পুলিশ কর্মকর্তার চারিত্রিক অধঃপতনের ফিরিস্তি তরুণীর মুখে

আপডেট: 12:47:08 14/07/2016



img

স্টাফ রিপোর্টার : এক নববিবাহিতা তন্বির মুখে যশোর কোতয়ালী থানার এক পুলিশ কর্মকর্তার চারিত্রিক অধঃপতনের বর্ণনা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন সংবাদকর্মী, সাধারণ মানুষ মায় তার সহকর্মীরাও।
অবশ্য থানার এক কর্তা পরিস্থিতি সামাল দিতে অভিযোগকারিণীসহ তার আত্মীয়-স্বজনদের ‘ম্যানেজ’ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেন; খানিকটা সফলও হন। অভিযুক্ত পুলিশ অফিসার নিজেকে প্রকাশ্যে ‘নির্দোষ’ দাবি করলেও গোপনে ওই তরুণীর হাত-পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়েছেন। সংবাদকর্মীদেরও নানাভাবে নিবৃত করার চেষ্টা করেন তিনি।
বুধবার সন্ধ্যায় শহরের খড়কী পশ্চিমপাড়ার একটি বাড়িতে ‘আসামি ধরার নামে’ ফোর্স নিয়ে যান কোতয়ালী থানার এসআই এইচএম মাহমুদ। বাড়িটিতে তখন ছিলেন শুধু এক তরুণী, যার বিয়ে হয়েছে মাত্র তিন মাস আগে। তার স্বামী একটি বোমাবাজি মামলার আসামি।
১৭-১৮ বছরের ওই নববধূ পুলিশ কর্মকর্তা মাহমুদের কৃতকর্মের বর্ণনা দেন এভাবে : ‘প্রথমে ঘরে ঢুকলো। তারপর ফ্রিজ খুলে মিষ্টি খেলো। এরপর আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু এবং স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিলো’।
সন্ধ্যার এই ঘটনার পর ওই তরুণী গৃহবধূ তার স্বজনদের নিয়ে রাত নয়টার দিকে কোতয়ালী থানায় হাজির হন। তখন সেখানে পেশাগত কাজে অবস্থান করছিলেন ৬-৭ জন সাংবাদিক। ছিলেন নানা কাজে আসা বিভিন্ন স্থানের আরো কিছু লোক। তারা অভিযোগ শুনে স্তম্ভিত হয়ে যান।
শ্লীলতাহানির শিকার তরুণী কান্নাজড়িত কণ্ঠে সবার সামনেই ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি অভিযোগ করেন, সন্ধ্যা আনুমানিক ছয়টার দিকে এইচ এম মাহমুদ পোশাক পরে তার বাড়িতে যান। বাইরে অপেক্ষমাণ ছিলেন আরো কয়েকজন পুলিশ সদস্য।
‘সে সময় ঘরে কেউ ছিল না। পাশের বাড়িতে আমার ননদের ছেলে পলাশ নামে এক শিশুর জন্মদিন পালনের জন্য সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঘরে ঢুকে ওই অফিসার প্রথমে আমার স্বামীর নাম জানতে চান। এরপর ঘরের বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি করেন। পরে ফ্রিজ খোলেন এবং সেখানে রাখা মিষ্টি খান। কতদিন আগে আমার বিয়ে হয়েছে তা-ও জানতে চান। এরপর হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরেন। হাত চালাতে থাকেন শরীরের স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে। এরপর একটি সাদা কাগজে নিজের মোবাইল নম্বর লিখে দিয়ে যোগাযোগ করতে বলেন’, কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন ওই তরুণী।
শুধু নারীর শ্লীলতাহানিই নয়, ওই অফিসার বাড়িটিতে আরো কিছু অপকর্ম করেন বলে অভিযোগ।
থানায় আসা পরিবারটির সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনরা অভিযোগ করেন, ওই তরুণী বধূর ঘর থেকে বেরিয়ে আশেপাশের আরো কয়েকটি ঘরে ঢোকেন এসআই মাহমুদ। সেখান থেকে চারটি মোবাইল ফোনসেট হাতিয়ে নেন তিনি। ফিরে আসার সময় জন্মদিনের কেক কেনার জন্য দেওয়া এক শিশুর কাছ থেকে ৭২০ টাকা কেড়ে নেন। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা আশরাফুল (১১) ও সূর্য (৭) নামে দুই শিশুকে বিনা কারণে মারপিট করেন ওই অফিসার।
তরুণী বধূ আত্মীয়-পরিজন নিয়ে এসে থানায় এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ করায় স্পষ্টতই স্তম্ভিত ও বিব্রত হয়ে পড়েন দায়িত্বরত অফিসাররা। ওই তরুণী ও তার সঙ্গীরা দেখা করতে চাইলেও ‘ব্যস্ত আছি’ বলে এড়িয়ে যান ওসি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, এর পর দায়িত্ব নেন থানার সেকেন্ড অফিসার মোকাদ্দেস হোসেন। তিনি অভিযোগকারিণীসহ তার স্বজনদের ডেকে নেন নিজ অফিস কক্ষে। সেখানে তাদের নানা কায়দায় ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু লাঞ্ছিতা গৃহবধূকে কোনো কায়দায় বশে আনা যাচ্ছিল না। অবশেষে স্বামীকে ‘নাশকতা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার’ হুমকি দেওয়ায় তিনি দমে যান।
এর আগে উপ-পরিদর্শক মাহমুদ তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। বলেন, ‘মাদক মামলা থেকে বাঁচতে এই ঘটনা সাজানো হয়েছে।’
তবে চারটি মোবাইল ফোন ও নগদ ৭২০ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা তিনি আংশিক কবুল করেন। দাবি করেন, ‘ওখানে মাদক ব্যবসায়ীরা লুকিয়ে থাকে। তাদের ব্যবহৃত মোবাইলগুলো জব্দ করা হয়েছে। আর মাদক বিক্রির ৭২০ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।’
তবে অভিযোগকারিণী তরুণীকে বাইরে ডেকে নিয়ে তার কাছে ক্ষমাভিক্ষা চাইতে দেখেছেন অনেকে। অভিযোগকারীরা থানা থেকে বিদায় নিলে অভিযুক্ত অফিসার একে একে বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। খবরটি যাতে প্রকাশিত না হয় জনে জনে সে তদবির করেন তিনি।
ঘটনার ব্যাপারে থানার ওসি মো. ইলিয়াস হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ব্যস্ততার কারণে অভিযোগকারীদের বক্তব্য শোনার সুযোগ হয়নি। ব্যস্ততা কমলে ঘটনা শুনবো।’

আরও পড়ুন