পিঠে বড়শিবিদ্ধ পাঁচ ‘সন্ন্যাসী’কে ঘোরানো হলো শূন্যে

আপডেট: 09:09:45 16/04/2018



img
img

অসীম মোদক, মহেশপুর (ঝিনাইদহ) : বড়শিতে গাঁথা জ্যান্ত তাজা মানুষ। চড়ক গাছে ঝুলে প্রায় ২৫-৩০ ফুট শূন্যে ঘুরতে ঘুরতে ‘সন্ন্যাসী’ ভিমকুমার হালদার ছুড়ে দিচ্ছেন বাতাসা।
শুধু ভিমকুমার হালদার নন, একে একে পাঁচ ‘সন্ন্যাসী’র পিঠে বড়শি বিঁধে তাদের শূন্যে ঘোরানো হলো; চড়ক উৎসবে যাকে শিবপূজারই অংশ বলে মনে করা হয়। গা শিউরে ওঠা এই দৃশ্য দেখলেন প্রায় ২০ হাজার নারী-পুরুষ।
মহেশপুর উপজেলার ফতেপুর গ্রামের বকুলতলায় প্রতি বছরের মতো এবারও সোমবার বিকেলে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এই চড়ক উৎসব।
মহেশপুর শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমের একটি গ্রাম ফতেপুর। গ্রামটির বকুলতলা বাজারে ভারতীয় পঞ্জিকা মতে ২ বৈশাখ অনুষ্ঠিত হয় চড়ক উৎসব। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা উৎসব আয়োজনে এ পূজা করে থাকেন। প্রতি বছর এই পূজার মূল আকর্ষণ থাকে কয়েক ব্যক্তির পিঠে বড়শি বিদ্ধ করে শূন্য ঘোরানো। বড়শিবিদ্ধ সুঠামদেহী ব্যক্তিদের ‘সন্ন্যাসী’ বলা হয়। এবার এক ‘সন্ন্যাসী’ অসুস্থ থাকায় পাঁচজনের পিঠে বান ফোঁড়ানো (বড়শিবিদ্ধ) হয়।
স্থানীয়দের মতে, ফতেপুর বকুলতলা বাজারে প্রায় ২০০ বছর ধরে চলে আসছে এ চড়ক পূজা। আর এ পূজাকে ঘিরে বকুলতলা বাজারে দুই দিন ধরে চলে লোকজ মেলা।
বান ফোঁড়ানো ‘সন্ন্যাসী’র শূন্যে ঘোরা ছাড়া মেলায় কেনাকাটা করতে সোমবার সাতসকালে হাজির হন বিপুল সংখ্যক নারী-পুরুষ। দুপুরের পর ভিড় বাড়তে থাকে মেলা প্রাঙ্গণে। বিকেলের মধ্যে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় পুরো এলাকা। চারিদিকে সাজ সাজ রব। পুরো এলাকায় উৎসবের আমেজ। ঠিক বিকেল পাঁচটায় পাঁচ ‘সন্ন্যাসী’ ফতেপুর গ্রামের মনা কর্মকার, বিপ্লব কর্মকার, কৃশচন্দ্রপুর গ্রামের বাসুদেবকুমার ও বৈচিতলা গ্রামের মহাদেবকুমার, অধির কুমার ফতেপুর বাঁওড়ে স্নান করেন। এরপর পাঁচ ‘সন্ন্যাসী’ মাটির কলসে জল ভরে মাথায় নিয়ে আসেন মেলা প্রাঙ্গণে চড়কগাছের (খাম্বাসদৃশ সুদীর্ঘ বৃক্ষ) গোড়ায়। ঠিক পাঁচটা দশ মিনিটে প্রথমে ভীম হালদারের পিঠে দুটি বড়শি বিদ্ধ করা হয়। এ সময় স্মরণ করা হয় দেবতা মহাদেবকে (শিব)। এরপর ভীমকে ১০-১৫ জন পুরুষ ধরাধরি করে ঝুলিয়ে দেন চড়কগাছে। গাছের অপর প্রান্তে থাকা কপিকলের বাঁশ জোরে জোরে ঘোরাতে থাকেন ২০-৩০ যুবক। চড়কগাছে লটকে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক নারী তাদের এক-দেড় বছরের শিশুসন্তানকে তুলে দেন সন্ন্যাসীদের কোলে। তাকে নিয়েই শূন্যে ঘুরতে থাকেন সন্ন্যাসীরা। এ অবস্থায় ছিটিয়ে দেওয়া হয় বাতাসা।
এভাবেই বড়শিতে বিঁধে ৪/৫ পাক শূন্যে ঘুরে নেমে আসেন ভীম হালদার। এ নিয়ে ১৭ বার চড়ক গাছে চড়লেন তিনি।
ভীম হালদার জানান, এখানে হিন্দুর সংখ্যা নেহায়েত কম না। কিন্তু সবাই চড়কগাছে উঠতে পারে না। এতে উঠতে অনেক সাহস লাগে।
ভীমের পর একে একে বান ফোঁড়ালেন অন্য ‘সন্ন্যাসী’রা।
স্থানীয়রা জানান, আগে শুধুমাত্র পিঠে বান ফুঁড়িয়েই চড়কগাছে সন্ন্যাসীকে ঝুলিয়ে ঘোরানো হতো। প্রায় ১১২ বছর আগে এক ‘সন্ন্যাসী’ পিঠের চামড়া ছিড়ে পড়ে আহত হওয়ার কারণে বড়শির ওপর এখন গামছা পেঁচিয়ে দেওয়া হয়।
‘সন্ন্যাসী’ মনা কর্মকার বলেন, ‘শিব ঠাকুরের সন্তুষ্টির জন্যই তারা প্রতি বছর চড়কগাছে চড়ে থাকেন। শরীরে বড়শি বিদ্ধ হওয়ার ফলে বড় ধরনের ক্ষতের সৃষ্টি হলেও সামান্যই রক্ত বের হয়। কিন্তু এর জন্য কোনো ওষুধ লাগে না। চড়কগাছ থেকে নামার পর গাছের গোড়ায় থাকা সিঁদুর টিপে দিলেই হয়।’
‘সন্ন্যাসী’রা জানান, তারা পূর্বপুরুষদের কাছে শুনেছেন ২০০ বছর আগে এখানে চড়ক পূজা শুরু হয়। আগে কপোতাক্ষ নদের পাড়ে এ পূজার আয়োজন করা হতো। সেই স্থানে সরকার আশ্রয়ণ প্রকল্প গড়ে তোলার কারণে এখন ফতেপুর বকুলতলার বাজারে চড়ক পূজা হয়।
মেলায় আসা মিষ্টির দোকানি মোসলেম আলী ১০-১২ রকমের মিষ্টি সাজিয়ে বসেছেন। তিনি এবার নিয়ে ১৫ বারের মতো মেলায় এলেন। বেচাকেনা বেশ ভালোই হচ্ছে বলে জানান এই দোকানি।
কুষ্টিয়ার একতারপুরের শাখা-সিঁদুর বিক্রেতা বিমল সরকারও জানান, বেচাকেনা ভালো।
পুজা ও মেলা কমিটির সভাপতি সুনীল ঘোষ ও সাধারণ সম্পাদক সুবল কর্মকার জানান, চড়ক পূজা মূলত শিবপূজারই অংশ। নানা আনুষ্ঠানিকতায় তা সম্পন্ন করা হয়ে থাকে।