প্রতিবন্ধীদের লেখাপড়া শেখা

আপডেট: 02:25:18 05/04/2018



img

অভয়নগর (যশোর) প্রতিনিধি : নওয়াপাড়া শহরের ধোপাদী এলাকাবাসীর প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে অভয়নগর উপজেলা অটিজম ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুল নামে একটি বিদ্যালয়। এখানে অটিস্টিক, বুদ্ধি, শ্রবণ, বাক, দৃষ্টি ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের লেখাপাড়া শেখানোর পাশাপাশি তাদের কর্মক্ষম করে গড়ে তোলার জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষা দান করা হচ্ছে।
বর্তমানে এখানে ১০১ জন বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী রয়েছে। এর মধ্যে অটিস্টিক ৫০ জন, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ১৫ জন, শারীরিক প্রতিবন্ধী ২১ জন, বাকপ্রতিবন্ধী ছয়জন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী একজন এবং শ্রবণ প্রতিবন্ধী রয়েছে দুইজন। বেশির ভাগ শিশু দরিদ্র পরিবারের। সমাজের কাছে ওই সব শিশুরা অবহেলার শিকার।
বিদ্যালয়টিতে চারটি শ্রেণিতে পাঠ দান করানো হয়। সেগুলো হলো ১. মা ও শিশু শ্রেণি। এ শ্রেণিতে অধিকতর শারীরিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুদের তাদের মাকে কাছে রেখে পাঠদান করা হয়। ২. প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি। এ শ্রেণিতে কিছুটা সক্ষম প্রতিবন্ধী শিশুদের অক্ষর জ্ঞানের শিক্ষা দেওয়া হয়। ৩. প্রাথমিক শ্রেণি। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি পাশের পর এ শ্রেণিতে উন্নীত করে সরকারি প্রথম শ্রেণির পাঠ্যবই পড়ানো হয়। ৪. এ ছাড়া প্রতিবন্ধীদের সমাজে কর্মক্ষম করে গড়ে তোলার জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষা দেওয়া হয়।
সাধারণ বিদ্যালয়ের মতো এখানে সহশিক্ষা যেমন নাচ, গান, কবিতা আবৃতি, শরীরচর্চা শিক্ষাও দেওয়া হয়। বিদ্যালয়টি অল্প দিনের মধ্যেই ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া বিদ্যালয়টি নিয়ে গুরুত্বসহকারে রিপোর্ট প্রচার/প্রকাশ করেছে।
বিদ্যালয়টিতে দশজন শিক্ষক ও ছয়জন কর্মচারী রয়েছেন। বুধবার সকালে বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষকরা পরম মমতায় প্রতিবন্ধীদের হাত ধরে বর্ণ লেখা শেখাচ্ছেন।
সাত বছরের শারীরিক প্রতিবন্ধী মরিয়ম খাতুনের মা মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়েকে সরকারি প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি করেছিলাম। কিন্তু সেখানে তার সহপাঠীরা অবহেলা করতো। কেউ কাছে আসতো না। যে কারণে আমার মেয়ে ওই স্কুলে যেতে খুব কান্নাকাটি করতো। কিন্তু এই প্রতিবন্ধী স্কুলে আমার মেয়ে নিজ থেকে আসতে চায়। এখানে এসে সে এক মাসের মধ্যে চারটি অক্ষর শিখেছে।’
আরেক শিক্ষার্থী ইয়ছিন হোসেনের (৭) মা রেহেনা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী। এই স্কুলে ভর্তি করার পর সে অক্ষর পড়তে ও লিখতে পারে।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহিম বলেন, ‘২০১৪ সালে এলাকার ৩০ জন শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশু নিয়ে আমার বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা মঞ্জুয়ারা খাতুন ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় একটি ঝুপড়ি ঘর তুলে পাঠদানের কাজ শুরু করেন। দিন দিন এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এলাবাসীর উদ্যোগে আমরা টিন শেডের চার রুম বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করে পাঠদান করছি।’
তিনি বলেন, এখানে ৭-৮ কিলোমিটার দূর থেকেও শিক্ষার্থীরা আসে। দরিদ্র  হওয়ায় প্রতিদিন ৫০-৬০ টাকা খরচ করে তারা আসতে পারে না। তা ছাড়া বিদ্যালয়টিতে অনেক উপকরণের অভাব রয়েছে। যার দরুণ পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, এখানকার শিক্ষকরা বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চ শিক্ষিত। কিন্তু প্রতিবন্ধীদের সাথে কাজ করার জন্য তাদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। তা ছাড়া মাঝে মাঝে শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুরা খিচুনিতে আক্রান্ত হয়। যে কারণে শিক্ষকদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া জরুরি। তিনি এ ব্যাপারে সরকারি সহায়তা কামনা করেন।
বিদ্যালয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি মো. মোশারেফ হোসেন বলেন, ‘আমার গ্রামে অনেক প্রতিবন্ধী শিশু রয়েছে। তারা সমাজের কাছে বিভিন্নভাবে অবহেলার শিকার হচ্ছে। কর্মমুখি শিক্ষা দিতে পারলে তারা সমাজের বোঝা হয়ে থাকবে না- এমন আশা নিয়ে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়টি দাঁড় করিয়েছি।’
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামান বলেন, ‘এলাকাবাসীর উদ্যোগে স্কুলটি স্থাপিত হয়েছে। আমি নিয়মিত খোঁজ-খবর নিচ্ছি। সরকারি সহায়তা পাওয়ারও চেষ্টা করছি।’