প্রস্তুত গদখালী

আপডেট: 03:23:36 11/02/2018



img
img
img

স্টাফ রিপোর্টার : বসন্তবরণ, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এবং ভাষাশহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে সামনে রেখে মহাব্যস্ত সময় পার করছেন দেশে ফুল উৎপাদনের প্রধান জোন যশোরের গদখালীর চাষিরা। ফুলের ক্ষেত থেকে সময়মতো পর্যাপ্ত ফুল পেতে গাছ পরিচর্যায় ব্যস্ত তারা। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে এ তিন দিবসে দেশের চাহিদা পূরণ করতে পারবেন তারা।
যশোর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার পশ্চিমে যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের পাশের জনপদ গদখালী। এখন থেকেই দেশজুড়ে ফুলের সরবরাহ যায়। আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি পয়লা ফাল্গুন- বসন্তবরণ। পরদিন ভ্যালেন্টাইনস ডে বা বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। এ দুটি দিবসে প্রিয়জনের মন রাঙাতে চান তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সীরা। প্রিয়জনের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে ফুলই শ্রেষ্ঠ।
মানুষের মনের খোরাক মেটাতে গদখালীর চাষিরা এখন দিনরাত পরিশ্রম করছেন। ফুল দেরিতে ফোটাতে গোলাপের কুঁড়িতে পরিয়ে রাখছেন ‘ক্যাপ’। ফলে বসন্ত উৎসব, ভালোবাসা দিবস আর ২১ ফেব্রুয়ারিতে ফুল বাজারে দেওয়া নিশ্চিত হবে। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাসসহ নানা রঙের ফুল। চোখ ধাঁধানো এই সৌন্দর্য কেবল মানুষের হৃদয়ে অনাবিল প্রশান্তিই আনে না, ফুল চাষ সমৃদ্ধিও এনেছে অনেকের জীবনে। ফুলেল স্নিগ্ধতায় এখন ব্যস্ত সময় কাটছে তাদের।
অবশ্য ইতিমধ্যে বসন্ত উৎসব আর ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলো ফুলের চালান যাওয়া শুরু হয়ে গেছে। গদখালী বাজারে এখন জারবেরার স্টিক বিক্রি হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ টাকায়, রজনীগন্ধা ২-৩ টাকায়, গোলাপ রং ভেদে ৫-১৫ টাকায়, গø্যাডিওলাস ৩-১০ টাকায়, এক হাজার গাঁদা মিলছে ৫৫০-৬০০ টাকায়।
গদখালি ফুলচাষি কল্যাণ সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রনি আহম্মদের মতে, গত বছর এই মৌসুমে ২৫ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছিল। এবার তা গিয়ে ঠেকতে পারে ৪০ থেকে ৪৫ কোটিতে। তবে রনির এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমতও আছে অনেকের।
রনি জানান, ভ্যালেন্টাইনস ডেতে রঙিন গ্লাডিওলাস, জারবেরা, রজনীগন্ধা ও গোলাপ বেশি বিক্রি হয়। আর গাঁদা বেশি বিক্রি হয় একুশে ফেব্রুয়ারি ও বসন্ত উৎসবে। ফলে সূর্য ওঠার আগেই প্রতিদিন চাষি, পাইকার ও মজুরের হাঁকডাকে মুখর হয়ে উঠছে গদখালীর ফুলের বাজার। পাইকারদের কেনা ফুল সকাল থেকেই বিভিন্ন রুটের বাসের ছাদে স্তূপ করে সাজানো হচ্ছে, পাঠানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে ট্রাক-পিকআপ ভ্যান ভরে ফুল যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
ফুলচাষি হাফিজা খাতুন হ্যাপি বলেন, ‘সারাদেশে বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে যে ফুল বেচা-কেনা হয় তার অন্তত ৭০ শতাংশই যশোরে উৎপাদিত। তবে এবারের ভালোবাসা দিবসে ফুলের যেমন উৎপাদন বেশি, তেমনি চাহিদা অন্য যেকোনো বারের তুলনায় বেশি। তাই শহর-নগরের ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী আমরা ফুলের অর্ডার নিচ্ছি।’
স্থানীয় ক্ষুদ্র পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, সামনে ভ্যালেন্টাইন ডেতে ফুল বিক্রি বেশি হবে। বাজারে জারবেরা, গোলাপ, রজনীগন্ধা ফুলের চাহিদা বেশি। কৃষকরাও দাম ভালো পাবেন।
ফুলচাষি ও ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন জানান, এবার তিনি দশ বিঘা জমিতে গোলাপ, জবা, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাসের পাশাপাশি জারবেরার চাষ করেছেন। আবহাওয়া ভালো থাকায় বাগানে আগের চেয়ে বেশি ফুল এসেছে। ফলে পাঁচ-ছয় লাখ টাকা ঘরে তুলতে পারবেন বলে আশা তার।
‘বিভিন্ন রংয়ের গোলাপ এবার কৃষকের ঘরে বিশেষ উপহার হয়ে এসেছে। আমরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অর্ডার পাচ্ছি। তাদের চাহিদা মতো ফুল সরবরাহ করার জন্য প্রস্তুত আছি। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা,’ বলছিলেন ইসমাইল।
বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহিম এবার বিক্রি চল্লিশ কোটি টাকার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন।
তিনি বলেন, ‘এবার ফুলের উৎপাদন, চাহিদা ও দাম সবই বেশ ভালো। এ অঞ্চলের ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীরা সবাই খুশি। দেশে ফেব্রুয়ারিতে যে পরিমাণ ফুল বেচাকেনা হয়। তার ৭৫ শতাংশ উৎপাদিত হয় যশোরে। এবার চাহিদা বেশি, চাষিরাও আগাম প্রস্তুতি রেখেছেন।’
হাড়িয়া নিমতলা গ্রামের আসলাম হোসেন বলেন, ‘এক বিঘায় গোলাপ ও দুই বিঘায় গ্লাডিওলাসের আবাদ করেছি। এক বিঘা গোলাপ আবাদে খরচ হয়েছে আশি হাজার টাকা। প্রথম বছর চল্লিশ হাজার টাকা বেশি খরচ হয়েছে, তবে তাতে ৭-৮ বছর ফুল পাওয়া যাবে। প্রতি বছর দেড় লাখ টাকার ফুল বিক্রি করা যাবে।’
ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপঙ্কর দাস জানান, এ অঞ্চলে সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে ৫০০ ফুলচাষি বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ করেছেন। বর্তমানে এটি ‘ফুলের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত। এবার আবহাওয়া ভাল থাকায় ফুলের উৎপাদন বেশি হয়েছে। বিদায়ী ২০১৭ সালে শুধু গদখালি থেকে ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকার ফুল বেচাকেনা হয়। এবছর তা অতিক্রম করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফুল চাষকে লাভজনক করে তুলতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নানা সহায়তা দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

আরও পড়ুন