পায়ের হাড়ভাঙা মানুষের ভরসাস্থল ‘সাইন’

আপডেট: 02:33:12 09/05/2018



img

শহিদুল ইসলাম দইচ : ‘আল্লাহর কাছে লাখ শোকর, আমাকে ভিক্ষা করে খেতে হচ্ছে না। আগের মতো আলমসাধু চালিয়েই সংসার চালাই। আমি ভাবতেও পারিনি, আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে কাজ করে সংসার চালাতে পারব।’- কথাগুলো বলছিলেন দুর্ঘটনায় বাম পায়ের হাড় ভেঙে যাওয়া ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার লুটিয়া গ্রামের আতর আলীর ছেলে আলমগীর হোসেন।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের ডাক্তার আব্দুর রউফের চিকিৎসাসেবা পেয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ভেঙে যাওয়া আলমগীরের বাম পা এখন স্বাভাবিক। সম্পূর্ণ বিনা খরচে চিকিৎসাসেবা পেয়ে তিনি এখন আগের মতো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
মানুষের ভাঙা পায়ে রড ঢুকিয়ে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ ও স্বাভাবিক করতে কাজ করছে সার্জিক্যাল ইমপ্লান্ট জেনারেল নেটওয়ার্ক (সাইন-sign) নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার সিঁড়ির বাম পাশের রুমে এই চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। এই প্রতিষ্ঠানের কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন যশোর জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের চিকিৎসক আব্দুর রউফ। ২০১১ সাল থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত এখানে ১১৬ জন পঙ্গুকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ ও স্বাভাবিক করা হয়েছে।
আলমগীর হোসেন সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘মাস দুয়েক আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আমার ডান পায়ের হাড় ভেঙে ঘরে পড়েছিলাম। স্ত্রী, ছেলে ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে খুবই কষ্টের মধ্যে পড়ছিলাম। সংসার মোটে চলছিল না। চিকিৎসার কথা ভাবতেও পারছিলাম না। একদিন লোকমুখে শুনে ডাক্তার আব্দুর রউয়ের সাথে যোগাযোগ করি। কদিন আগে ডাক্তার রউফ আমার পায়ে অপারেশন করে রড ঢুকিয়ে দিয়েছেন। রডের জন্য কোনো টাকা দেওয়া লাগেনি। এখন অনেকটা সুস্থ; পা নাড়াতে পারছি।’
যশোর সদরের ভায়না গ্রামের সোহরাব হোসেনের ছেলে আনোয়ার হোসেন। তিনি সুবর্ণভূমিকে জানান, ২০১২ সালের মে মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ডান পায়ের হাড় ভেঙে তিনি পঙ্গু হয়ে যান। লোকমুখে শুনে ডাক্তার রউফের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে নেওয়া হয়। এখন স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছেন, আগের মতো কাজও করছেন।
ডাক্তার আব্দুর রউফ সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘‘২০০৯ সালে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় পরিচয় হয় আমেরিকার বিশিষ্ট সমাজসেবক ডাক্তার জার্কেলের সাথে। জানতে পারি, ঢাকা পঙ্গু হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ‘সাইন’ চিকিৎসাসেবা দিয়ে পা ভাঙা অনেক লোককে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনেছে। আমি ২০১১ সালে যশোর জেনারেল হাসপাতালে যোগদান করে জার্কেলের সাথে যোগাযোগ করি। প্রথমে তিনি রাজি হননি। পরে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডাক্তার খন্দকার আব্দুল আওয়াল রিজভী সহযোগিতা করায় ডা. জার্কেল সাড়া দেন। পরে পাঁচটি বিভাগের সাথে যশোর জেনারেল হাসপাতালেও ‘সাইন’ সংযুক্ত হয়। তার পর থেকে এ অঞ্চলের গরিব অসহায় ১১৬ রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে স্বাভাবিক করা হয়েছে।’’
তিনি বলেন, ভেঙে যাওয়া পায়ে যে রড সংযোজন করা হয়, তার দাম ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু পঙ্গু হয়ে যাওয়া ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া হয় মাত্র এক হাজার থেকে তিন হাজার টাকা। আর একেবারে গরিব অসহায়দের কাছ থেকে কোনো টাকাই নেওয়া হয় না।’
ব্যক্তিগতভাবে তিনি এই প্রকল্প থেকে কোনো অর্থ গ্রহণ করেন না জানিয়ে বলেন, ‘ভালো কাজ করলে মানুষ মনে রাখবে- সেটাই আমার বড় পাওয়া পাওয়া।’
জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিক ডাক্তার বজলুর রশিদ টুলু সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘ডাক্তার আব্দুর রউফের প্রজেক্টে অংশ নিয়ে মানুষের সেবা করতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। ডাক্তারদের কাজই হলো মানুষের সেবা করা। আমি এভাবে কাজ করে যেতে চাই।’
অপর অর্থোপেডিক ডাক্তার গোলাম ফারুকও একই কথা বলেন। তার ভাষ্য, ‘নিঃসন্দেহে এটি ভালো কাজ। তবে সমস্যা হলো আমেরিকা অনেক দূরের পথ। সময়মতো নির্দিষ্ট সাইজের রড সরবরাহ না থাকায় অনেক রোগীর সমস্যা হচ্ছে। এই প্রজেক্ট না থাকলে এই অঞ্চলের দরিদ্র মানুষের অনেক ক্ষতি হবে।’
জানতে চাইলে যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (চলতি দায়িত্ব) ডা. আবুল কালম আজাদ লিটু সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘হাসপাতালে যোগদানের পরে জেনেছি ডাক্তার রউফ ‘সাইন’-এর সহায়তায় বিনা টাকায় গরিব ও অসহায় রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করছেন। এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। পায়ের হাড়ভাঙা গরিব রোগীদের এখানে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করছি।’

আরও পড়ুন