পয়লা বৈশাখ ও বাঙালি

আপডেট: 06:29:07 13/04/2019



img

মামুন কবীর

পয়লা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব এবং একমাত্র উৎসব যার কোনো ধর্মীয় চরিত্র নেই। এটা মসুলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নয়। এটা শুধুমাত্র বাঙালির উৎসব। যারা বাঙালি, বাংলা যার মাতৃভাষা এ উৎসব শুধু তার জন্য। বিভিন্ন ধর্মে বিভক্ত বাঙালির একমাত্র মিলনস্থল এই পয়লা বৈশাখ।
মুঘলরা ভারত দখল করে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন সরাসরি চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলতো না। এতে করে অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করতে হতো। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা আনয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। শুরুতে এই সনের নাম ফসলি সন রাখা হয়, পরে 'বঙ্গাব্দ' বা 'বাংলা বর্ষ' নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
সৌর পঞ্জিকাকে অনুসরণ করে বাংলা বার মাস অনেককাল আগে থেকেই গণনা করা হতো, যা শুরু হতো গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা-এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। কারণ প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষকদের ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হতো। তাই একে ঋতু উৎসবও বলা হতো।
সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ আনুষ্ঠানিক উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রজারা বাংলা সনের চৈত্র মাসের শেষ দিন বা চৈত্র সংক্রান্তির মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকতেন। তার পরের দিনে অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়, যার রূপ পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা হলো একটি নতুন হিসাব বইয়ের নতুন হিসাব। বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়ার নামই হলো হালখাতা। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সকল স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকেন। বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা দিনটি নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ হিসেবে বরণ করে নেন।
বৈশাখ মাসের প্রথম দিনকে পয়লা বৈশাখ বা পহেলা বৈশাখ কিংবা বঙ্গাব্দের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ বলি আমরা। দিনটি বাঙালির ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণের দিন। দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ হিসেবে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয়। ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও এই উৎসবে অংশ নিয়ে থাকেন। সে হিসাবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন লোকউৎসব হিসাবে বিবেচিত।
শোভাযাত্রা, মেলা, পান্তাভাত খাওয়া, হালখাতা খোলা ইত্যাদি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয় পহেলা বৈশাখ। নববর্ষের সময় বাংলাদেশে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। যশোরে চারুপীঠ ১৯৮৫ সালে প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করে। সার্বিক সমন্বয়ের কাজ করেছিল যশোরের অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যশোর ইনস্টিটিউট। সেই শোভাযাত্রায় শামিল হয় সব সংগঠন। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে মঙ্গল শোভাযাত্রা পেল সর্বজনীনতার মর্যাদা। ১৯৮৯ সালে ঢাকায় পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণের শোভাযাত্রা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চারুকলা থেকে পাস করা শিল্পীদের সংগঠন চারুশিল্পী সংসদের সাথে তৎকালীন ছাত্ররাও যুক্ত হয়। চারুশিল্পী সংসদের সভাপতি ছিলেন রফিকুন নবী। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটও এগিয়ে আসে। প্রথমে এর নামকরণের কথা ছিল 'বৈশাখী শোভাযাত্রা'। আলাপ-আলোচনার পর ঠিক করা হয় 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' নামটিই থাকবে। মূলত সামরিক স্বৈরশাসনের হতাশার দিনগুলোতে তরুণরা এটি শুরু করেছিল। শিক্ষার্থীরা অমঙ্গলকে দূর করার জন্য বাঙালির নানা ধরনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক, প্রাণীর প্রতিকৃতি ও মুখোশ নিয়ে শোভাযাত্রা বের করে। ইউনেস্কো বলছে, মঙ্গল শোভাযাত্রা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতীক। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত এই উৎসব শোভাযাত্রাকে 'মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে।
আজকাল কেউ কেউ প্রচার করে আসছেন যে, এই উৎসব হিন্দুয়ানি। এটা উদযাপন করলে মুসলমানের ধর্ম নষ্ট হয়ে যাবে। এগুলো সব উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কথা। এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিকে হেয় করা আর নষ্ট করা এর পেছনের উদ্দেশ্য বলে মনে হয়। এতে করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা সহজ।
হাজার বছর ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতি আর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দেশ এই বাংলাদেশ। মাঝে মধ্যে ব্রিটিশরা ধর্মের ভিত্তিতে 'ডিভাইড অ্যান্ড রুল' নীতি প্রয়োগ করে এই অঞ্চলে হিন্দু-মুসলিমের দ্বন্দ্ব তৈরি করে নির্বিঘ্নে শাসন করতো। ব্রিটিশরাজ শেষ হলে পাকিস্তানেও সেই একই নীতি প্রয়োগ করে হিন্দু-মুসলমানের দ্বন্দ্ব তৈরি করে শোষণের ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্ট হয়েছে। আজ স্বাধীন বাংলাদেশেও সেই চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। যারা যুগে যুগে ধর্মীয় সংঘাত তৈরি করে ফায়দা লুটতে চেয়েছে তারাই আজ সকল ধর্মের বাইরে থেকে স্বাধীনভাবে উদযাপিত হওয়া বাঙালির একমাত্র উৎসব পহেলা বৈশাখকে 'হিন্দুয়ানি' তকমা দেওয়ার চেষ্টা করছে। বাঙালিকে সচেতন থাকতে হবে কোনোভাবেই যেন বাঙালির এই একমাত্র উৎসব থেকে তারা সরাতে না পারে। যদি সরে যায় তবে সেদিন বাঙালি আর বাঙালি থাকবে না। তারা ভাগ হয়ে যাবে আর জড়িয়ে যাবে সংঘাতে; যা ঐসকল ইন্ধনদাতার মূল উদ্দেশ্য। বাঙালিকে, বাংলার সংস্কৃতিকে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বাঙালির এই একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ উৎসবটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে আমাদের।
[লেখক : সমাজকর্মী]