প্রাপ্য টাকার বদলে চিনি!

আপডেট: 02:39:12 27/03/2018



img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : মোবারকগঞ্জ চিনিকলের নির্মাণশ্রমিক হোসেন আলী চাকুরি শেষে গ্রাচ্যুইটির টাকা পাবেন মাত্র দশ লাখ। এই টাকা নিয়েই কর্মজীবন শেষে তার বাড়ি ফেরার কথা। কিন্তু চিনিকল কর্তৃপক্ষ টাকা দিতে ব্যর্থ হয়ে টাকার পরিবর্তে তার হাতে তুলে দিচ্ছেন চিনি। জীবনের শেষ সময়েও এই চিনি নিয়ে তাকে লোকসান দিতে হচ্ছে প্রায় আড়াই লাখ টাকা।
একই অবস্থা আরেক শ্রমিক নজরুল ইসলামেরও। টাকার বদলে চিনি নিয়ে তাকেও তিন লাখের বেশি টাকা লোকসান দিতে হবে।
শুধু এই দুইজনই নন, এই অবস্থা কালীগঞ্জের মোবারকগঞ্জ চিনিকলের ১০২ জন শ্রমিক-কর্মচারীর; যারা অবসর গ্রহনের পর গ্রাচ্যুইটির টাকা পাচ্ছেন না। দিনের পর দিন চিনিকলে ধরনা দিয়ে অবশেষে কর্তৃপক্ষের অনুরোধে টাকার বদলে চিনি নিতে রাজি হয়েছেন। আর এই চিনি নিতে গিয়ে তারা দেখেন জীবনের শেষ সম্বল থেকেও তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। উৎপাদিত চিনি নির্ধারিত দামের চেয়ে বাজার মূল্য কম হওয়ায় তাদের এই মোটা অংকের টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। ফলে তারা আর চিনি নিতে চাচ্ছেন না। তাদের এই লোকসান ঠেকাতে কর্তৃপক্ষ বিকল্প কিছু ভাববেন- এমনটাই আশা করছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা।
অবসরে যাওয়া একাধিক শ্রমিক-কর্মচারী জানিয়েছেন, তারা ৩৫-৪০ বছর এই মিলে চাকরি করেছেন। অল্প বেতনে কাজ করলেও তাদের আশা ছিল, চাকরি শেষে এককালীন বেশ কিছু টাকা পাবেন। যা দিয়ে একটা কিছু করে বাকি জীবনটা কাটাতে পারবেন। শ্রমিক-কর্মচারীদের পাওনাও হয়েছে বেশ। কিন্তু কর্তৃপক্ষ টাকা দিতে পারছেন না। চিনিকলে টাকা নেই- এই অজুহাতে তাদের দিনের পর দিন ঘুরাচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করে এক শ্রমিক জানান, গত দুই বছরে মোবারকগঞ্জ চিনিকলের ১০২ জন শ্রমিক-কর্মচারী অবসর নিয়েছেন। যারা কেউ আজো প্রাপ্য টাকা পাননি। চিনিকলের কাছে এই ১০২ জনের মোট পাওনা ১৫ কোটি টাকা। এই টাকার জন্য তারা প্রায়ই মিলে এসে অপেক্ষা করেন। কর্মকর্তাদের কক্ষে ধরনা দিতে দিতে তারা হাঁফিয়ে উঠেছেন।
ওই শ্রমিক আরো জানান, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন অবসরে যাওয়া শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরি শেষে পাওনা টাকার বদলে চিনি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তারাও ঘুরে ঘুরে হাঁফিয়ে উঠে শেষ পর্যন্ত চিনি নিজে রাজি হয়েছেন। কর্তৃপক্ষের প্রলোভনে তারা চিনি নিতে আবেদনও করেন। কিন্তু চিনি নেওয়ার সময় তাদের ৬০ টাকা কেজি দরে দেওয়া হচ্ছে। যে চিনি তারা বাজারে বিক্রি করতে গেলে বর্তমানে ৪৭ টাকা দর পাচ্ছেন। ফলে চিনি নিয়ে তারা মোটা টাকা লোকসান দিচ্ছেন।
আরেক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করে জানান, চিনিকলের যে ১০২ জন শ্রমিক-কর্মচারী অবসরকালীর পাওনা টাকা নিয়ে ঘুরছেন তাদের পাওনার পরিমাণ প্রায় ১৫ কোটি টাকা। এই টাকার বদলে তাদের চিনি দেওয়া হচ্ছে। এতে শ্রমিক-কর্মচারীরা পাবেন আড়াই হাজার মেট্রিক টন চিনি। ৬০ হাজার টাকা টন হিসেবে যার মূল্য ধরা হয়েছে। এতে চিনিকলের ১৫ কোটি টাকা পরিশোধ হবে। কিন্তু শ্রমিক-কর্মচারীরা এই চিনি নিয়ে বাজারে বর্তমানে ৪৭ টাকা দরে তারা বিক্রি করতে পারছেন। সেই হিসেবে প্রতি টনে তারা ১৩ হাজার টাকা লোকসান দিচ্ছেন। হিসেব অনুযায়ী ১০২ জনকে টাকার বদলে চিনি নিয়ে তিন কোটি ২৫ লাখ টাকা লোকসান দিতে হবে। যা খুবই দুঃখজনক বলে মন্তব্য শ্রমিক-কর্মচারীদের।
কর্মচারী নজরুল ইসলাম জানান, তিনি ৩৮ বছর চাকরি করেছেন। এখন চাকরি শেষে এককালীন ১৮ লাখ টাকার পরিবর্তে ২৪ মেট্রিক টন চিনি দেওয়া হচ্ছে। এই চিনি নিয়ে তার শেষ সঞ্চয় থেকে হারিয়ে যাচ্ছে তিন লাখ ১২ হাজার টাকা। এটা কোনোভাবেই মানতে পারছেন না তিনি। তাই বরাদ্দ পেলেও চিনি তুলছেন না নজরুল।
এ বিষয়ে মোবারকগঞ্জ চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্জিবকুমার দত্ত জানান, বিষয়টি অমানবিক। কিন্তু যারা অবসরে গেছেন তারা দ্রæত টাকা পাওয়ার জন্যই এই লোকসান মেনে নিয়ে টাকার বদলে চিনি নিচ্ছেন। কেউ লোকসান না দিতে চাইলে তাকে অপেক্ষা করতে হবে, মিলের টাকা প্রাপ্তিসাপেক্ষে টাকা পরিশোধ করা হবে। এ ছাড়া চিনিকল কর্তৃপক্ষের কাছে আপাতত কোনো বিকল্প নেই।

আরও পড়ুন