পোস্ট অফিস চলে পোস্ট মাস্টারের সঙ্গে

আপডেট: 02:35:25 23/12/2017



img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : খাতাপত্র একহাতে, আরেক হাতে টিকিটের ব্যাগ। সঙ্গে নিয়েছেন মাদুর। যেখানে জায়গা পাবেন সেখানেই বসে পড়বেন। আর এটাই হবে প্রায় ১০০ বছর বয়সের গান্না পোস্ট অফিস। অন্যের বারান্দায় মাদুর পেতেই চলে এই পোস্ট অফিসের কার্যক্রম। পরিচালনা করেন পোস্ট মাস্টার মিজানুর রহমান।
এলাকাবাসীর ভাষায়, ভবন না থাকায় গান্না পোস্ট অফিসটি থাকে পোস্ট মাস্টারের সঙ্গেই। তিনি ব্যাগে করে নিয়ে বেড়ান পোস্ট অফিসের সব জরুরি চিঠি আর কাগজপত্র। সরকারি সব চিঠিপত্রও অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে বহন করতে হয় তাকে। তারা দীর্ঘদিন একটি ভবনের জন্য চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বেশ বড় একটি বাজার গান্না। চিত্রা নদীর পাড়ে কোটচাঁদপুর, কালীগঞ্জ আর সদর উপজেলার সীমান্তে এই বাজারটির অবস্থান। এই বাজারে একটি কলেজ, একটি মাধ্যমিক ও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এখানে এক হাজারের বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। রয়েছে একটি ব্যাংকের শাখা, দুটি ইটের ভাটা, পাঁচটি এনজিওর অফিসসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান।
গ্রামবাসী জানান, এই গান্না গ্রামে একসময় রাজাদের (জমিদার) বসবাস ছিল। তাদেরই একজন অভিলাষ বাবু আনুমানিক ১৯২৫ সালের দিকে এই পোস্ট অফিসটি স্থাপন করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কুদ্দুস জানান, গান্নার রাজারা তাদের প্রয়োজনে পোস্ট অফিস চালু করেন। প্রথম পর্যায়ে এটা রাজাদের বাড়িতেই ছিল। রাজারা দেশ ত্যাগ করলে এলাকার মানুষ তাদের প্রয়োজনে আনুমানিক ৪০ থেকে ৪৫ বছর আগে পোস্ট অফিসটি গান্না গ্রাম থেকে বাজারে নিয়ে আসেন। সেই থেকে পোস্ট অফিসটির কার্যক্রম চলে গান্না বাজারেই।
গান্না পোস্ট অফিসের বর্তমান পোস্ট মাস্টার মিজানুর রহমান জানান, তার বাবা মৃত হাতেম আলী ৪৫ বছর এই পোস্ট অফিসের পোস্ট মাস্টারের দায়িত্ব পালন করেছেন। তার আগে দায়িত্ব পালন করেন জনৈক আব্দুল করিম। আর তিনি (মিজানুর রহমান) দায়িত্ব পালন করছেন ১৮ বছর। এই দীর্ঘ সময় পোস্ট অফিসের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে স্থানীয় লোকজন তাকে সহযোগিতা করেছেন। প্রথম যখন অফিসটি বাজারে স্থানান্তর করা হয় তখন একটি টিনের চালার ঘর দেওয়া হয়েছিল। সেখানে চলতো এর কার্যক্রম। এরপর আরো একটি স্থানে চলে এর কার্যক্রম। সর্বশেষ ১৯৮০ সালে বাজারের ব্যবসায়ীরা আরেকটি টিনের চালার ঘর নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। বছর পাঁচেক আগে সেই ঘরটি ব্যবহার-অনুপযোগী হয়ে গেছে। বর্তমানে পোস্ট অফিসের নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই।
মিজানুর রহমান জানান, বর্তমানে এই পোস্ট অফিসের মাধ্যমে বেশ কিছু চিঠিপত্র আদান-প্রদান হয়। প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০টি রেজিস্ট্রি চিঠি আসে। অর্ডিনারি চিঠিও আসে ১৫ থেকে ২০টি। এছাড়া মানুষের চাকরির পরীক্ষার কার্ড, যোগদানপত্র, সরকারি সব চিঠিপত্র তাদের মাধ্যমে আদান-প্রদান হচ্ছে। আর এই কাজের জন্য একজন পোস্ট মাস্টার ও একজন ডেলিভারিম্যান রয়েছেন।
তিনি আরো জানান, ঘর না থাকায় তিনি ব্যাগে ভরে সবকিছু বাড়িতে নিয়ে যান। প্রতিদিন সকাল ১০টা বাজলেই ব্যাগ, মাদুর আর খাতাপত্র নিয়ে বাজারে চলে আসেন। যখন যেখানে সুযোগ পান সেখানেই বসে পড়েন।
মিজানুর জানান, তাদের যে সিলমোহরগুলো রয়েছে, তা দীর্ঘদিনের। এগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু নতুন করে সরবরাহ নেই। যে কারণে ঠিকমতো কাজ করতে পারছেন না।
তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘সরকারের একটি পুরনো বিভাগ এই ডাক বিভাগ। অথচ আমাদের এই অবস্থা। উপায়ন্তর না পেয়ে আমরা এখনো এই চাকরি ধরে আছি। ইডি পোস্ট অফিস হওয়ায় খুবই সামান্য সম্মানি পাই। সরকারের উচিত আমাদের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করা।’
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা প্রধান পোস্ট অফিস নলডাঙ্গা-৭৩৫০ এর পোস্ট মাস্টার মাহফুজা বেগম জানান, গান্না একটি ইডি (এক্সট্রা ডিপার্টমেন্ট) পোস্ট অফিস। ওই পোস্ট অফিসে যারা কর্মরতরা সম্মানি পেয়ে থাকেন। তারা সরকারের বেতনভুক্ত কর্মচারী নন।
তিনি জানান, ডাক বিভাগ ইডি পোস্ট অফিসগুলোর জন্য ভবন বরাদ্দ করেছে, কিন্তু জমি বরাদ্দ নেই। স্থানীয়রা জমি দিলে ভবন করার জন্য তিনি উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করবেন বলে জানান।

আরও পড়ুন