পিঠে বড়শি বিঁধে শূন্যে ঘোরানো হলো ৬ সন্ন্যাসীকে

আপডেট: 05:01:22 16/04/2019



img
img

মহেশপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি : বড়শিতে গাঁথা জ্যান্ত মানুষ। চড়কগাছে ঝুলিয়ে প্রায় ২৫-৩০ ফুট শূন্যে ঘুরাতে ঘুরাতে সন্ন্যাসী ভিমকুমার হালদার ছুড়ে দিচ্ছেন বাতাসা।
শুধু ভিম নন, একে একে ছয় সন্ন্যাসীর পিঠে বড়শি বিঁধে শূন্যে ঘোরানো হলো তাদের। উদযাপন করা হলো শিবপূজারই অংশ চড়ক উৎসব। গা শিউরে ওঠা এই দৃশ্য দেখলেন প্রায় ২০ হাজার নারী-পুরুষ।
ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার ফতেপুর গ্রামের বকুলতলায় প্রতি বছরের মতো এবারো আজ মঙ্গলবার বিকেলে অনুষ্ঠিত হলো এই চড়ক উৎসব; যার প্রধান আকর্ষণ পিঠে বড়শি বিঁধে সন্ন্যাসীদের চড়কগাছে ঝুলিয়ে ঘোরানো।
মহেশপুর শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমের একটি গ্রাম ফতেপুর। এ গ্রামের বকুলতলা বাজারে ভারতীয় পঞ্জিকা মতে ২ বৈশাখ অনুষ্ঠিত হয় চড়কপূজা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এ পূজা করে থাকেন। প্রতি বছর ৬-৭ ব্যক্তিকে সন্ন্যাসীকে পিঠে বড়শি বিঁধে শূন্যে ঘোরানো হয়। বড়শিবিদ্ধ এসব মানুষকে বলা হয় 'সন্ন্যাসী'। এবার এক সন্ন্যাসী অসুস্থ থাকার কারণে ছয়জনকে বড়শি (বান) ফোড়ানো হয়।
স্থানীয়রা জানান, এখানে প্রায় দুইশ’ বছর ধরে চলে আসছে এ চড়কপূজা। আর এ পূজাকে ঘিরে বকুলতলা বাজারে দুইদিন ধরে চলে বর্ণাঢ্য লোকজ মেলা।
ফতেপুরের এ চড়ক মেলার মূল আকর্ষণ বড়শিবিদ্ধ হয়ে শূন্যে ঘোরানো (স্থানীয় ভাষায় বলা হয় বান ফোড়ানো)। এ দৃশ্য অবলোকনের পাশাপাশি মেলায় কেনাকাটা করতে মঙ্গলবার সকাল থেকে হাজির হন প্রায় ২০ হাজার নারী-পুরুষ-শিশু। দুপুরের পর থেকেই ভিড় বাড়তে থাকে মেলা প্রাঙ্গণে। বিকেলের মধ্যে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় পুরো এলাকা। চারদিকে সাজ সাজ রব। এলাকাজুড়ে উৎসবের আমেজ। বিকেল পাঁচটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ছয় সন্ন্যাসী ফতেপুর গ্রামের মনা কর্মকার, বিপ্লব কর্মকার, কৃশচন্দ্রপুর গ্রামের বাসুদেবকুমার ও বৈচিতলা গ্রামের মহাদেবকুমার, অধীরকুমার ফতেপুর বাঁওড়ে স্নান করেন। এরপর ছয় সন্ন্যাসী মাটির কলসে জল (পানি) ভরে মাথায় নিয়ে আসেন মেলা প্রাঙ্গণে চড়কগাছের গোড়ায়। পাঁচটা দশ মিনিটে প্রথমে ভীম হালদারের পিঠে দুটি বড়শি বিদ্ধ করা হয়। এ সময় স্মরণ করা হয় মহাদেব তথা শিব ঠাকুরকে। এরপর ভীমকে ১০-১৫ জন পুরুষ ধরাধরি করে ঝুলিয়ে দেন চড়কগাছে। গাছের অপর প্রান্তে থাকা কপিকলের বাঁশ জোরে জোরে ঘোরাতে থাকেন ২০-৩০ জন যুবক। চড়কগাছে লটকে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু নারী-পুরুষ তাদের এক-দেড় বছরের শিশুসন্তানকে তুলে দেন সন্ন্যাসীদের কোলে। তাদের নিয়েই শূন্যে ঘুরতে থাকেন সন্ন্যাসীরা। এ অবস্থায় ছিটিয়ে দেওয়া হয় বাতাসা।
বড়শিতে বিঁধে ৪-৫ পাক শূন্যে ঘুরে নেমে আসেন ভীম হালদার। এ নিয়ে ১৮ বার চড়ক গাছে চড়লেন তিনি।
ভীম হালদার জানান, এখানে হিন্দুর সংখ্যা নেহায়েত কম না। কিন্তু সবাই চড়কগাছে উঠতে পারেন না। উঠতে গেলে মনে অনেক সাহস লাগে।
ভীমের পর একে একে বান ফোড়ালেন বিপ্লবকুমার, বাসুদেবকুমার, মহাদেবকুমার ও অধীরকুমার।
স্থানীয়রা জানান, আগে শুধুমাত্র পিঠে বান ফুড়িয়েই ঝুলিয়ে দেওয়া হতো চড়কগাছে। আর সে অবস্থাতেই ঘোরানো হতো সন্ন্যাসীদের। প্রায় ১১২ বছর আগে এক সন্ন্যাসী পিঠের চামড়া ছিড়ে নিচে পড়ে আহত হওয়ার কারণে বড়শির ওপর এখন গামছা পেঁচিয়ে দেওয়া হয়।
সন্ন্যাসী মনা কর্মকার জানান, শিব ঠাকুরের সন্তুষ্টির জন্যই তারা প্রতি বছর চড়কগাছে চড়ে থাকেন। এর সঙ্গে টাকা-পয়সার কোনো সম্পর্ক নেই।
তিনি আরো জানান, শরীরে বড়শী বিঁধার ফলে বড় ধরনের ক্ষতের সৃষ্টি হলেও সামান্যই রক্ত বের হয়। কিন্তু এর জন্য কোনো ওষুধ লাগে না তাদের। চড়কগাছ থেকে নামিয়ে গাছের গোড়ায় থাকা সিঁদুর টিপে দিলেই হয়।
সন্ন্যাসীরা জানান, পূর্ব পুরুষদের কাছে শুনেছেন প্রায় দু’শ’ বছর আগে এখানে চড়কপূজা শুরু হয়। আগে কপোতাক্ষ নদের পাড়ে এ পূজার আয়োজন করা হতো। সেই স্থানে সরকার আশ্রয়ণ প্রকল্প গড়ে তোলার কারণে এখন ফতেপুর বকুলতলার বাজারে চড়ক পূজা হয়। এ পূজাকে ঘিরে বসে জমজমাট মেলা। লোকজ ঐতিহ্যের হরেক রকম পসরা সাজিয়ে দোকানিরা বেচাকেনা করেন দুইদিন ধরে।
মিষ্টির দোকানি মোসলেম আলী (৫৩) ১০-১২ রকমের মিষ্টি সাজিয়ে বিকিকিনি করছিলেন। তিনি এবার নিয়ে ১৫ বারের মতো মেলায় এসেছেন। বেচাকেনা বেশ ভালোই হচ্ছে বলে জানালেন।
কুষ্টিয়ার একতারপুরের শাখা-সিঁদুর বিক্রেতা বিমল সরকারও বেচাকেনা ভালো হচ্ছে বলে জানান।
পূজা ও মেলা কমিটির সভাপতি সুনীল ঘোষ ও সাধারণ সম্পাদক সুবোল কর্মকার জানান, চড়কপূজা মূলত শিবপূজারই অংশবিশেষ। নানা আনুষ্ঠানিকতায় তা সম্পন্ন করা হয়ে থাকে।