুকানোর পর ভাটায় পুড়িয়ে সেগুলো নিয়ে যাই হাট-বাজারে। জ্বালানির খড়ি বা লাকড়ির দাম বাড়ার কারণে এক খোলা মাল তৈরি করতে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা খরচ হয়। অথচ মাল বিক্রি করে চার থেকে পাঁচ শত টাকাও লাভ হয় না।’
অনিল পাল বলেন, ‘মাটির জিনিস বানিয়ে বিক্রি করি। আর তা দিয়ে কোনো রকমে খাওয়া-দাওয়া চলে আর কী। এই কাজে হাড়ভাঙা খাটুনি, অথচ আয় খুব কম।’
তা সত্ত্বেও পালদের অনেকে এখনো পৈত্রিক পেশা ধরে রেখেছেন। তারা বলছেন, প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প টিকতে পারছে না। অথচ শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি কোনো উদ্যোগও নেই। নেই কোনো কারিগরি প্রশিক্ষণ, উপকরণ বা ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা। সে কারণে তাদের সন্তানরা আর এ পেশায় থাকতে চাইছেন না।