পেঁয়াজ আর পেঁয়াজ

আপডেট: 03:21:26 25/03/2019



img
img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : মাঠের পর মাঠ পেঁয়াজ ক্ষেত। রাস্তায় পেঁয়াজের ঝাঁঝালো গন্ধ। বাড়িগুলোতে বসার উপায় নেই, চারিদিকে ছড়িয়ে আছে পেঁয়াজ। রাতে ঘুমানোর মতো সামান্য জায়গা রেখে বাড়ির সবটুকু স্থানে রাখা হয়েছে এই পেঁয়াজ। এখনো ক্ষেতে রয়েছে পেঁয়াজ, যা কৃষক উঠিয়ে বাড়িতে আনছেন। স্তূপ করে রাখছেন বিক্রির অপেক্ষায়। এই অবস্থা ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার সাধুহাটি গ্রামের।
স্থানীয়রা বলছেন, গোটা শৈলকুপা উপজেলায় প্রচুর পরিমানে পেঁয়াজের চাষ হয়ে থাকে। তার মধ্যে সবচে’ বেশি চাষ হয় এই সাধুহাটি গ্রামে। নানা জাতের পেঁয়াজের চাষ হয় তাদের গ্রমাটিতে। কৃষকদের ভাষায় এই চাষটি লাভজনক হওয়ায় তাদের আগ্রহ বেড়েছে, প্রতিবছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে আবাদ।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, শৈলকুপা উপজেলায় মোট চাষযোগ্য জমি আছে ২৮ হাজার ৫০০ হেক্টর। তার মধ্যে এ বছর পেঁয়াজের চাষ হয়েছে ছয় হাজার ১৫৫ হেক্টর জমিতে। শুধু সাধুহাটি গ্রামেই পেঁয়াজের চাষ হয়েছে ৩৫০ হেক্টরে। যা ওই গ্রামের মোট চাষযোগ্য জমির অর্ধেক বলে জানিয়েছেন স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা কনোজকুমার বিশ্বাস।
শৈলকুপা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সঞ্জয়কুমার কুণ্ডু জানান, তাদের উপজেলায় দিন দিন পেঁয়াজের চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক সময়ের এই এলাকায় ধান চাষের প্রাধান্য ছিল। এখন সেখানে পেঁয়াজের চাষ বাড়ছে। গত দশ বছরে এই চাষ বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি জানান, বারি-১, লাল তীর, লাল তীর কিংসহ বেশ কয়েকটি জাতের পেঁয়াজ বেশি চাষ হচ্ছে। এ বছর বেশ কিছু কৃষক সুখসাগর জাতটিও চাষ করেছেন। গোটা উপজেলায় পেঁয়াজের ফলন ভালো হয়েছে। কৃষকরা তাদের ক্ষেত থেকে পেঁয়াজ উঠিয়ে ঘরে আনতে শুরু করেছেন। তবে বাজারে অন্য বছরের তুলনায় এ বছর পেঁয়াজের দাম কিছুটা কম। কিন্তু উৎপাদন বেশি হওয়ায় চাষিরা লাভবান হবেন বলে আশা ওই কর্মকর্তার।
সরেজমিনে শৈলকুপা উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, মাঠের পর মাঠ শুধু পেঁয়াজের ক্ষেত। যেখানে কাজ করছেন কৃষকরা। কেউ পেঁয়াজ তুলছেন, কেউ বস্তা ভরছেন। আবার কেউ বস্তা মাথায় নিয়ে বাড়িতে ফিরছেন।
সাধুহাটি গ্রামের কৃষক সমশের আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির বাইরে মেয়েরা পেঁয়াজ থেকে গাছ কেটে আলাদা করছেন। বাড়ির মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পেঁয়াজ। ঘর-বারান্দা কোথাও একটু খালি জায়গা নেই। রাতে শোবার জন্য ঘরের মধ্যে যে খাটটি রয়েছে, তার নিচেও আছে পেঁয়াজ।
এই চাষি জানান, এবছর তিনি সাড়ে সাত বিঘা জমিতে পেঁয়াজের চাষ করেছেন। এর মধ্যে ছয় বিঘায় লাল তীর জাত, বাকিটা সুখসাগর জাত। যার মধ্যে অর্ধেক পরিমাণ জমির পেঁয়াজ বাড়িতে নিয়ে এসেছেন। এখনো মাঠে পেঁয়াজ রয়েছে।
তিনি জানান, প্রতি বিঘায় ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। এক বিঘায় একশ’ মণ পেয়াজ পাচ্ছেন। যা বিক্রি করে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা হবে। ফলন ভালো হওয়ায় খুশি তিনি।
ওই গ্রামের আরেক কৃষক শাহিনুর রহমান জানান, তিনি তিন বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছেন। মাঠ থেকে পেঁয়াজ উঠিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসার কাজে এখন তার ব্যস্ততা। এই ক্ষেত থেকে তিনি তিনশ’ মণ পেঁয়াজ পাবেন বলে আশা করছেন। যা বিক্রি করে প্রায় দেড় লাখ টাকা হবে। এই চাষ করতে তার ৫০ হাজারের কিছু বেশি খরচ হয়েছে।
তিনি বলেন, তাদের এলাকায় পেঁয়াজের চাষ ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে সব কৃষকের এই চাষ রয়েছে।
উপজেলার বাখরবা গ্রামের কৃষক আমিরুল ইসলাম জানান, পেঁয়াজ কাটার পর তারা পাট চাষ করবেন। পাট কেটে ধান করবেন। বছরে তিনটি ফসল পাচ্ছেন তারা। যে কারণে পেঁয়াজের চাষ দ্রুত বাড়ছে।
তিনি আরো জানান, সরকারিভাবে এই উপজেলায় পেঁয়াজ সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। যে কারণে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন।
সাধুহাটি ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা কনোজকুমার বিশ্বাস জানান, তার ব্লকে সাত হাজার হেক্টর চাষযোগ্য জমি আছে। আর এক হাজার ৫৬০টি কৃষি পরিবার রয়েছে। এ বছর সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের চাষ হয়েছে। প্রায় সব পরিবারের রয়েছে পেঁয়াজের চাষ। এই চাষটি ক্রমেই বাড়ছে বলে তিনি জানান।
শৈলকুপা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনোজকুমার কুণ্ডু জানান, উপজেলায় পেঁয়াজ চাষ ক্রমেই বাড়ছে। কৃষকরাও এই চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। তবে এখানে একটি কোল্ডস্টোর প্রতিষ্ঠা জরুরি। তাহলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য পেতেন। অনেক সময় সংরক্ষণ করতে না পেরে অল্প টাকায় তারা উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন বলে জানান এই কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন